টানা বৃষ্টি, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা এবং সরবরাহ সঙ্কটের কারণে রাজধানীর কাঁচাবাজারে সবজি, মাছ ও ডিমের দাম আবারো ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেশির ভাগ সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা বেড়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেড়েছে ৬০ টাকা পর্যন্ত। একই সময়ে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম ডজনে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে ১৩৫-১৪০ টাকায় পৌঁছেছে। মাছের বাজারেও কেজি-প্রতি ২০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি পাচ্ছেন না সাধারণ ক্রেতারা।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মিরপুর-৬, দুয়ারীপাড়া ও পল্লবী বাজার ঘুরে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যেও বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ করা গেছে।
গতকাল বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে বর্তমানে হাইব্রিড শসা বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি, যা কয়েকদিন আগেও ছিল ৬০ থেকে ৮০ টাকা। দেশী শসার কেজি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। বেগুন, করলা ও বরবটি বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি। ঝিঙে, ঢ্যাঁড়স ও চিচিঙ্গা ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং লাউ প্রতিটি ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচের দামও বেড়ে সাধারণ মানের ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা এবং ভালো মানের মরিচ ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
তবে কয়েকটি পণ্যের দাম কমেছে। পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা কেজি, যা আগে ছিল ৩০ টাকা। আমদানি বেড়ে যাওয়ায় টমেটোর দাম কমে ১৫০ টাকায় নেমেছে। আলু ২৫ টাকা এবং পেঁয়াজ ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে সবজি বিক্রেতারা জানান, টানা বৃষ্টিতে নরসিংদীসহ বিভিন্ন জেলার সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কমেছে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় রাজধানীর বাজারে সরবরাহও কমে গেছে। দুয়ারীপাড়া বাজারের বিক্রেতা আল নাহিয়ান খান বলেন, আগে প্রতিদিন ১০০ কেজি সবজি এলেও এখন আসে মাত্র ৬০ কেজি। পাইকারিতেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। নতুন সরবরাহ না আসা পর্যন্ত আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে দাম কমার সম্ভাবনা কম।
মাছের বাজারেও একই চিত্র। দুই থেকে আড়াই কেজি ওজনের রুই মাছ, যা কিছুদিন আগেও ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা ছিল, এখন ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তেলাপিয়া ২২০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙ্গাশ ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, কই ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, পাবদা ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং চাষের চিংড়ি ৯০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় এক কেজি ওজনের ইলিশ কিনতে গুনতে হচ্ছে এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত।
মিরপুর-৬ বাজারে পাইকারি মাছ ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেন বলেন, টানা বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকার ঘের ও পুকুর তলিয়ে যাওয়ায় মোকামে মাছ কম উঠছে। ফলে আড়তেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, যার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ছে।
এ দিকে ডিমের বাজারেও বেড়েছে দাম। এক সপ্তাহ আগে ১২০ থেকে ১২৫ টাকা ডজনে বিক্রি হওয়া ফার্মের ডিম এখন ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডিম ব্যবসায়ীরা বলছেন, সবজির দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক ভোক্তা ডিমের দিকে ঝুঁকেছেন। এতে চাহিদা বাড়ায় দামও বেড়েছে।
মুরগির বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং সোনালি ৩৩০ থেকে ৩৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর গোশতের কেজি ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা এবং খাসির গোশত এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা।
ক্রেতাদের অভিযোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কিছুটা মূল্যবৃদ্ধি স্বাভাবিক হলেও বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি দাম বাড়ানো হচ্ছে। পল্লবীর বাসিন্দা হুমায়রা হোসেন বলেন, বৃষ্টির কারণে সরবরাহ কিছুটা কমতে পারে; কিন্তু যেভাবে কাঁচামরিচসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে, তা অস্বাভাবিক। সাধারণ মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
একই এলাকার ক্রেতা রমিজ উদ্দিন বলেন, কম আয়ের মানুষের ভরসা ছিল পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া ও ব্রয়লার মুরগি। এখন সেগুলোর দামও নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আবহাওয়ার উন্নতি এবং উৎপাদন এলাকাগুলো থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাজারে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।



