রফিকুল হায়দার ফরহাদ - যুক্তরাষ্ট্র থেকে
ডালাস স্টেডিয়ামের সেমিফাইনাল পার করল ৭৯ মিনিট। তখন হয়তো ফরাসিরা মনে করেছিলেন তাদের জন্য ফিরে আসবে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে চার বছর আগের সেই স্মৃতি। যেখানে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে দুই গোলে পিছিয়ে থাকা ফ্রান্স ৮০ ও ৮১ মিনিটেই স্কোর ২-২ করে ফেলেছিল আর্জেন্টিনার বিপক্ষে। দু’টি গোলই করেছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। পরশু যুক্তরাষ্ট্রের মাঠের এই ম্যাচটি ফাইনাল নয়, ছিল সেমিফাইনাল। প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনার স্প্যানিশ বংশোদ্ভূতদের পূর্বপুরুষের বংশোধর বর্তমান স্পেন দল। তাদের রক্ষণভাগ আর্জেন্টিনার মতো নড়বড়ে নয়। যে জন্য এবার আর পারলেন না এমবাপ্পে। ৮১, ৮৬, ৮৯ এবং সর্বশেষ ৯৭ মিনিটে তার চেষ্টাগুলো বিফলে যায়। ফলে ২২ ও ৫৮ মিনিটে স্পেনের করা দুই গোলই বহাল থাকল ম্যাচের স্কোর সিটে। তাই এল সালভাদরের রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই স্প্যানিশদের ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠার বাঁধ ভাঙা উল্লাস। আর ফরাসিদের ফাইনালে খেলতে না পারার বুক ফাটা আর্তনাদ। ২-০তে চলতি বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনাল জিতে স্পেন এখন ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার জয়ী দলের অপেক্ষায়। অন্য দিকে ২০১৮-এর চ্যাম্পিয়ন এবং ২০২২-এর রানার্সআপদের খেলতে হবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ।
এই সেমিফাইনাল ম্যাচে লড়াইটা হবে লামিনে ইয়ামাল এবং কিলিয়ান এমবাপ্পের মধ্যে। খেলার আগ থেকে বলাবলি করা এই লড়াই-ই হয়েছে মাঠে। ম্যাচে অবশ্য উঠতি তারকা এবং পুরনো তারকার কেউ-ই গোল করতে পারেননি। তবে এই দ্বৈরথে এগিয়ে গেছেন টিনএজ মুসলিম তারকা লামিনে ইয়ামাল। বারবার আতঙ্ক ছড়াচ্ছিলেন ফরাসির রক্ষণভাগে নিজে বার কয়েক গোলের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেও স্পেনকে লিড এনে দেয়া গোলের নেপথ্য নায়ক তিনিই। তার আদায় করা পেনাল্টি থেকেই মিকেল ওয়ারজাবাল এগিয়ে নেন ২০১০-এর চ্যাম্পিয়নদের।
ঘটনাটা ম্যাচের ২০ মিনিটে। বক্সের মধ্যে হাওয়ায় ভাসা বল ক্লিয়ার করতে সাইড ভলি নিতে যাচ্ছিলেন ফরাসি ডিফেন্ডার লুকাস ডিগনে। ততক্ষণে ইয়ামাল ছুটে এসে সেই বলের দখল নিতে যান। সেই সময়ে ডিগনের লাথি বলে না লেগে আঘাত করে ইয়ামালের উরুতে। ফলে সাথে সাথে পেনাল্টি কিকের নির্দেশ দেন রেফারি। এই স্পট কিক থেকে বল জালে পাঠাতে কোনো সমস্যাই হয়নি ওয়ারজাবালের। ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মেগনান বাম দিকে শরীর ভাসালেও বলের উচ্চতায় পরাস্ত হন।
এরপরই ৩ মিনিটে ফ্রান্স আরেকটি ধাক্কা খায় ডিফেন্ডার উইলিয়ান সাবিলা ইনজুরির জন্য মাঠ ছাড়লে। ৩৬ মিনিটে ব্রাডলি বারকোলার শট বারের ওপর দিয়ে গিয়ে গোলবঞ্চিত করে ফ্রান্সকে। ৩৮ মিনিটে ফরাসি গোলরক্ষকের ভুল পাস থেকে স্পেন ব্যবধান বৃদ্ধির সুযোগ পেলেও ফাবিয়ার রুইজের টোকো কর্নার হলে রক্ষা পায় ফ্রান্স। সে সাথে কিপার মাইক মেগনান। ৪২ মিনিটে সময়মতো পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে এসে এমবাপ্পেকে গোল করতে দেননি স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন। ৫১ মিনিটে ওয়ারজাবালের শট ফ্রান্সের পোস্টে যায়নি।
ম্যাচে ফেরার জন্য ৫৬ মিনিটের মধ্যে তিন ফুটবলার বদল করেন ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম। তাতে কাজতো হয়ইনি উল্টো ৫৮ মিনিটে দ্বিতীয় গোল হজম। অবশ্য এ জন্য রেফারির অ্যাডভানটেজ নীতিরই সুযোগ নিয়েছে স্পেন। বক্সের ঠিক সামনে দানি ওলমোকে ফাউল করেন ফ্রান্সের দায়োত উপামেকেনো। রেফারি ফাউলের বাঁশি বাজাবেন এই অনুমানে একটু গা ছাড়া ভাব ফরাসি অন্য ডিফেন্ডারদের। অন্য দিকে ফাউলের পরপরই বল পেদ্রো পোরোর কাছে গেলে রেফারি ক্যারি অন বলে খেলা চালিয়ে যেতে বলেন। এই সুযোগে ফাঁকায় থাকা পেদ্রো বক্সে ঢুকে গোলরক্ষকের বাম পাশ দিয়ে বল জালে ঠেলেন। ৬১ মিনিটে উঠতি সেনসেশন লামিনে ইয়ামাল গোল করলেও তা বাতিল হয় অফসাইডে।
দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পরও ফরাসিরা খেলা ছেড়ে দেননি। এমবাপ্পে কেন্দ্রিক চলতে থাকে গোল পরিশোধের চেষ্টা। ৬৩ মিনিটে তার বাম পায়ের শট কর্নার করেন বিপক্ষ শেষ প্রহরী। ৬৪ মিনিটে এমবাপ্পের শট স্প্যানিশ ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়ার পায়ের ছোঁয়ায় বাধা প্রাপ্ত হয়ে পোস্ট ঘেঁষে বাইরে যায়। ৭৮ মিনিটে ফেরান টরেসের হেড অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে ব্যবধান বাড়েনি স্পেনের।
এরপর ১৯৯৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের শেষ ১০ মিনিটের ব্যর্থ খেলা। ৮১ মিনিটে লব থেকে ফাঁকায় বলও পেয়েছিলেন কাতার বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জেতা স্ট্রাইকারটি। কিন্তু এমবাপ্পে বলের কাছে যাওয়ার আগেই হেডে বল ক্লিয়ার করেন স্পেনের কিপার উনাই সিমন। তখন বক্সের বাইরে সিমন। ফাঁকায় বল পেয়ে যান দেজিরে দুয়ে। তিনি সেখান থেকে ঠিকমতো পোস্টে শট নিতে পারলেই গোল হতো। কিন্তু তার নিচু শট ঠেকাতে কষ্ট হয়নি স্পেনের গোলরক্ষকের।
৮৬ মিনিটে হতাশ হয়ে গোলরক্ষককে ধাক্কা মেরে দেখেছেন হলুদ কার্ড এমবাপ্পে। ৮৭ মিনিটে তিনি বক্সের ঠিক বাইরে থেকে পাওয়া ফ্রি-কিকটিও মারেন বার উঁচিয়ে। ৮৯ মিনিটে তার পোস্টে বলে টোকা মারার আগেই ক্লিয়ার করেন ঝাঁকড়া চুলের ডিফেন্ডার কুকুরেয়া। ৯৭ মিনিটেও এমবাপ্পের ডান পায়ের ট্রেড মার্ক বাঁকানো শট বারের সামান্য ওপর দিয়ে যাওয়ায় ০-২ গোলের হার দিয়েই সেমিতে থেকে বিদায় নিতে হয় দুইবারের চ্যাম্পিয়নদের। অথচ এমন শটে বহু গোল আছে তার। আসলে দিনটি ছিল না এই ফরোয়ার্ডের। এই হারে ইউরোর পর বিশ্বকাপেও সেই স্পেনের কাছে স্বপ্ন ভঙ্গ ফ্রান্সের।



