কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে যৌথ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ও তুরস্ক। গতকাল শনিবার তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সাক্ষাৎকালে দুই দেশের এ যৌথ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানায়, বৈঠকে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে প্রতি বছর দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা আরো জোরদারের লক্ষ্যে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর অংশগ্রহণে একটি পরামর্শ কাঠামো বা যৌথ কমিটি গঠন করা হবে। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। বিশেষভাবে রোহিঙ্গা সঙ্কট, জলবায়ু পরিবর্তন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, যৌথ উৎপাদন ও সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। এ সময় বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা এবং জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থীকে সমর্থন দেয়ায় তুরস্ক সরকারকে ধন্যবাদ জানান তারেক রহমান।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগানকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। হাকান ফিদান প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার দেশের প্রেসিডেন্টের শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন। তিনি বলেন, তার এ সফর বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ককে কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করার প্রথম পদক্ষেপ।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে হাকান ফিদানের সাক্ষাতের সময়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন।
গত বৃহস্পতিবার রাতে তিন দিনের সফরে সিউল থেকে ঢাকায় আসেন হাকান ফাদান। গত শুক্রবার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন তিনি। এরপর রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি দেখতে কক্সবাজার যান এবং রাতে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন।
তুরস্ক ও বাংলাদেশের বন্ধুত্ব কঠিন সময়ে সংহতি প্রদর্শন করে : এক্স বার্তায় হাকান ফিদান
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, তুরস্ক ও বাংলাদেশের বন্ধুত্ব হলো এমন দু’টি জাতির বন্ধুত্ব, যারা সাধারণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কঠিন সময়ে সংহতি প্রদর্শন করে। আমরা এই বন্ধনকে আরো শক্তিশালী করতে থাকব।
তিন দিনের বাংলাদেশ সফর শেষে গতকাল এক্সে (টুইটার) দেয়া এক বার্তায় তিনি এসব কথা বলেন। হাকান ফিদান বলেন, এশিয়া-প্যাসিফিক সফরের চতুর্থ ও শেষ গন্তব্য বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাদের অভ্যর্থনা জানান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাথে আমরা বিস্তারিত বৈঠক করেছি। পুরো সফরজুড়ে আমরা গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর এক নতুন যুগে পদার্পণকারী বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশী ভাইবোনেরা যাতে শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতায় বাস করতে পারেন, তা নিশ্চিত করার জন্য গৃহীত ব্যাপক প্রচেষ্টা প্রত্যক্ষ করেছি। আমাদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের সাথে সঙ্গতি রেখে দু’দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত দৃঢ় ভিত্তির ওপর গড়ে উঠছে। আগামী দিনে আমরা প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতা আরো উন্নত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। বাংলাদেশী ভাই-বোনেদের প্রতি আমাদের সমর্থন অব্যাহত রাখব।
উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ ও জনগণকে, বিশেষ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে হাকান ফিদান বলেন, আমার শ্রদ্ধেয় ভাই ড. খলিলুর রহমান সম্প্রতি জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অত্যন্ত সাফল্যের সাথে পালন করবেন।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সফরের অংশ হিসেবে আমরা কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শনের সুযোগ পেয়েছি। ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলিমকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ এক বিরাট দায়িত্ব পালন করছে। রোহিঙ্গা সঙ্কটের একটি স্থায়ী ও ন্যায়সঙ্গত সমাধান খুঁজে বের করাই আমাদের অভিন্ন লক্ষ্য। কক্সবাজারে আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, টিকা (তার্কিশ কো-অপারেশন অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন এজেন্সি), তুর্কিয়ে রেড ক্রিসেন্ট, তুরস্ক দিয়ানেত ফাউন্ডেশন এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। আমরা তুরস্ক-বাংলাদেশ মানবিক সহায়তা হাসপাতালে কর্মরত আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের সাথে সাক্ষাৎ করেছি। মানবতার সেবায় প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কর্মরত আমাদের সব কর্মীর নিষ্ঠা, ত্যাগ এবং অনুকরণীয় প্রচেষ্টার জন্য আমরা আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
স্থানীয় পরিবেশের সাথে মিল রেখে বৃক্ষরোপণের পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাটির বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণে ভিন্নতা থাকায় স্থানীয় পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বৃক্ষরোপণের পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বৃক্ষরোপণসংক্রান্ত এক সভায় কর্মকর্তাদের তিনি এই পরামর্শ দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সব অঞ্চলের মাটির বৈশিষ্ট্য এক নয়। যে এলাকায় যে ধরনের মাটি ও পরিবেশ রয়েছে, সে অনুযায়ী গাছ নির্বাচন করে লাগাতে হবে। এতে গাছের বেঁচে থাকার হার বাড়বে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ঋতুচক্রেও দেখা যাচ্ছে পরিবর্তন। আগে জুন মাস এলেই নিয়মিত বৃষ্টিপাত হতো, কিন্তু এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। প্রকৃতির এই বিরূপ আচরণের পেছনে বনাঞ্চল ও গাছপালা কমে যাওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলে মন্তব্য করেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা ও আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলতে বৃক্ষরোপণ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
১৪ জুন কক্সবাজারে উদ্বোধন : আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের যে কর্মসূচি সরকার হাতে নিয়েছে, তার সূচনা হবে কক্সবাজার দিয়ে। কক্সবাজারের ডুলাহাজরায় এই কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এই বৃক্ষরোপণ কিভাবে হবে তা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সভায় পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার, পরিবেশ সচিব রায়হান কাওছার, পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক লুৎফুর রহমান, অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক, প্রধান বন সংরক্ষক আমির হোসাইন চৌধুরী ও ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সেলের সদস্য জামাইল বশীর জেবি উপস্থিত ছিলেন।
এ দিকে একই দিনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৃথক এক সভায় সরকার দেশী প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎচালিত অ্যাম্বুলেন্স তৈরি করবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব হাসান শিপলু। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এ সভা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব সুজাউদ্দৌলা সুজন মাহমুদ জানান, সরকার জনগণের দোড়গোড়ায় অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। এই লক্ষ্যে আজকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সভা হয়। সেখানে বিস্তারিত আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রথমে একটি উপজেলাকে মডেল হিসেবে এই প্রকল্পের অ্যাম্বুলেন্স তৈরির কাজ শুরু হবে। সরকারের উদ্যোগ সফল হলে দেশে অ্যাম্বুলেন্সের চাহিদা পূরণ হবে এবং আমদানি নির্ভরতাও কমবে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস অফিস জানায়, তিন পর্যায়ে সেবা দেয়ার বিষয়ে পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে গ্রাম থেকে উপজেলা, উপজেলা থেকে জেলা এবং জেলা থেকে রাজধানী-এ তিন ধরনের অ্যাম্বুলেন্স নির্মাণ করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সভায় বলা হয়, সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশে অ্যাম্বুলেন্সের চাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং তুলনামূলক কম খরচে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ করা সম্ভব হবে। একই সাথে জরুরি রোগী পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে বৈঠকে উঠে আসে।
সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন বকুল, প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, স্বাস্থ্য সেবাসচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী, বাংলাদেশে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ এহসান, অধ্যাপক জিয়াউর রহমান, অধ্যাপক আবদুল সালাম আখন্দ ও অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম।
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বিএনপির সংসদীয় দলের সভা
বাজেট অধিবেশন শুরুর আগের দিন গতকাল প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সংসদীয় দলের সভায় বসেছে সরকারি দল বিএনপি। বিকেল সাড়ে তিনটায় সংসদ ভবনের নবম তলায় সরকারি দলের সভা কক্ষে এই সভা শুরু হয়।
প্রধানমন্ত্রী উপ প্রেসসচিব জাহিদুল ইসলাম রনি এ কথা জানান। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বিএনপির সংসদীয় দলের সভা বসেছে। সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সঞ্চালনায় এই সভায় বিএনপি মহাসচিব, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
জাহিদুল ইসলাম রনি বলেন, রোববার বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হচ্ছে। আগামী ১১ জুন সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর এটি সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন। প্রথম অধিবেশন বসেছিল গত ১১ মার্চ।



