সিয়াম সাধনার মাস

রমজানের শিক্ষা ক্রোধ দমন

Printed Edition

লিয়াকত আলী

আজ মাহে রমজানের নবম দিবস। এ মাসের প্রধান ইবাদত সিয়াম আদায়ের বহুমুখী সুফল ও প্রতিক্রিয়া রয়েছে। একটি হলো ক্রোধ ও হিংসা দমন। রাগ বা ক্রোধ মানবিক প্রকৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ। স্থানবিশেষে রাগের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও সামগ্রিক দৃষ্টিতে রাগ কোনো ভালো গুণ নয়। দীর্ঘ দিনের তিলে তিলে করা অর্জন রাগের অপরিণামদর্শী অভিশাপে নিমিষেই বিলীন হয়ে যায়। রাগ মানুষকে বেসামাল করে তোলে। জ্ঞান, বিবেক ও ধর্মের পথ থেকে বিচ্যুত করে মানুষকে বিপথে নিয়ে যায়। রাগের আতিশয্যে বিবেক লোপ পেয়ে মানুষ হত্যার মতো মহাপাপেও লিপ্ত হয় যায়। তাই ইসলাম রাগকে মানবিক ত্রুটি আখ্যা দিয়ে রাগ নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দিয়েছে এবং রাগ দমনের নির্দেশ দানের পাশাপাশি রাগ দমনকারীর জন্য বহু পুরস্কারের কথাও ঘোষণা করেছে।

ক্রোধ দমন করতে পারা মুত্তাকিদের স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে ছুটে যাও যার প্রশস্ততা আসমান ও জমিন, যা প্রস্তুত করা হয়েছে মুত্তাকিদের জন্য, যারা সচ্ছলতায় ও অভাবের সময় ব্যয় করে, যারা নিজেদের রাগ সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে। বস্তুত আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। (সূরা আলে ইমরান : ১৩৩-১৩৪)

হজরত আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি মহানবী সাল্লাল্লøাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলল, ‘আমাকে উপদেশ দিন’। তিনি বললেন, ‘রাগ করো না’। সে ব্যক্তি কয়েকবার এ কথা বলল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লøাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেকবার বললেন, ‘রাগ করো না’। (বুখারি-৬১১৬)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লøাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন, ‘সে ব্যক্তি শক্তিশালী নয়, যে ব্যক্তি কুস্তি লড়ে অপরকে ধরাশায়ী করে; বরং প্রকৃতপক্ষে সে ব্যক্তিই শক্তিশালী, যে রাগের সময় নিজেকে সংবরণ করতে পারে।’ (বুখারি-৬৮০৯)

হজরত আবু দারদা (রা:) একবার নবী করিম সাল্লাল্লøাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি কাজের কথা বলে দিন যা আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লøাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি রাগ করবে না, তাহলে তোমার জন্য জান্নাত। (তাবারানি-২৩৫৩)

হজরত আনাস (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রতিশোধ গ্রহণের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নিজের রাগ সংবরণ করবে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন সব মাখলুকের সামনে ডেকে এনে সে যে হুরকে চায় তাকে নিয়ে নেয়ার এখতিয়ার দান করবেন। (আবু দাউদ-৪৭৭৭, তিরমিজি-২৪৯৩)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! কোন জিনিস আমাকে আল্লাহর ক্রোধ থেকে রক্ষা করতে পারে? তিনি বললেন, তুমি রাগ করো না। (সহিহ ইবনে হিব্বান-২৯৬) অর্থাৎ, তুমি রাগ করা থেকে বিরত থাকলে আল্লাহর ক্রোধ থেকে রেহাই পাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লøাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার কাছে হজম করার জিনিসের মধ্যে সর্বোত্তম হলো, কোনো ব্যক্তির নিজের রাগ হজম করে নেয়া। যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নিজের রাগ হজম করে, আল্লাহ তাকে ঈমান দ্বারা পরিপূর্ণ করে দেবেন। (মুসনাদে আহমাদ-১/৩২৭)

হজরত ইবনে উমর (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লøাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় বান্দার রাগ হজম করে নেয়া আল্লাহর কাছে বিশাল প্রতিদান লাভের মাধ্যম হয়। (মুসনাদে আহমদ-২/১২৮)

আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত আরেক হাদিসে এসেছে, নবীজি বলেন, যখন তোমাদের কেউ রাগান্বিত হয়, তখন সে যেন আউজুবিল্লাহ পাঠ করে। কেননা এতে তার ক্রোধ থেমে যাবে। ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত, নবীজি এরশাদ করেন, তোমাদের কেউ যখন ক্রোধান্বিত হয় তখন সে যেন নীরবতা অবলম্বন করে।

আরেক হাদিসে আছে- তোমাদের কেউ যদি ক্রোধান্বিত হয় আর সে তখন দাঁড়ানো অবস্থায় থাকে তবে সে যেন বসে পড়ে। যদি ক্রোধ দূর হয়ে যায় তবে তো ভালো, অন্যথায় শুয়ে পড়বে।

রাগ দমনের বিনিময় হলো জান্নাত, এ কথা স্মরণ করা দরকার। সুফিয়ান ইবনে আবদুল্লাহ সাকাফি (রা:) নবীজিকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে অল্প কথায় একটি উপদেশ দিন, যা আমার উপকারে আসে। নবীজি বললেন, তুমি ক্রোধান্বিত হবে না, এতে তোমার জন্য রয়েছে জান্নাত। যে ব্যক্তি নিজের ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, সেই হলো প্রকৃত বীরপুরুষ। হাদিসে এসেছে- কুস্তিতে পরাস্ত করতে পারা প্রকৃত বাহাদুরী নয়; বরং প্রকৃত বাহাদুর হলো সেই ব্যক্তি, যে ক্রোধের সময় নিজের প্রবৃত্তিকে দমন করতে পারে।

সিরাত ও হাদিসের গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায়, নবীজিকে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে কষ্ট দিয়েছে; কিন্তু তিনি ক্রোধ সংবরণ করেছেন এবং ধৈর্যধারণ করেছেন। সুতরাং তাঁর এই সুন্নত ও আদর্শ নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে ক্রোধ দমন করতে হবে। রমজানের এক মাস রোজা পালন মুমিন বান্দাদের মধ্যে ত্রোধ দমনের শক্তি সঞ্চার করে। আর এভাবে তাকওয়ার একটি বিশেষ উপাদান অর্জিত হয়।