নয়া দিগন্ত ডেস্ক
রাজনৈতিক প্রভাব, বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল বিচারব্যবস্থা, মব ভায়োলেন্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম নাজুক রূপ ধারণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সরকারের ইচ্ছা পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সংস্কৃতি রয়ে গেছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে পুলিশ প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং বিচারব্যবস্থার কার্যকর সংস্কার জরুরি।
গবেষণাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স (সিআইপিজি)’ আয়োজিত ‘আইনশৃঙ্খলা অবনতির বহুমাত্রিক কারণ ও টেকসই সমাধানের উপায়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। আয়োজনে সভাপতির বক্তব্যে সিআইপিজির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো: মোজাম্মেল হক বলেন, দেশে খুনখারাবি ও সহিংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। জানমালের সুরক্ষা দেয়া সরকারের মৌলিক দায়িত্ব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুনাগরিক তৈরির উদ্যোগ এবং সর্বস্তরে সুদৃঢ় সমন্বয় ছাড়া পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি সম্ভব নয়।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির। তিনি বলেন, গত ৫৫ বছরে পুলিশকে কেবল ক্ষমতাসীনদের অনুগত করে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ১৮৬০ সালের পুরনো পুলিশ আইন, দুর্বল তদন্ত ব্যবস্থা এবং নিজেদের অপরাধের তদন্ত নিজেদের দিয়ে করানোর সংস্কৃতি পুরো ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিচার বিভাগ থেকে সরকার বছরে ১১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পেলেও বরাদ্দ দেয় মাত্র ২৬০ কোটি টাকা। আর প্রায় ৪৭ লাখ মামলার জট নিরসনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে সময় বরাদ্দ আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
সিআইপিজির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক সিনিয়র সচিব মো: সফিউল্লাহ সিঙ্গাপুর ও জাপানের উদাহরণ টেনে প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্বাধীন বিচার বিভাগ, এলাকাভিত্তিক কমিউনিটি পুলিশিং এবং গণতান্ত্রিক প্রতিফলনে গণভোট প্রবর্তনের পরামর্শ দেন তিনি।
সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো: মাসদার হোসেন বলেন, সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় মহানবী সা:-এর জীবনই সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, দু’টি মাত্র আপিল বেঞ্চ থাকায় বর্তমানে উচ্চ ও নিম্ন আদালতে বিপুল মামলা বকেয়া পড়ে রয়েছে, যা বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এ বি এম গোলাম মুস্তফা বলেন, দেশে প্রায় ৪৫ লাখ শিক্ষিত বেকার রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি মানুষকে অপরাধে ঠেলে দিচ্ছে। মোট কথা, মানুষ একবেলা না খেয়ে থাকলেও নিরাপদ জীবন চায়।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো: আবদুল কাইয়ুম ১৯৭২ সাল থেকে পরবর্তী বিভিন্ন শাসনামলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বলেন, পুলিশকে জনসেবার বদলে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহারের মানসিকতা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া সাবেক সচিব মো: হুমায়ুন কবীর আইনি কাঠামোর আগে সমাজে সৎ মানুষ তৈরির ওপর তাগিদ দেন। সিআইপিজির নির্বাহী পরিচালক ড. খুরশীদ আলমের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে বৈঠক শেষ হয়।



