সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণসমাবেশে ডা : শফিক

জুলাইয়ের সাথে বেঈমানি করলে ছাড় দেয়া হবে না

Printed Edition
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জনসভায় বক্তৃতা করেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান  : নয়া দিগন্ত
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জনসভায় বক্তৃতা করেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

নতুন করে কেউ ফ্যাসিবাদী হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের পরিণতিও আওয়ামী লীগের মতো হবে জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, জুলাইয়ের সাথে যারা বেঈমানি করবে তাদের ছাড় দেয়া হবে না। আরেকটি অনিবার্য আন্দোলনের জন্য যুবকদের প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের লড়াই চলবে। আমরা থামব না। জুলাই সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে সংসদ-রাজপথ একাকার হয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে গতকাল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস আয়োজিত গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আজকে যে মঞ্চে আমরা দাঁড়িয়েছি, এই মঞ্চের সাথে দু’টি জিনিস কখনো যাবে না, একটি হলো আধিপত্যবাদ এবং আরেকটি হলো ফ্যাসিবাদ। এই দু’টিকে এই মঞ্চ কখনোই গ্রহণ করবে না, বরদাশতও করবে না। এই মঞ্চে যারা বসে আছেন, তারা জাতির স্বার্থে, দেশপ্রেম ধারণ করার কারণে জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন আমরা অন্যায়ের কাছে মাথানত করব না। আফসোস, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের পর যারা একসময় মজলুম ছিলেন, রাজপথে আন্দোলন করেছেন, সংগ্রাম করেছেন তাদেরই একটি অংশ আজ সরকারে গিয়ে অতীতের সব কিছু ভুলে গেছেন।

তিনি আরো বলেন, ফ্যাসিবাদীরা বিভিন্ন নেতিবাচক বয়ান তৈরি করে জাতিকে বিভক্ত করেছিল। নির্বাচনের আগে বলেছিলেন আমরা সরকার গঠন করলে সবাইকে নিয়ে দেশ চালাব। এখন আপনারা কী করছেন? একজনকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন পাকিস্তানে, আরেকজনকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন অন্য দেশে আর আপনারা এ দেশে রাজত্ব করবেন!

জুলাই আন্দোলনের দু’টি স্লোগান ছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ এবং ‘দেশটা কারো বাপের নয়।’ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে শত শত আলেম-ওলামা জীবন দিয়েছেন এই দেশবাসীকে মুক্তির জন্য। আমরা সেই আলেমদের ত্যাগ বৃথা যেতে দেবো না। তিনি বলেন, যুবক ও শিশুদের কথা দিচ্ছি আমরা তোমাদের সাথে বেইমানি করব না। তোমাদের সব দাবি বাস্তবায়নে আমরা অবিচল থাকব, ইনশা আল্লাহ। আমাদের বিজয় হবে জনগণের বিজয়। ১২ তারিখের নির্বাচন সম্পর্কে বলেন, তারা সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, এটি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার। যদি সত্যিই সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হতো, তবে বারবার তা বলতে হতো না। সরকার দেশ চালাতে ব্যর্থ হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, একসময় তারাই গণভোটের দাবি জানিয়েছিল, অথচ এখন তারা একে ‘হারাম’ বলছে। একই আদেশে একটি ভোট ‘হালাল’ এবং অন্যটি ‘হারাম’ এমন দ্বিমুখী নীতি চলতে পারে না।

তিনি অভিযোগ করেন, মামুনুল হককে সংসদে যেতে দেয়া হয়নি। অতীতে হওয়া ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ ও তার কুশীলবদের এ দেশের মানুষ চেনে। অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা বলেছেন, আমরা তাদেরকে মেইনস্ট্রিমে আসতে দেইনি। তাদের ১৬৮টি আসন পাওয়ার কথা ছিল আমরা তাদের ৬৮টি আসন দিয়েছি। আবার স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, জুলাই আন্দোলনের ট্রফি লন্ডনে গিয়ে তারেক রহমানের হাতে ড. ইউনুস তুলে দিয়ে এসেছেন। এভাবেই তাহলে ইঞ্জিনিয়ারিং করে আগেই নির্বাচনের ফলাফল ঠিক করা হয়েছে।

তিনি বলেন, শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারতের পর গণভোটের পক্ষে, ‘হ্যাঁ’তে ভোট দেয়ার আহ্বান জানালেও এখন নির্বাচনের আগে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ভুলে যাওয়া হয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আমরা জুলাই বিপ্লবের সাথে গাদ্দারি করব না এবং অন্য কাউকেও তা করতে দেবো না। যুবসমাজকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা তোমাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকব। ফ্যাসিবাদ বিলুপ্ত হবে এবং দেশপ্রেমিকরাই এ দেশ শাসন করবে।

সমাবেশে সভাপতির বক্তৃতায় মাওলানা মামুনুল হক পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেন। আগামী মে, জুন ও জুলাই মাসজুড়ে দেশের প্রতিটি জেলায় ‘নাগরিক সমাবেশ’ আয়োজন শেষে আগামী ৫ আগস্ট ঢাকায় বিশাল গণমিছিল করার ঘোষণা দেন তিনি।

মামুনুল হক বলেন, জুলাইয়ের অঙ্গীকার ছিল আগামীর বাংলাদেশ গড়ে উঠবে ১৯৪৭ সাল, ২০১৩ সাল এবং ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক বিজয়ের ভিত্তির ওপর। আজ যারা মনে করেন, কেন বাংলাদেশের নাগরিকসমাজ ও ইসলামপন্থীরা জুলাই বিপ্লবের পক্ষে কাফনের কাপড় বেঁধে রাজপথে নামতে চায় আমি তাদের বলতে চাই, আমরা জুলাই বিপ্লবকে এজন্যই বাস্তবায়ন করতে চাই। কারণ, এই জুলাই বিপ্লব ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গের চেতনাকে ধারণ করে, ১৯২১ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাপটকে ধারণ করে, ১৯৪৭ সালের স্বাধীন জাতিসত্তাকে ধারণ করে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে, ২০১৩ সালের শাপলার চেতনাকে ধারণ করে এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে ধারণ করে।

তিনি বলেন, যারা ইসলামকে ভালোবাসে, বাংলাদেশকে ভালোবাসে এবং বাংলাদেশের শতবর্ষের ঐতিহ্যকে ধারণ করে তারা জুলাই বিপ্লবের বিপক্ষে থাকতে পারে না। আমি আজকের ক্ষমতাসীন বিএনপিকে বলতে চাই, আপনারা বাংলাদেশের ৫০ বছরের রাজনীতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না। শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সাথে গাদ্দারি করে বিএনপি টিকে থাকতে পারবে না।

বিএনপি নেতৃত্ব ও নেতৃবৃন্দকে উদ্দেশ করে বলেন, যে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে আপনারা জন্ম নিয়েছেন, তার সাথে গাদ্দারি করা মানে জন্মদাত্রী মায়ের গর্ভকে অস্বীকার করা। বাংলাদেশে পূর্বে তিনটি গণভোট হয়েছে কোনো গণভোটের সাথেই কেউ গাদ্দারি করেনি। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের যেখানেই গণভোট হয়েছে, কোনো গণভোটের সাথেই কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। যদি বিএনপি গণভোটের সাথে গাদ্দারি করে, তাহলে বিএনপি বিশ্বের একমাত্র গাদ্দার দল হিসেবে পরিচিত হবে।

বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রেরিত ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূতকে পৃথিবীর সকল কূটনৈতিক রেওয়াজ ভঙ্গ করে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। একজন বিজেপি নেতাকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠানো হয়েছে, অথচ এদেশের সরকার টুঁ শব্দটুকু করেনি। বন্ধুরাষ্ট্র ইরান বন্ধুত্বের দায়িত্ব পালন করে তেল দিচ্ছে; কিন্তু আমাদের কূটনীতির ব্যর্থতার কারণে বারবার সেই তেলবাহী জাহাজ আটকে দেয়া হচ্ছে। আমরা বলতে চাই, আপনারা না পারলে আমাদেরকে দায়িত্ব দিন, আমরা দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলমান নৈরাজ্য সম্পর্কে বলেন, বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেভাবে অস্ত্রের ঝনঝনানি শুরু হয়েছে, এভাবে চলতে থাকলে এর দায় একমাত্র সরকারকেই বহন করতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা দেখে এসেছি ঐকমত্য কমিশন থেকে সংস্কারের পক্ষে, জুলাই সনদের পক্ষে সর্বদাই কণ্ঠস্বর হিসেবে সবার আগে এসেছেন আল্লামা মামুনুল হক। ষড়যন্ত্র করে তাকে সংসদে যাওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে, কিন্তু রাজপথে তাকে থামানো সম্ভব নয়। আমরা সংসদে আছি, রাজপথে আছেন আল্লামা মামুনুল হক ও নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীরা। যদি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে সংসদ ও রাজপথ একাকার হয়ে যাবে। আমরা এখন একটু অল্প করে কথা বলছি, কারণ দেশে অনেক সঙ্কট। দেশের মানুষ ভালো নেই। দেশে জ্বালানি সঙ্কট, মানুষের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। দল থেকে দায়িত্বশীল বক্তব্য দেয়া হয়েছে সরকারকে সহযোগিতা করতে চেয়েছি। এই ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে রাজনীতি করতে চাইনি; কিন্তু সরকার বারবার কথার বরখেলাপ করছে।

লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান, কর্নেল (অব:) অলি আহমদ বীরবিক্রম বলেন, আমরা কেন সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আপনাদেরকে বিভিন্ন জায়গায় ডেকে সমগ্র জাতিকে জানাতে চাই এই সরকার যে কথা দিয়েছিল, সেই কথা তারা মানেনি। ইতোমধ্যে তারা প্রমাণ করেছে, প্রত্যেকটি জেলায় জেলা পরিষদে প্রশাসনিক ব্যবস্থা করেছে এবং তাদের দলীয় লোকজনকে দিয়ে পরিচালনা করছে, যা এক ধরনের বাকশালের নমুনা। আমরা কী চেয়েছি? আমরা তো কোনো গাড়ি চাইনি, বাড়ি চাইনি, আশা চাইনি, ব্যাংকের মালিক হতে চাইনি। আমরা চেয়েছি যারা বিচারপতি হবেন, তারা একটি পরীক্ষার মাধ্যমে বিচারপতি হবেন; তারা কোনো দলীয় ব্যক্তির দ্বারা প্রভাবিত হবেন না।

সমাবেশে আরো বক্তৃতা করেন, বিকেএমের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা ইউসুফ আশরাফ, নায়েবে আমির মাওলানা রেজাউল করিম জালালী, শায়খুল হাদীস মাওলানা আলী উসমান, মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমাদ, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হুসাইন, নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল মাজেদ আতহারী, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, জাগপার সহসভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ময়মনসিংহ-২ এর সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদুল্লাহ, মাদারীপুর-১ এর সংসদ সদস্য মাওলানা সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা, এনসিপির মুখ্য সংগঠক নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী, ডাকসু ভিপি আবু সাদেক কায়েম, ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের, বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের সভাপতি মাওলানা জাহিদুজ্জামান ও বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিসের সভাপতি মুহাম্মাদ আব্দুল আজিজ প্রমুখ।