ঘর থেকে বের হওয়ার আগে বাবা-মায়ের উদ্দেশে একটি চিঠি রেখে যায় দশম শ্রেণীর ছাত্র শাহরিয়ার খান আনাস। ‘যদি বেঁচে না ফিরি, গর্বিত হইয়ো’- চিঠিতে এই কথাগুলো লেখার কয়েক ঘণ্টা পরই ৫ আগস্ট চানখাঁরপুল এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয় সে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল আনাস। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, বাইরে খুব বেশি কিছু প্রকাশ না করলেও মৃত্যুর পর তার পড়ার টেবিলে পাওয়া একটি খাতায় আন্দোলন নিয়ে সাত-আট পৃষ্ঠাজুড়ে লেখা নানা ভাবনা থেকে বোঝা যায়, রাষ্ট্র ও সমাজের ঘটনাপ্রবাহ তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
৪ আগস্ট রাতে নিজের স্কুলব্যাগে কয়েক সেট কাপড় ও প্রয়োজনীয় ওষুধ গুছিয়ে রাখে সে। পরদিন গেন্ডারিয়ার বাসা থেকে বের হওয়ার আগে বাবা-মায়ের উদ্দেশে ওই চিঠি রেখে যায় সে। চিঠিতে আনাস জীবনের ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চেয়ে লিখেছিল, যদি সে আর ফিরে না আসে, তবে যেন পরিবার তার জন্য গর্ববোধ করে।
পরিবার জানায়, আন্দোলনের পথঘাট ভালোভাবে না চিনলেও এক প্রাইভেট টিউটরের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা নিয়েছিল আনাস। ৫ আগস্ট সকালে তাঁতীবাজার হয়ে অন্য শিক্ষার্থীদের সাথে চানখাঁরপুলের দিকে যায় সে। পথে এক শিক্ষার্থী তার বড় ব্যাগের কারণ জানতে চাইলে আনাস বলেছিল, বাসায় ফিরলে আর বের হতে দেয়া হবে না, তাই আন্দোলন শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাইরে থাকার প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে।
ঘটনার দিন চানখাঁরপুল এলাকায় পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত। টিয়ার শেল ও গুলির মধ্যে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে আনাস নিমতলির নবাব কাটারার একটি সরু গলিতে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করে; কিন্তু আশপাশের বাড়ি ও দোকানের দরজা-শাটার বন্ধ থাকায় নিরাপদ আশ্রয় পায়নি।
পরিবার প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে পাওয়া বর্ণনা অনুযায়ী জানায়, ওই সময় কাছ থেকে ছোড়া গুলি একটি দোকানের শাটারে লেগে আঘাত করে আনাসের বুকে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কয়েক কদম এগিয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে সে। পরে কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে নেয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়।
আনাসের পকেটে থাকা একটি ফোন থেকে দুপুরে তার মায়ের সাথে যোগাযোগ করা হয়। হাসপাতালে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা জাতীয় পতাকায় মোড়ানো তার লাশ দেখতে পান। অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে অটোরিকশায় করেই ছেলের লাশ বাসায় নিয়ে আসেন তারা। জুরাইন কবরস্থানে দাদীর কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি বলেন, একটি দিনের জন্যও ছেলেকে ভুলতে পারেননি। স্কুলপড়ুয়া কোনো কিশোরকে দেখলেই তার মনে হয়, আনাসই হয়তো স্কুলে যাচ্ছে। বাসার দরজায় শব্দ হলেই মনে হয়, ছেলে ফিরে এসেছে।
তিনি বলেন, তারা প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার চান। তার ভাষায়, ‘আমরা শুধু চাই, আমার সন্তানসহ সব শহীদ হত্যার বিচার হোক। এমন বিচার হোক, যাতে ভবিষ্যতে কোনো নিরস্ত্র মানুষের বুকে গুলি চালানোর আগে ভাবতে বাধ্য হয়।’ বিচারের বিষয়ে সরকারের সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।



