নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘদিনের আন্দোলন, গণস্বাক্ষর ও জনদাবির মধ্যে শেষ পর্যন্ত সরকারি গেজেটে ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে ‘দক্ষিণ গফরগাঁও’ নামে নতুন উপজেলা গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। তবে নতুন উপজেলার সদর দফতর পাগলা থানার পরিবর্তে উস্তি ইউনিয়নের নয়াবাড়ি মৌজায় নির্ধারণ করায় এলাকায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
গত বুধবার প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটে বলা হয়েছে, মশাখালী, পাগলা, উস্তি, লংগাইর, পাইথল, দত্তের বাজার, নিগুয়ারী ও টাংগাব এই আট ইউনিয়ন নিয়ে ‘দক্ষিণ গফরগাঁও’ উপজেলা গঠন করা হয়েছে। একই সাথে উপজেলার সদর দফতর উস্তি ইউনিয়নের ১৪৩ নম্বর জে এল ভুক্ত নয়াবাড়ি মৌজায় স্থাপনের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।
গেজেট প্রকাশের পর পাগলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের জনআকাক্সক্ষা, ভৌগোলিক বাস্তবতা ও প্রশাসনিক সুবিধা উপেক্ষা করেই সদর দফতরের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গফরগাঁও উপজেলার মোট ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মধ্যে নতুন উপজেলার অন্তর্ভুক্ত আটটি ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে পাগলা থানার প্রশাসনিক সেবা গ্রহণ করে আসছে। পাগলা ভৌগোলিকভাবে নতুন উপজেলার প্রায় মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত হওয়ায় এখানেই উপজেলা সদর হলে সব ইউনিয়নের মানুষের জন্য যাতায়াত সহজ হতো। পাশাপাশি পাগলায় আগে থেকেই থানা, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে।
অন্য দিকে উস্তি ইউনিয়নের নয়াবাড়ি মৌজা গফরগাঁও উপজেলা সদরের খুব কাছাকাছি। স্থানীয়দের দাবি, পাগলা থেকে নয়াবাড়ির দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হলেও নয়াবাড়ি থেকে বর্তমান গফরগাঁও উপজেলা সদর মাত্র তিন কিলোমিটারের মতো। ফলে নতুন উপজেলা গঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য দূরবর্তী জনগণের প্রশাসনিক সেবা সহজ করা- কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাচ্চু নির্বাচনের আগে পাগলা থানাকে উপজেলায় উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমে তিনি পাগলা থানার নামেই উপজেলা গঠনের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দেন। পরে সেই অবস্থান পরিবর্তন করে ‘আদর্শনগর’ নামে নতুন প্রস্তাব পাঠান। স্থানীয়দের দাবি, এমপির বাড়ি উস্তি ইউনিয়নের নয়াপাড়া এলাকায়, যা আদর্শপাড়া মৌজার অন্তর্ভুক্ত। তাদের অভিযোগ, ওই মৌজার নাম অনুসারেই উপজেলার নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত একই এলাকার নয়াবাড়ি মৌজাকে সদর দফতর হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংসদ সদস্য।
এ দিকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ‘নতুন উপজেলা ও থানা স্থাপন (সংশোধিত) নীতিমালা, ২০০৪’ অনুযায়ী নতুন উপজেলার সদর দফতর নির্ধারণে এলাকার কেন্দ্রস্থল, জনসাধারণের যোগাযোগ সুবিধা এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, নয়াবাড়ি মৌজা নির্বাচন এসব বিবেচনার সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা সরকার সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা করা উচিত।
পাগলা থানার নামে উপজেলা এবং পাগলাসংলগ্ন এলাকায় সদর দফতরের দাবিতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন, বিক্ষোভ, গণস্বাক্ষর কর্মসূচি ও স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে। অপর দিকে গত ৩০ জুন উস্তি ইউনিয়নের কান্দিপাড়া বাজারে ‘আদর্শনগর উপজেলা’ বাস্তবায়নের দাবিতে এমপি সমর্থকদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সম্প্রতি বগুড়ায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পরিবারের সদস্যদের নামের সাথে মিল রেখে কয়েকটি ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, সেই ঘটনার সাথে গফরগাঁওয়ের ঘটনাকে তুলনা করছেন অনেক স্থানীয় বাসিন্দা। তাদের মতে, প্রশাসনিক ইউনিটের নাম ও অবস্থান নির্ধারণে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রভাবের অভিযোগ উঠলে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়।
অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, ‘উপজেলা গঠন সম্পূর্ণ সরকারের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। জনগণের সুবিধা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতামতের ভিত্তিতেই প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এখানে ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ নেই।’ ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো: সাইফুর রহমান বলেন, “সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করেই প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। উপজেলা গঠন ও সদর দফতর নির্ধারণ সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাস্তবায়িত হবে।’
গেজেট প্রকাশের পর পাগলা এলাকার আন্দোলনকারীরা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, নতুন উপজেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র নির্ধারণে জনমত, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং সরকারি নীতিমালার আলোকে বিষয়টি আবার পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।



