ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শতবর্ষের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান এক যুগান্তকারী ও অবিস্মরণীয় অধ্যায়; কিন্তু এই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে এখনো সেই অস্থিরতার কালো ছায়া বিরাজমান। জুলাই অভ্যুত্থানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে ‘অবস্থান’ নেয়া এবং আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের প্রাণঘাতী হামলায় ‘উসকানি’ দেয়ার অভিযোগে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত অন্তত ৬৮ জন শিক্ষককে পাঠদান থেকে সম্পূর্ণ বিরত রাখা হয়েছে।
ক্ষমতার পালাবদল ও নতুন প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও এসব গুরুতর অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত বা আইনি বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর ফলে এক দিকে অভিযুক্ত শিক্ষকরা যেমন ক্লাসে ফিরতে পারছেন না, তেমনি ভয়াবহ শিক্ষক সঙ্কটে ধুঁকছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। তৈরি হয়েছে দীর্ঘ ও অপ্রত্যাশিত সেশনজট, যা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অন্য দিকে, গত ২০ মাস ধরে কোনো ক্লাস-পরীক্ষা বা একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ না নিয়েও এসব শিক্ষক নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন। হিসাব পরিচালকের দফতরের তথ্যমতে, এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১২ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশের সর্বোচ্চ এ বিদ্যাপীঠে এক নজিরবিহীন অচলাবস্থা ও প্রশাসনিক স্থবিরতা বিরাজ করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এমনিতেই প্রতি বছর বিশাল বাজেট ঘাটতি নিয়ে ধুঁকছে। এর মধ্যে ক্লাস না নেয়া শিক্ষকদের পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চরম অব্যবস্থাপনারই প্রতিচ্ছবি। বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব পরিচালকের দফতর ও কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, প্রশাসন থেকে কোনো শিক্ষকের বেতন-ভাতা বা অন্যান্য আর্থিক সুবিধা বন্ধের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা আজ পর্যন্ত আসেনি।
নিয়ম অনুযায়ী, পাঠদান থেকে সাময়িক অব্যাহতি পাওয়া এ ৬৮ জন শিক্ষকের মধ্যে রয়েছেন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক। পদমর্যাদা অনুযায়ী তাদের মূল বেতন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতাসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধা নিয়মিতভাবে তাদের ব্যাংক হিসাবে জমা হচ্ছে। হিসাব অনুযায়ী, এ শিক্ষকদের পেছনে প্রতি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫০-৬০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। গত ২০ মাসে কোনো একাডেমিক কাজ বা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন না করেই তারা প্রায় ১২ কোটি টাকা বেতন-ভাতা হিসেবে নিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ঊর্ধ্বতন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের কাছে সিন্ডিকেট বা ভিসির দফতর থেকে এদের বেতন স্থগিত করার কোনো লিখিত নির্দেশ আসেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ ১৯৭৩ অনুযায়ী, চাকরি থেকে চূড়ান্ত বরখাস্ত বা আইনিভাবে সাময়িক বরখাস্ত না হওয়া পর্যন্ত কারো বেতন বন্ধ করা যায় না। ফলে বাধ্য হয়েই প্রতি মাসে এ বিপুল অঙ্কের অর্থ ছাড় করতে হচ্ছে।
বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘সাদা দল’-এর এক শীর্ষ নেতা এ পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, কোনো শিক্ষক যদি অপরাধ করেন, তবে দ্রুততম সময়ে নিরপেক্ষ তদন্তসাপেক্ষে তার বিচার হওয়া উচিত; কিন্তু বিচার না করে, অপরাধ প্রমাণ না হওয়ার আগেই তাদের পাঠদান থেকে মাসের পর মাস বিরত রাখায় এক দিকে যেমন জনগণের করের বিপুল অর্থের অপচয় হচ্ছে, অন্য দিকে শিক্ষার্থীদের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। এটি কোনোভাবেই একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কাম্য আচরণ হতে পারে না।
ক্লাসরুমে হাহাকার, সেশনজটে পিষ্ট শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ : শিক্ষকদের এ দীর্ঘমেয়াদি অনুপস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে কলা, সামাজিক বিজ্ঞান ও আইন অনুষদের বড় বিভাগগুলোতে রীতিমতো একাডেমিক বিপর্যয় নেমে এসেছে।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে যারা ভর্তি হয়েছিলেন, একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তাদের এখন ষষ্ঠ সেমিস্টারে পড়ার কথা; কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, শিক্ষার্থীরা এখনো পঞ্চম সেমিস্টারই শেষ করতে পারেননি। ওই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তানভীর হাসান তীব্র হতাশা প্রকাশ করে বলেন, আমাদের বিভাগে ছয়জন শিক্ষক দিয়ে ১,২০০ শিক্ষার্থীর ক্লাস নেয়া হচ্ছে, যা একেবারেই অসম্ভব। শিক্ষকের মারাত্মক ঘাটতির কারণে রুটিন অনুযায়ী ক্লাস হয় না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দুই মাস ক্লাস বন্ধ ছিল, এরপর আবার শিক্ষকদের এই বয়কট-সব মিলিয়ে আমাদের শিক্ষাজীবন এখন ঘোর অনিশ্চয়তার মুখে। অনেক বন্ধু বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল, সেশনজটের কারণে তাদের স্বপ্ন এখন ভাঙতে বসেছে।
একই চিত্র রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইন বিভাগেও। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা যখন পঞ্চম সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা দিচ্ছেন, তখন অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সমবয়সী শিক্ষার্থীরা স্নাতক শেষ করার পথে। পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবে ক্লাস রুটিন ঠিক রাখা, ইনকোর্স বা টিউটোরিয়াল পরীক্ষা নেয়া এবং পরীক্ষার খাতা দেখায় অস্বাভাবিক বিলম্ব হচ্ছে।
আইন বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের থিসিস সুপারভাইজার বয়কটের শিকার। গত দেড় বছর ধরে আমার থিসিস আটকে আছে। আমি বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেয়ার বয়স হারাচ্ছি। এই দায় কে নেবে? আমরা চেয়েছিলাম দোষী শিক্ষকদের বিচার হোক, কিন্তু প্রশাসন আমাদের পুরো শিক্ষাজীবনকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
শুধু পাঠদান নয়, স্থবির হয়ে পড়েছে গবেষণামূলক কার্যক্রমও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সেলের এক কর্মকর্তা জানান, বয়কটের শিকার শিক্ষকদের অধীনে থাকা অন্তত ৩০টি গবেষণা প্রকল্পের কাজ বর্তমানে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ইউজিসি ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত এসব প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়ে শেষ না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান ক্ষুণœ হচ্ছে।
তদন্তের নামে প্রহসন ও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা : আন্দোলনের পরপরই শিক্ষার্থীদের তুমুল দাবির মুখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অভিযোগগুলো তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের দেড় মাস পর দায়িত্ব গ্রহণ করা তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান তড়িঘড়ি করে ‘জুলাই অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া শিক্ষক-কর্মকর্তা শনাক্ত কমিটি’ গঠন করেছিলেন; কিন্তু সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট ও সাহসিকতার অভাবে শুরুতেই সেই উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়ে।
তৎকালীন ওই কমিটির প্রধান ও কলা অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান স্পষ্টভাবেই এ স্থবিরতার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, এ কমিটির কোনো অগ্রগতি নেই। আমরা অনেকের কাছে তথ্য চেয়েছিলাম, তেমন সাড়া পাইনি। সাবেক উপাচার্য এসব বিষয়ে দায়িত্ব বা ঝুঁঁকি নিতে চাইতেন না। আমি এ কমিটি বাদে আরো কয়েকটি কমিটিতে ছিলাম। অন্তত তিন-চারটার প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। সেগুলোর একটারও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
অন্য দিকে, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১২৮ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ওই তথ্যানুসন্ধান কমিটির আহ্বায়ক কাজী মাহফুজুল হক সুপন জানিয়েছিলেন, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত হামলায় অন্তত ৭০ জন শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে উসকানি দিয়েছেন। তবে শিক্ষকদের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের কোনো আইনি এখতিয়ার বা ম্যান্ডেট ওই কমিটিকে দেয়া হয়নি।
দীর্ঘদিনেও তদন্ত শেষ না হওয়ার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা আইনি জটিলতা ও নিরপেক্ষতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অধিকাংশ তদন্ত কমিটির সদস্যরা নিজেরাও শিক্ষক। উনাদের নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা থাকে। আমরা কোনো হস্তক্ষেপ করছি না, যাতে তদন্তে কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতির অভিযোগ না আসে। তা ছাড়া, আমরা যদি তাড়াহুড়ো করে প্রতিবেদন দিতে বলি, সেটা আইনিভাবে আদালতে গিয়ে অনেক সময় না-ও টিকতে পারে। তাই যারা তদন্ত কমিটিতে আছেন, তাদেরকে কোনো প্রকার চাপ দেয়া হচ্ছে না।
বর্তমান ভিসি অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়ে বলেছেন, আমি নতুন এসে যোগদান করেছি। পূর্ববর্তী ভিসি যেখানে রেখে গেছেন, সেখান থেকেই আমি বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখব। আমরা চাই না কেউ বিনা বিচারে শাস্তি পাক, আবার কেউ অপরাধ করে পার পেয়ে যাক। তবে কবে নাগাদ এ পর্যালোচনার শেষ হবে, তার কোনো সদুত্তর প্রশাসনের কাছে নেই।
‘মব জাস্টিস’ বনাম জবাবদিহি, অভিযুক্ত শিক্ষকদের বয়ান : পাঠদান থেকে অব্যাহতি পাওয়া শিক্ষকরা প্রশাসনের এই নিষ্ক্রিয়তা এবং শিক্ষার্থীদের আচরণকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ ও ‘মব জাস্টিস’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের চেয়ে রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণেই তাদের টার্গেট করা হয়েছে।
নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইশরাত জাহান আক্ষেপ করে বলেন, আমি ‘নীল দল’ (আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন) করার কারণে কয়েকজন শিক্ষার্থী আমাকে বয়কট করেছে, যার পেছনে আমাদেরই কিছু সহকর্মীর রাজনৈতিক ইন্ধন ছিল। তদন্ত কমিটিতে আজ পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়নি। তারপরও আমাকে ক্লাস নিতে দেয়া হচ্ছে না। আমি যদি অপরাধ করে থাকি, তাহলে দেশের প্রচলিত আইনে আমার বিচার হোক; কিন্তু তদন্ত ছাড়া এভাবে একজন শিক্ষককে মাসের পর মাস ক্লাস নিতে না দেয়া চরম অসম্মানের ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন।
আইন বিভাগের প্রভাষক শাহরিমা তানজিম অর্নি তার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় আমি ছাত্রলীগের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম, শুধু এ অজুহাতে আমাকে বয়কট করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বিভাগের একটি মিটিংয়ে গেলে ১৫-২০ জন শিক্ষার্থী এসে মব তৈরি করে। এরপর কোনো কারণ দর্শানো নোটিশ ছাড়াই আমাকে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়। আজ প্রায় দেড় বছর হতে চলল, তদন্ত কমিটি একবারও আমাদের সাথে কথা বলার প্রয়োজন মনে করেনি।
বিজ্ঞান অনুষদের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বয়কটের শিকার এক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের সাথে যে আচরণ করছে, তা ১৯৭৩ সালের আদেশের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আমরা অনেকেই আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভাবছি। এভাবে চলতে থাকলে উচ্চ আদালতে রিট করা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকবে না।
শূন্যতার তালিকা দীর্ঘ, দৃশ্যপটের বাইরে যারা : শিক্ষকদের বয়কটের প্রভাব পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব অনুষদ ও ইনস্টিটিউটে। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিনাত হুদা, আ ক ম জামাল উদ্দিন, মশিউর রহমান; রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের নিলুফার পারভীন ও মামুন আল মোস্তফা; লোকপ্রশাসন বিভাগের সাদিক হাসান; টেলিভিশন, চলচিত্র ও ফটোগ্রাফি বিভাগের শফিউল আলম ভূঁইয়া; শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের রফিকুল ইসলাম ও মারিয়া হোসাইন; নৃবিজ্ঞান বিভাগের ইশরাত জাহান এবং অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের এ বি এম নাজমুস সাকিব ও সুমাইয়া ইকবাল পাঠদান থেকে বিরত রয়েছেন।
কলা অনুষদেও একই চিত্র। ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক এ এম আমজাদ ও আকসাদুল ইসলাম, ইংরেজি বিভাগের নীলিমা আকতার, দর্শন বিভাগের রেবেকা সুলতানা, বাংলা বিভাগের সৌমিত্র শেখর দে এবং ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ শ্রেণীকক্ষে নেই।
ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম (যিনি বর্তমানে ভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন) এবং অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ; অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান ও মুশফিকুর রহমানসহ একাধিক শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছেন না। বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও অন্যান্য অনুষদে গণিত বিভাগের চন্দ্র নাথ পোদ্দার, মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের মোহাম্মদ শামসুর রহমান, মনোবিজ্ঞান বিভাগের কামাল উদ্দিন, ফলিত রসায়ন বিভাগের মিজানুর রহমান এবং চারুকলা অনুষদের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকও পাঠদান থেকে বিরত রয়েছেন।
ইনস্টিটিউটগুলোর মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এম অহিদুজ্জামান ও মাহবুবুর রহমান, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সাইদুর রহমান ও শিশির ভট্টাচার্য দীর্ঘদিন ধরে একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন না।
অন্য দিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ঢাবির সাবেক শীর্ষ প্রশাসনের অনেকেই এখন কার্যত দৃশ্যপটের বাইরে। সাবেক ভিসি অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল পদত্যাগ করে আত্মগোপনে চলে যান। তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা রয়েছে, যেখানে ডাকসুর সাবেক ভিপি আবু সাদিক কায়েম সাক্ষ্য দিয়েছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আত্মগোপনে থাকলেও আইনি বাধ্যবাধকতার অজুহাতে তিনিও এখনো নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন।
রাজনীতির জাঁতাকলে পিষ্ট শিক্ষাঙ্গন ও বিশেষজ্ঞদের মত : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের সদস্য ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা মনে করেন, এই দীর্ঘসূত্রতার পেছনে দুই পক্ষেরই চরম রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার আছে। ৫ আগস্টের আগে যারা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার সাথে সরাসরি জড়িত ছিল, তাদের দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা উচিত ছিল; কিন্তু সেটা না করে বিষয়টিকে বছরের পর বছর দীর্ঘায়িত করাটা স্পষ্টতই এক ধরনের রাজনীতি। যারা ক্লাসে ফিরতে পারছেন না, তারা রাজনীতি করছেন; আর এখন যারা বিচার না করে ঝুলিয়ে রাখছেন, তারাও রাজনীতি করছেন। তিনি আরো যোগ করেন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে আস্থার পবিত্র জায়গা ছিল, তা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা দেখেছি শিক্ষার্থীরা ডিনদের পদত্যাগ করতে বাধ্য করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকদের হেনস্তা করা হচ্ছে। প্রশাসন যদি দ্রুত বিচার কাজ শেষ করত, তাহলে এই দূরত্ব ও আস্থাহীনতা তৈরি হতো না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের মতে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল চালিকাশক্তি হলো এর একাডেমিক শৃঙ্খলা। ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও উচিত এই বিষয়ে দ্রুত একটি আইনি রূপরেখা প্রণয়ন করে বিশ্ববিদ্যালয়কে সহায়তা করা।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বর্তমান সমন্বয়কদের একজন জানান, আমরা কখনোই চাইনি ঢাবির একাডেমিক কার্যক্রম স্থবির হোক। আমাদের দাবি ছিল সুস্পষ্ট-ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার দোসর ও ছাত্রহত্যায় মদদদাতাদের স্থায়ী বহিষ্কার। প্রশাসন যদি ২০ মাসেও একটি তদন্ত শেষ করতে না পারে, তবে সেই প্রশাসনের যোগ্যতা নিয়েই আমাদের প্রশ্ন তুলতে হবে।
শিক্ষার্থীদের দাবি- যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ছাত্রহত্যার মদদদাতা বা উসকানিদাতা, তাদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক। অন্য দিকে, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে অভিযুক্তদের দাবি দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষী-নির্দোষ প্রমাণ করা হোক।
বিচারহীনতা ও সিদ্ধান্তহীনতার এ অপসংস্কৃতি চলতে থাকলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক শৃঙ্খলা যে পুরোপুরি ভেঙে পড়বে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর র্যাঙ্কিং আরো তলানিতে গিয়ে ঠেকবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বর্তমান ভিসি, সিন্ডিকেট ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার কবে কাটবে এ অমানিশা, কবে সচল হবে স্থবির হয়ে থাকা তদন্তের চাকা, আর কবেই বা শিক্ষার্থীরা ফিরে পাবে তাদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন।



