নয়া দিগন্ত ডেস্ক
তেহরানকে ‘ভীষণ শয়তান’ আখ্যা দিয়ে যুদ্ধের জেরে জ্বালানির চড়া দাম মেনে নিতে দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকতে বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার নিউ ইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে সাধারণ মানুষের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, আপনারা তেলের জন্য একটু বেশি টাকা দিচ্ছেন। কিন্তু মনে রাখবেন, এটা করছেন যাতে একটা খুব খারাপ দেশ পারমাণবিক অস্ত্র হাতে না পায়। ইরান হচ্ছে সারা বিশ্বে সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বড় মদদদাতা।
তেলের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের যে ক্ষতি হচ্ছে, সেটাকে তিনি খুব বড় করে দেখছেন না। ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানে হামলা করে তিনি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। তিনি বলেন, এখন আপনাদের গ্যালনপ্রতি চার ডলার খরচ করতে হচ্ছে, যা ঠিক আছে। আমি সঠিক কাজ করেছি। এর জন্য আমি কখনো ক্ষমা চাইব না।
এর আগে হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছিলেন, তেলের দাম কম রাখা এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে দূরে রাখা। এ দুটোই প্রেসিডেন্টের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন জ্বালানি তেলের গড় দাম চার ডলার ছাড়িয়েছে। এক বছর আগেও তা তিন ডলারের কাছাকাছি ছিল। ট্রাম্প যতই এই মূল্যবৃদ্ধিকে সামান্য বলুন না কেন, সাধারণ আমেরিকানরা তাতে একমত নন। সিএনএন- এর এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৪ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, এই যুদ্ধের পেছনে মানুষের জীবন ও অর্থের যে বিপুল ক্ষতি হয়েছে, তার কোনো সার্থকতা নেই।
২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইসরাইলের শুরু করা এই সঙ্ঘাত থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। শান্তি আলোচনায় অগ্রগতি কিংবা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকারের চলাচল- দুটোই পুরোপুরি স্থবির।
শনিবার এক্সে দেয়া এক পোস্টে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি বলেছেন, ‘এই প্রণালী খোলা বা বন্ধ করার নিয়ন্ত্রণ কেবল ইরানের হাতেই থাকবে। যতদিন না আপনারা পরাজয়ের বাস্তবতা মেনে নিচ্ছেন এবং অলীক কল্পনায় বিভোর থাকা বন্ধ করছেন, ততদিন ইরান এই অবরোধ অব্যাহত রাখবে।’
তাছাড়া ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, তারা ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেননি। শনিবার প্রকাশিত ইরানি সংবাদমাধ্যম শাহারারা নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেলের পাঁচ ভাগের এক ভাগ যে নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো, সেখানে জাহাজ চলাচল ফের শুরু করতে হলে ওয়াশিংটনকে অবশ্যই প্রণালী-সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হবে। গারিবাবাদি আরো বলেছেন, ‘টুইট করে, বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়ে, সরকারি আদেশ জারি করে কিংবা নির্বাচনী মঞ্চ কাঁপিয়ে হরমুজ প্রণালী দখল করা যায় না।’
তবে ইরানের অনমনীয় সুরের আড়ালেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষত তেহরানের গায়েও দাগ কাটার লক্ষণ দেখা গেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশের চড়া মূল্যস্ফীতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, ইরানের বন্দরে মার্কিন অবরোধ ও তেল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞাই এই অর্থনৈতিক সঙ্কটের মূল কারণ।
ইরানের অর্থনৈতিক ক্ষতি আরো বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প ও অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। বৃহস্পতিবার এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট জানান, আগামী সপ্তাহেই ইরানের বিরুদ্ধে আরো কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা আসছে।
হরমুজে জাহাজ চলাচলের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণকে তেহরান বলছে ‘অবরোধ’- যে শব্দটি ব্যবহার করে ওয়াশিংটন ইরানি জাহাজগুলোকে বন্দর ছাড়তে দিচ্ছে না। ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা শুধু নিজেদের জন্যই নয়, পুরো বিশ্বের জন্য মহৎ একটা কাজ করছি, আর সত্যি বলতে আমরা দারুণ এগোচ্ছি।’
জাহাজ চলাচলের গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুক্রবার হরমুজ দিয়ে মাত্র দু’টি জাহাজ পার হয়েছে; সেগুলোতেও অপরিশোধিত তেলের কোনো চালান দেখা যায়নি। ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে কিছু জাহাজ গোপনে প্রণালী পার হতে পারে; তবে সেই সংখ্যা যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে পার হওয়া ১৩০টির বেশি জাহাজের ধারেকাছেও নেই।
যুদ্ধ থামাতে জুনে যে সম্ভাব্য চুক্তির আভাস মিলেছিল, তা এখন বিফলে গেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি বলেছেন, ‘প্রথমত, এমন কোনো যুদ্ধবিরতি ছিল না যার মেয়াদ আমরা এখন বাড়াতে চাইব। আমাদের লক্ষ্য ছিল ‘যুদ্ধের সমাপ্তি’, আর এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।’
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিরসনে পুনরায় আলোচনায় বসার কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেয়নি ইরান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি শনিবার টেলিগ্রামে দেয়া এক বার্তায় এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। যদিও কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা উভয় পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রেখেছেন, তবে তেহরান একে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হিসেবে গণ্য করতে রাজি নয়। আরাকচির মতে, জুন মাসে পাকিস্তানে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের দায় সম্পূর্ণভাবে ওয়াশিংটনের।
হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়টি অত্যন্ত জটিল রাজনৈতিক শর্তাবলীর ওপর নির্ভরশীল বলে মন্তব্য করেছেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, বিদ্যমান রুটগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ায় ওমানের সাথে মিলে নতুন একটি বিকল্প নৌপথ তৈরির কাজ করছে ইরান। তবে এই রুট চূড়ান্ত করার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সমাধানের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে।
হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে তেহরান। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি স্পষ্ট করে বলেছেন, এই প্রণালী ঐতিহাসিকভাবে ইরানের এবং তা ইরানের দখলেই থাকবে। সাম্প্রতিক সময়ে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি তেলবাহী জাহাজের ওপর হামলার ঘটনায় উত্তেজনা আরো ঘনীভূত হয়েছে।
ওয়াশিংটন ও ইসরাইল গত ছয় মাস ধরে সামরিক চাপ প্রয়োগ করেও ইরানের শাসনব্যবস্থাকে টলাতে ব্যর্থ হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রশাসন এখন অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে তেহরানকে কোণঠাসা করার কৌশল অবলম্বন করেছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ঘোষণা করেছেন, ইরানকে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মুখে ফেলতে নতুন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশটির বন্দরগুলো কার্যত অচল করে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ওয়াশিংটন।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হয়ে আসছে। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রশাসন নতুন করে যে ‘অর্থনৈতিক দাবার ছক’ সাজিয়েছে, তাতে কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নেই। হোয়াইট হাউজের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য উপদেষ্টা মার্ক গিনসবার্গের মতে, এই পরিস্থিতি এক প্রকার ‘অর্থনৈতিক আত্মঘাতী দৌড়’। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইরানের ওপর চূড়ান্ত চাপ প্রয়োগের নীতি শেষ পর্যন্ত বড় কোনো পরিবর্তন না এনে বরং সঙ্কটকেই দীর্ঘায়িত করতে পারে।



