বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশী পণ্যের জন্য ভারতের বাজারে আরো সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত ও অশুল্ক বাধা (নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার) দূর করার আহ্বান জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স-বাংলাদেশ (আইসিসি বাংলাদেশ)।
গতকাল সোমবার বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সাথে এক বৈঠকে আইসিসি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মাহবুবুর রহমান এ আহ্বান জানান। বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরো জোরদারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময় হয় বলে আইসিসিবি পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বৈঠকে হাইকমিশনারকে স্বাগত জানিয়ে আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে বেসরকারি খাতের আরো সক্রিয় অংশগ্রহণ ও পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে উভয় দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরো শক্তিশালী হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায ১১.৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ভারতের কাছে ১.৭৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে এবং ভারত থেকে ৯.৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে।
আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি বলেন, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশী পণ্যের জন্য ভারতের বাজারে আরো সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, অশুল্ক বাধা (নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার) দূর করা, পণ্যের মানদণ্ডের সমন্বয়, শুল্ক ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রস্তাবিত কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) দ্রুত সম্পন্ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বৈঠকে বিনিয়োগ, আঞ্চলিক মূল্য শৃঙ্খল (রিজিওনাল ভ্যালু চেইন), বহুমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা (মাল্টিমোডাল কানেক্টিভিটি), নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সীমান্তবর্তী বিদ্যুৎ বাণিজ্য, ডিজিটাল বাণিজ্য, ফিনটেক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), জলবায়ু অর্থায়ন, টেকসই শিল্পায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরো জোরদারের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়।
মাহবুবুর রহমান আরো বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে সার্ককে আরো কার্যকর করা, বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল (বিবিআইএন) মোটর ভেহিকেলস অ্যাগ্রিমেন্ট দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বিমসটেকের আওতায় বাস্তবমুখী সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ উন্নত হবে, পণ্য পরিবহন ব্যয় কমবে এবং আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) আরো শক্তিশালী হবে।
মাহবুবুর রহমান বাংলাদেশী পণ্যের ওপর আরোপিত অ্যান্টি-ডাম্পিং ব্যবস্থা, বিশেষ করে পাট ও পাটজাত পণ্যের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি এ বিষয়ে ন্যায্য, স্বচ্ছ ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছতে দুই দেশের মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
বক্তব্যে বাংলাদেশের ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সব ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, উদ্ভাবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও দক্ষ মানবসম্পদের ক্ষেত্রে দুই দেশের উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা রয়েছে। এসব শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরো বাড়ানো এবং টেশসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।
হাইকমিশনার আরো বলেন, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অনেক অমীমাংসিত বিষয় উচ্চ পর্যায়ের নিয়মিত আলোচনা ও পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। তিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বেসরকারি খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলেন, এশটি দেশের স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়ে তুলতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরো বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে (জয়েন্ট ভেঞ্চার) শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা (ভ্যালু চেইন) আরো শক্তিশালী হবে, নতুন বিনিয়োগ আসবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তিনি ব্যবসায়ীদের প্রতি আশ্বাস দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে কোনো সমস্যা হলে তারা যেন নির্দ্বিধায় ভারতীয় হাইকমিশনের সাথে যোগাযোগ করেন। হাইকমিশন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
মতবিনিময় পর্বে আইসিসি বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট নাসের এজাজ বিজয় দুই দেশের ব্যবসায়ীদের যাতায়াত আরো সহজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি ব্যবসায়িক ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া আরো সহজ ও দ্রুত করার আহ্বান জানান, যাতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরো বৃদ্ধি পায়।
আইসিসি বাংলাদেশের এক্সিকিউটিভ বোর্ড সদস্য সিমিন রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য, ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা ও পর্যটন খাতে সহযোগিতা আরো বাড়ানোর ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ভারতে বিশ্বখ্যাত অনেক প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানি রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারত্ব গড়ে তুললে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক যেমন আরো শক্তিশালী হবে, তেমনি জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগও বাড়বে।
আইসিসি বাংলাদেশের এক্সিকিউটিভ বোর্ড সদস্য আবদুল হাই সরকার আশা প্রকাশ করেন যে, নতুন ভারতীয় হাইকমিশনারের দায়িত্বকালেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত থাকা বাণিজ্য ও ব্যবসাসংক্রান্ত অনেক বিষয় সমাধানের পথে এগোবে। এতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে আইসিসি বাংলাদেশ জানায়, যৌথ বিজনেস কাউন্সিল, সিইও ফোরাম, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) সহযোগিতা, স্টার্টআপ বিনিময় কর্মসূচি, বিনিয়োগ মিশন এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরো জোরদারে তারা কাজ করে যাবে।
বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন আইসিসি বাংলাদেশের এক্সিকিউটিভ বোর্ড সদস্য তপন চৌধুরী, বাংলাদেশে ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার পবন কুমার বাধে, বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি (অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য) গৌরব কুমার আগারওয়াল, আইসিসি বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল আতাউর রহমান, জেনারেল ম্যানেজার অজয় বিহারী সাহা এবং ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার সৈয়দা শাহনেওয়াজ লতিকা।



