এক-এগারোর কুশীলব জে. মাসুদ গ্রেফতার

পল্টন থানায় গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ড : মানবপাচার ও হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ

Printed Edition
লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী
লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী

নিজস্ব প্রতিবেদক

আলোচিত ‘এক-এগারো’ অধ্যায়ের অন্যতম কুশীলব, বিতর্কিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী অবশেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। সোমবার দিবাগত রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএসে নিজ বাসা থেকে তাকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।

ডিবি সূত্র জানায়, তার বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মানবপাচারসহ একাধিক গুরুতর অপরাধে অন্তত ১১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ফেনী জেলায় ছয়টি এবং ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানায় পাঁচটি মামলা রয়েছে। কয়েকটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি ছিল। গ্রেফতারের পর তাকে পল্টন থানার একটি মানবপাচার মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার অতিরিক্ত কমিশনার মো: শফিকুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর মধ্যে কয়েকটি বিচারাধীন। দীর্ঘদিন তিনি পলাতক ছিলেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।’

১/১১-এর ছায়া থেকে ‘ক্ষমতার মানুষ’

‘এক-এগারো’ নামে পরিচিত ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায়। জরুরি অবস্থা জারি ও সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার পেছনে যেসব সামরিক কর্মকর্তা প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী তাদের অন্যতম বলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।

তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি ‘গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র নেতৃত্বে ছিলেন। এই কমিটির অধীনে যৌথবাহিনীর মাধ্যমে দেশব্যাপী রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ এবং দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

‘মাইনাস টু’ বিতর্ক ও রাজনৈতিক নির্যাতনের অভিযোগ

এক-এগারো-পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল তথাকথিত ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’। অভিযোগ রয়েছে, এর মাধ্যমে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক ধারার শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজনীতি থেকে সরানোর চেষ্টা হয়েছিল।

এই সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা এবং বিএনপির শীর্ষ নেতা (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) তারেক রহমান ও তার ছোট ভাই আরাফাত রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। বিশেষ করে তারেক রহমানকে গোয়েন্দা হেফাজতে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। নির্যাতনের কারণে অসুস্থ হয়ে জিয়ার কনিষ্ট ছেলে আরাফাত রহমানের অকাল মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ও সমালোচনা রয়েছে।

সেনাজীবন, কূটনীতি ও রাজনৈতিক উত্থান

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ১৯৭৫ সালে রক্ষীবাহিনী থেকে সেনাবাহিনীতে যোগদানের মাধ্যমে তার নতুন কর্মজীবন শুরু করেন। ধাপে ধাপে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে তিনি নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হন, যা তাকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর কাছাকাছি নিয়ে আসে। এক্ষেত্রে মেজর অব সাঈদ ইসকান্দরের ভায়েরা হওয়ার বিষয়টি সুযোগ হিসেবে নেয়া হয় বলে ধারণা করা হয়। অথচ পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের তিনি অন্যতম নায়কে পরিণত হন। আর এক-এগারোর সময় তিনি মেজর জেনারেল থেকে পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হন এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পরে মতবিরোধের জেরে তাকে বদলি করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় এবং অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্বে ছিলেন। অবসরের পর ২০১৮ সালে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন এবং ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও ভূমিকা রাখেন।

ব্যবসা, সম্পদ ও দুর্নীতির অভিযোগ

অবসর-পরবর্তী সময়ে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জনশক্তি রফতানি, রেস্টুরেন্ট ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে যুক্ত হন। তবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, প্রতারণা এবং বিপুল অর্থপাচারের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে বারবার উঠে এসেছে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তদন্ত করছে। একটি মামলায় প্রায় ১০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ফেনীর মহিপালে গুলিতে নিহতদের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাতেও তাকে আসামি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল।

সম্পত্তি ক্রোক ও আইনি চাপ

গত বছরের ৪ জুলাই দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনের পর আদালত তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেন। আদালত উল্লেখ করেন, বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর নামে প্রতারণা করে বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন রয়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার পর অবশেষে গ্রেফতার হওয়ায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী আবারো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন। ‘এক-এগারো’র নেপথ্যের প্রভাবশালী চরিত্র হিসেবে পরিচিত এই সাবেক জেনারেলের গ্রেফতার এখন শুধু একটি আইনি ঘটনা নয়- বরং এটি দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস, ক্ষমতার কাঠামো এবং জবাবদিহিতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

নতুন রাজনৈতিক বার্তা?

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেফতার বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই পদক্ষেপকে কেউ দেখছেন অতীতের অন্যায়ের বিচার শুরু হিসেবে, আবার কেউ এটিকে রাজনৈতিক বার্তা বা ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য তৈরির কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। মূল প্রশ্নটি তাই স্পষ্ট- এটি কি ২০০৭-০৮ সালের “ওয়ান-ইলেভেন” পর্বের জবাবদিহিতার সূচনা, নাকি নির্বাচিত বিচার।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারায় একটি টার্নিং পয়েন্ট। সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন ফখরুদ্দিন আহমেদ, আর পেছনে প্রভাব বিস্তারকারী শক্তি হিসেবে উঠে আসে সামরিক ও গোয়েন্দা কাঠামো। এই সময়কে ঘিরে দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে- ব্যাপক গণগ্রেফতার ও রিমান্ডে নির্যাতন; রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়; গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ।

অনেক বিশ্লেষক এই সময়কে “ইন্টেলিজেন্স-নিয়ন্ত্রিত প্রশাসন” হিসেবে অভিহিত করেছেন।

২০০৮ নির্বাচন ও তার পরিণতি

২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পরও নির্বাচন ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক থেমে থাকেনি।

এই নির্বাচনের ব্যাপারে সমালোচকদের অভিযোগ- অস্বাভাবিক উচ্চ ভোটার উপস্থিতি; কিছু আসনে ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সংকোচন।

২০০৯-২০২৪ সময়কালকে বিরোধী পক্ষ “কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার সময়” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এ সময় গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা এবং আর্থিক খাতে অনিয়মের অভিযোগও উঠে আসে।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী কেন গুরুত্বপূর্ণ?

গ্রেফতার হওয়া এই সাবেক জেনারেলকে অনেকেই “ওয়ান-ইলেভেন” প্রোপটের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে দেখছেন। ধারণা করা হয়, তিনি নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সময় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে এ কথাও গুরুত্বপূর্ণ- তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনেক অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। ফলে একটি স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত অপরিহার্য।

সরকারপক্ষ এই পদক্ষেপকে উপস্থাপন করছে- অতীতের অন্যায়ের বিচার শুরু হিসেবে; অদৃশ্য ক্ষমতা কাঠামোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে। অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন- কেন এতদিন পর এই পদক্ষেপ? সব পক্ষ কি সমানভাবে তদন্তের আওতায় আসবে? নাকি এটি কি রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল?

যদি “ওয়ান-ইলেভেন” পর্বের বিচার প্রক্রিয়া সত্যিই শুরু হয়, তবে তা হবে একটি বড় পরীক্ষা। প্রয়োজন হবে- নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন; ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্যগ্রহণ; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা উন্মোচন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণ। অন্যথায়, এই প্রক্রিয়া প্রতিশোধমূলক রাজনীতির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি প্রবণতা স্পষ্ট- ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে অতীত সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ বিচার খুব কমই সম্পন্ন হয়। এই প্রেক্ষাপটে “ওয়ান-ইলেভেন”-এর বিচার যদি হয়, তবে তা হতে হবে- সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও প্রমাণভিত্তিক ও স্বচ্ছ।

একটি সন্ধিণ

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেফতার একটি প্রতীকী ঘটনা। এটি হয়তো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জবাবদিহিতার নতুন অধ্যায় সূচনা করতে পারে- অথবা এটি কেবল আরেকটি রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে থাকতে পারে। সব কিছু নির্ভর করছে- এই প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় তার ওপর।