ক্রীড়া প্রতিবেদক
ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ম্যাচগুলোর একটি হতে যাচ্ছে পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়ার লড়াই। দুই ইউরোপীয় শক্তির এই মুখোমুখি শুধু নকআউট পর্বের একটি ম্যাচ নয়, বরং দুই প্রজন্মের ফুটবল দর্শন, অভিজ্ঞতা ও মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষা। এক দিকে তারকাখচিত পর্তুগাল, অন্য দিকে বড় টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক সাফল্যের জন্য পরিচিত ক্রোয়েশিয়া। শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিতে বাংলাদেশ সময় আজ দিবাগত রাত শেষে ভোর ৫টায় টরন্টোতে মুখোমুখি হবে ইউরোপের দুই জায়ান্ট।
গ্রুপ পর্বে প্রত্যাশামতো আধিপত্য দেখাতে পারেনি পর্তুগাল। দলটি অপরাজিত থাকলেও গ্রুপ পর্বে দু’টি ড্রয়ের কারণে গ্রুপ সেরা হতে পারেনি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দল। গ্রুপের প্রথম ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ গোলে হতাশাজনক ড্রয়ের মাধ্যমে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করেছিল তারা। দ্বিতীয় ম্যাচে উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত করে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। সেই ম্যাচে জোড়া গোল করে আবারো নিজেকে প্রমাণ করেছেন অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড রোনালদো। বয়স বাড়লেও বড় মঞ্চে তিনি এখনো পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন, সেটিই প্রমাণ। এরপর কলম্বিয়ার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ে গ্রুপে রানার্সআপ হয়ে দ্বিতীয় পর্বে জায়গা করে নেয়া পর্তুগালের। তবে নকআউট পর্বে শুধু রোনালদোর ওপর নির্ভর করলে চলবে না, নিজেদের সেরাটা দিতে হবে ব্রুনো ফার্নান্দেজ, বার্নার্দো সিলভা, ভিতিনহা ও জোয়াও নেভেসদেরও।
টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বয়স্ক আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে আবার আক্রমণভাগের নেতৃত্ব দেবেন রোনালদো। টানা ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম ফুটবলার হিসেবে রেকর্ডটি তার নামের জড়িয়ে আছে। দলের গোলপোস্ট সামলাবেন অভিজ্ঞ দিয়োগো কস্তা। রক্ষণভাগে আছেন নুনো মেন্ডেস, রেনাতো ভেইগা, রুবেন দিয়াস ও জোয়াও ক্যানসেলো। মাঝমাঠে আছেন ভিতিনহা, নেভেস ব্রুনো ফার্নান্দেজ।
অন্য দিকে আবারো দেখিয়েছে বড় টুর্নামেন্টের কেন অন্যতম কঠিন প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়া। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে হারলেও পরের দুই ম্যাচে ঘুরে দাঁড়িয়ে নকআউট নিশ্চিত করেছে ক্রোয়েটরা। দ্বিতীয় ম্যাচে পানামার বিপক্ষে ১-০ গোলে জয়ের মাধ্যমে জ¬াতকো ডালিচের দল ঘুরে দাঁড়ায় এবং গ্রুপ ‘এল’-এর শেষ ম্যাচে ঘানাকে ২-১ গোলে হারায়। এই ম্যাচে ৮৩ মিনিটে নিকোলা ভøাসিচের জয়সূচক গোলটি তৈরি করে দিয়ে লুকা মডদিচ বিশ্বকাপে অ্যাসিস্ট করা সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় হিসেবে রেকর্ড গড়েন। বিশ্বকাপের অন্যতম ধারাবাহিক পারফর্মার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে দলটি। ২০১৮ সালে রানার্সআপ এবং চার বছর পর কাতারে তৃতীয় স্থান অর্জনের পর এবারো অনেক দূর যাওয়ার লক্ষ্য তাদের সামনে। এই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের অভিজ্ঞতা ও মানসিক দৃঢ়তা। কঠিন পরিস্থিতিতে কিভাবে ম্যাচে টিকে থাকতে হয়, তা খুব ভালোভাবেই জানে ক্রোয়েটরা।
ডালিচের দলে লেফট-ব্যাকে ফেরার কথা রয়েছে ইয়োস্কো গার্দিওলের। ফলে বাম প্রান্তে আরো সামনে এগিয়ে যেতে পারবেন ইভান পেরিসিচ। মাঝমাঠে মাতেও কোভাচিচের সাথে জুটিতে আছে মডরিচ ও পেতার সূচিচ। আছেন গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে জয় নিশ্চিত করা ভøাসিচও।
ম্যাচটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ রোনালদো ও লুকা মডরিচ। সম্ভাব্য দুই দেশের দুই কিংবদন্তির এটাই হবে বিশ্বকাপে শেষ লড়াই। দীর্ঘদিন ইউরোপীয় ফুটবলে আধিপত্য বিস্তার করে স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে এক সাথে অসংখ্য শিরোপা জয়ের স্মৃতি আছে দু’জনের। তবে এবার তারা একে অপরের প্রতিপক্ষ। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটি আবেগেরও একটি ম্যাচ, কারণ দুই তারকার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হতে পারে এই লড়াই।
রবার্তো মার্টিনেজের দল ধৈর্য ধরে আক্রমণ গড়ে তোলে এবং মিডফিল্ড থেকে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাসী। উইং ব্যবহার, দ্রুত পাসের সমন্বয় এবং বক্সের আশপাশে সৃজনশীলতা হবে তাদের প্রধান অস্ত্র। তবে গ্রুপ পর্বে ধারাবাহিকতা না থাকায় নকআউট ম্যাচে তাদের আরো কার্যকর হতে হবে। তবে বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখতে চাইবে পর্তুগাল।
অন্য দিকে বরাবরের মতোই মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে ক্রোয়েশিয়া। মডরিচের অভিজ্ঞতা, কোভাচিচের পরিশ্রম ও রক্ষণভাগে গাভার্দিওলের দৃঢ়তা তাদের আত্মবিশ্বাস জোগাবে। আক্রমণে খুব বেশি ঝুঁকি না নিয়ে তারা প্রতিপক্ষের ভুলের অপেক্ষায় থাকবে। বল হারানোর পর দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং সেট-পিস থেকেও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে ক্রোয়েটরা।
সব মিলে এই ম্যাচে তারকা-ঝলক, কৌশলগত লড়াই এবং অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে ফুটবলপ্রেমীরা দারুণ এক প্রতিদ্বন্দ্বিতা উপভোগ করতে পারেন। ইউরোপের দুই শক্তিশালী দল এর আগে ১০বার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ৭ জয় নিয়ে এগিয়ে পর্তুগাল। অপরদিকে ১টি মাত্র জয় পেয়েছে ক্রোয়েশিয়া। বাকি দু’টি হয়েছে ড্র। সাম্প্রতিক পাঁচ ম্যাচের মধ্যেও ৩ জয় নিয়ে এগিয়ে পর্তুগিজরা। আর সবশেষ ম্যাচে ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর উয়েফা নেশন্স লিগের ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়েছিল।



