মো: রবিন ইসলাম
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ। চর্যাপদগুলো বৌদ্ধ সহজিয়াদের সাধনসঙ্গীত হলেও তাতে সমসাময়িক যে বাস্তব সমাজের চিত্র পাওয়া যায় তা অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। চর্যাপদসমূহে যে দেশকালের ছায়া পড়েছে তার পরিচয় একালের পণ্ডিত ও পাঠকের কাছে যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক। চর্যাপদে যে সমাজের চিত্র বিধৃত হয়েছে তা ছিল সামগ্রিকভাবে পূর্ব ভারতের। তবে অনেক চর্যায় সেকালের বাংলা ও বাঙালির জীবনের বাস্তব রসমূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করেছে। যা ছিল আমাদের অতীতের হাজার বছর আগের সমাজচিত্র।
চর্যাপদের কবি ও বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা বিভিন্ন কালে ও বিভিন্ন সময়ে বর্তমান ছিলেন বলে তাদের সমাজও হয়তো ভিন্ন রকম ছিল। তবে তারা সবাই সিদ্ধা ছিলেন বলে কালের ব্যবধানের সত্ত্বেও একই পরিবেশে তাদের সিদ্ধা জীবন অতিবাহিত হয়েছে। তাই তাদের সমাজচিত্র চর্যাপদে খুব সহজেই প্রত্যক্ষ করা যায়। তা ছাড়া চর্যাপদের মধ্য দিয়ে কেউ যদি তৎকালীন বাংলার একটি ভৌগোলিক রূপ কল্পনা করতে চেষ্টা করে তবে প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে উঠবে একটি নদীমাতৃক সুন্দর দেশ। তার মধ্যে কোথাও অরণ্য, কোথাও ছোটখাটো টিলা। বাংলায় যেমন ছিল অসংখ্য নদী, তেমনি ছিল খুব বেশি হাতি ও হরিণ। তা ছাড়া হরিণ শিকারের কথা তো একাধিক চর্যায় এসেছে, আবার হাতির কথাও। তবে চর্যাগীতিতে বিধৃত সমাজচিত্র একান্তভাবে বাংলার বা বাঙালির নয়, সমগ্র পূর্ব ভারতের। চর্যাপদের রচয়িতারা ছিলেন বৌদ্ধতাত্মিক যোগী পুরুষ। তারা সামাজিক-বিত্তবান ও শিক্ষা-সংস্কৃতিপুষ্ট বৌদ্ধ সমাজ থেকে বিচ্যুত ছিলেন। হীনযানি, থেরবাদি, মহাযানি আনুষ্ঠানিক ধর্মচারীদের কাছে চর্যা ছিল অবেজ্ঞেয়। পূর্ব ভারতে এ প্রান্তিক অরণ্য ছিল তাদের গুহ্য সাধনতত্ত্বের প্রসারক্ষেত্র। এ প্রসঙ্গে ড. আহমদ শরীফের মন্তব্য প্রাণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন- চর্যাপদের বিধৃত জীবন-জীবিকা ও প্রতিবেশ উড়িষ্যা-বিহার-বাংলা-আসামের প্রতিনিধি-স্থায়ী বৃহত্তর সমাজের চিত্র দান করে না। কেবল বহিঃগ্রামবাসী অন্তঃজ্যশ্রেণীর চিত্র বহন করে।
চর্যাপদে যাদের চিত্র পাওয়া যায় তারা ছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অবহেলিত বিপর্যস্ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। তাই চর্যাপদের ভাষা বস্তুবাচক শব্দ, উপমান-উপমিত, পদ, পেশা, প্রতিবেশ, তৈজসপত্র, ঘরবাড়ি,ব্যবহৃত সামগ্রী প্রভৃতি নিঃস্ব ও নিচু শ্রেণীর মানুষের বাস্তব জীবন-জীবিকা ও সমাজ থেকে গৃহীত।
বেশির ভাগ চর্যাগীতিতে সমাজের নিচুস্তরের মানুষের কথা অর্থাৎ, ডোম-ডোমনি, নাথ, যোগি, শবর শবরি, নিষাদ, কাপালিক- এসব সম্প্রদায়ের কথা বলা হয়েছে। এরা অভিজাত সমাজ থেকে দূরে পর্বত ও গ্রামের প্রান্তে টিলায় বাস করত। ব্রাহ্মণদের কাছে তারা ছিল অস্পৃশ্য। যা ১০, ২৮ ও ৩৩ নং চর্যায় পাওয়া যায়। লোকালয় থেকে দূরে বাস করা এসব শ্রেণীর মানুষের জীবিকাও ছিল স্বতন্ত্র। তাদের আর্থিক অবস্থা ছিল শোচনীয়। কোনো সম্মানজনক পেশা তাদের ছিল না। কাপালিক, যোগি, ডোম্বি, চণ্ডালি, তাঁতী, ব্যাধ, ধুনরি, শবরি, শুঁড়ি, মাহুত, নটরটি, পতিতা প্রভৃৃতি নিম্ন শ্রেণীর মানুষের কথা চর্যায় বর্ণিত হয়েছে। তাদের জীবিকা সহজ ছিল না সুখের ও ছিল না। উঁচু শ্রেণীর মানুষের সাথে তাদের কোনো সম্পর্কও ছিল না। কেবল বেচাকেনার বা দাস-প্রভুর সম্পর্ক।
নদীবহুল অঞ্চলের ভেলা, বেনি, নৌকা, গুণ, চকা, পতিবালা, দুখোল, কাছি, ঘুণ্টি, পাল, জলসেচ ও মাঝি-মাল্লার রূপক-উপমা স্বাভাবিকভাবেই এসেছে। ব্যাধ কর্তৃক হরিণ শিকারের কথার সুন্দর বর্ণনা পায় ভুসুকু পা রচিত ৬ নং চর্যায়।
নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌকা একটি সাধারণ উপমা। নৌকা চালনা, গুণ টানা, জল সেচা ইত্যাদির চিত্র পাওয়া যায়, যা এ দেশের মানুষের জনপ্রিয় বৃত্তি ছিল। কুড়াল দিয়ে গাছ কাটার কথাও পাওয়া যায়।
চর্যাপদের শাসনব্যবস্থায় কোটালের কথা থাকলেও সে শাসনব্যবস্থা ত্রুটিমুক্ত ছিল না। দুই নং চর্যায় ‘কানেট চোরে নিল অধরতি’-উক্তিটিতে তার প্রমাণ মেলে। তা ছাড়া ৩৩ ও ৩৮ নং চর্যায় চোর-ডাকাতের কথা উল্লেখ আছে। ৪ নং চর্যায় চোরের ভয়ে ঘরে তালা লাগানোর কথা আছে।
তৎকালীন সমাজে নৈতিক অবস্থাও খুব উন্নত ছিল না। নগরালি, কামচণ্ডালি, পতিতা, ছিনালি, লম্পট প্রভৃতি রূপক চর্যাগুলোতে একাধিকবার এসেছে। ৩৩ নং চর্যায় দরিদ্র অস্পৃশ্যের ঘরে অভিজাত যুবকের আনাগোনার কথা পাওয়া যায়। আবার ২ নং চর্যায় অসতী বধূর কথাও আছে, যে দিনের বেলায় কাকের ভয়ে ভীত অথচ রাতে অভিসারে কামরূপে যায়। তা ছাড়া সমাজের অধঃপতনের সাথে মদের একটি সম্পর্ক থাকে যা ৩ নং চর্যায় মেলে। মদের দোকানে মদ তৈরি করে বিক্রয় করার উল্লেখ আছে। ৫০ নং চর্যায় শবর-শবরির মদে মাতাল হওয়ার দৃশ্য আছে।
আমোদ প্রমোদের উপাদান হিসেবে দাবাখেলার উল্লেখ আছে ১২ নং চর্যায়। দাবা খেলার ঠাকুর বলা হতো রাজাকে। অন্যান আমোদ-প্রমোদ হিসেবে নৃত্যগীত এসবের কথা আছে। নাচগানের সাথে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারের ও প্রমাণ মেলে। একতারা, বীণা, হেরুক, ডমরু, বাঁশি, পটহ, মঙ্গল ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়।
লোকায়ত সমাজের নানা ক্রিয়াকর্ম, আচার-অনুষ্ঠান, উৎসবের সংক্ষিপ্ত বিবরণ চর্যাপদে আছে। সে যুগেও বর ধুমধাম করে বাজনা বাজিয়ে বিয়ে করতে যেতেন। ১৯ নং চর্যায় যৌতুকের লোভে ছোট ঘর থেকে বিয়ের বর্ণনা পাওয়া যায়। বাসরঘরে বর তিন ধাতু নির্মিত খাটে বধূকে নিয়ে রাত কাটাত। কর্র্পূর দিয়ে বরের পান খাওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায় ২৮ নং চর্যায়।
চর্যায় একান্নবর্তী পরিবারের গঠন চিত্র পাওয়া যায়। সংসার জীবনে শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ, পুত্র, শালি একসাথে ঘর করত।
চর্যাকারদের মধ্যে অনেকে সমাজজীবনে উচ্চ শ্রেণীর অধিবাসী ছিল। তবে চর্যায় মূলত অন্তজ্যশ্রেণীর মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বেদনাবিধুর ছবিই প্রত্যক্ষ করা যায়। আধ্যাত্মিকতার রূপক দিয়েও সমাজের বিষাদময় মুখচ্ছবি আড়াল করা যায়নি। তবে চর্যায় নদ-নদী, নৌযাত্রা, নৌকার বিভিন্ন অংশের বর্ণনা, নৌবাণিজ্য, জলদস্যুদের আক্রমণ ইত্যাদির যে চিত্র পাওয়া যায় তাতে চর্যার পটভূমি নদীমাতৃক বাংলাদেশ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মগধ, উড়ষ্যা, বাংলা ও কামরূপ প্রভৃতি অঞ্চলের বিস্তৃত পটভূমিকায় চর্যার জীবনচিত্র অঙ্কিত হলেও বাঙালির জীবনচিত্র হিসেবে এর দাবি সম্পূর্ণ যৌক্তিক বলা যায়।
চর্যায় বর্ণিত সমাজচিত্র থেকে আজকের আধুনিক সমাজ খুব বেশি কি এগিয়েছে? বর্তমান সমাজেও ঠিক সেই সময়কার পরিবেশ পরিস্থিতি বিরাজমান। কিছুটা ধরন বদল হয়েছে। আজকের সমাজের নিম্ন শ্রেণীর মানুষের জীবনযাপন এবং পেশার সাথে অনেকাংশেই মিল রয়েছে। প্রাচীন সমাজ থেকে বর্তমান সমাজের আয়োজন প্রয়োজন অনেকাংশে বেড়েছে। যান্ত্রিক সাফল্য ও সুযোগ সুবিধা বেড়েছে। কিন্তু সামগ্রিক বিরাজমান সমাজচিত্র সেই সময়েরই ধারাবাহিক ইঙ্গিত দিচ্ছে। সমাজে অন্যায় অবিচার তখনো ছিল, আজও আছে। শুধু রূপ বদল ঘটেছে। কবিতা যে একটি সমাজের দর্পণ হয়ে ওঠে চর্যাপদ তারই বাস্তব উদাহরণ।



