অন্য রকম হেক্সা সেলেকাওদের

Printed Edition

ক্রীড়া প্রতিবেদক

ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ইতিহাসে এটিই হয়তো সর্বনিম্ন স্তর। জায়ান্ট কোনো দলের বিপক্ষে খেলার আগেই মাত্র রাউন্ড অব ১৬ স্টেজ থেকেই বাদ পড়ে গেল দলটি। এই হতাশা শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ বিশ্বকাপে তাদের হতাশামূলক ফলাফলের সাথে আরেকটি হতাশামূলক ফলাফল যোগ হলো। কিন্তু এবারেরটা ছিল সর্বনিম্ন স্তর। কারণ প্রতিপক্ষ দল শুধু জেতেনি, খেলা ডমিনেট করে জিতেছে। প্রতিবারই ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছে সেলেকাওদের।

গত ৬টি বিশ্বকাপে (২০০৬-২৬) ব্রাজিলের হারের পরিসংখ্যান :

২০২৬ বিশ্বকাপ (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো) : শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় ব্রাজিল।

২০২২ বিশ্বকাপ (কাতার) : কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে (১-১ সমতার পর) হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যায়।

২০১৮ বিশ্বকাপ (রাশিয়া) : কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয়। ২০১৪ বিশ্বকাপ (ব্রাজিল) : সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের বড় ব্যবধানে এবং তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের কাছে ৩-০ গোলে হারে।

২০১০ বিশ্বকাপ (দক্ষিণ আফ্রিকা) : কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয়।

২০০৬ বিশ্বকাপ (জার্মানি) : কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নেয়।

এই ৬টি বিশ্বকাপের মধ্যে তিনবার কোয়ার্টার ফাইনাল, একবার সেমিফাইনাল এবং একবার শেষ ষোলো থেকে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। জয় দিয়ে হেক্সা মিশন পুরণ না হলেও হার দিয়ে লজ্জার হেক্সা পুরণ করেছে সাম্বার দেশটি।

এটি ছিল একুশ শতাব্দীতে ব্রাজিলের সবথেকে বড় ফ্লপ। কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই বিদায় জানালো পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। বিশ্বকাপের আগে গুঞ্জন ছিল এই ব্রাজিলের স্কোয়াড হচ্ছে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ইতিহাসের সব থেকে বাজে স্কোয়াডগুলোর একটি। কিন্তু একটি ভরসার নাম ছিল কার্লো আনচেলোত্তি। কিন্তু সেই আঞ্চেলোত্তিও রক্ষা করতে পারেনি পাঁচতারকা খচিত ডুবন্ত এই জাহাজকে।

২০ বছর আগে যদি কাউকে যদি বলা হতো যে ব্রাজিল নরওয়ে ম্যাচে ব্রাজিলের বল পজেশন হবে ৩৪ শতাংশ আর নরওয়ের ৬৬ শতাংশ এবং খেলার গতি ডমিনেট করবে নরওয়ে তাহলে মানুষ হয়তো পাগল ভাবত। কিন্তু বর্তমানে এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। পুরনো শতাব্দীর অনেক গ্রেট ফুটবল ন্যাশন তাদের ইতিহাসের একটি ডিক্লাইনিং স্টেইজ অতিবাহিত করছে, ব্রাজিলও সেই দলের অন্তর্ভুক্ত।

বলের ডমিনেশন ছাড়া ব্রাজিলের গেইম স্ট্র্যাটেজি শুরু থেকেই ছিল স্পষ্ট লো ব্লক ডিফেন্ডিং করে ট্রানজিশনে অ্যাটাক করা এবং বল পায়ে ভিনির স্পিডকে কাজে লাগানো। সেই স্ট্র্যাটেজি তে ব্রাজিল প্রায় সফল হয়েও গিয়েছিল। কিন্তু তাদের বড় ভুল ছিল সঠিক সময়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যার্থ হওয়া এবং মোমেন্টাম পরিবর্তন করতে না পারা।

ম্যাচটি শুরু হয়েছিল ব্রাজিলের জন্য আইডিয়াল কন্ডিশনে। মাত্র ১৪ মিনিটের মাথায় একটি স্পষ্ট পেনাল্টি পেয়েছিল ব্রাজিল। সেই পেনাল্টি গোলে কনভার্ট করতে পারলে একদমই ভিন্ন এক ম্যাচের আবহ থাকতো। ব্রাজিল যেই স্ট্র্যাটেজি নিয়ে খেলা শুরু করেছিল ঠিক সেই গেইম প্ল্যান সাকসেসফুল হতে পারতো সেই একটি গোলে। সেই পেনাল্টি ভুলের পরেও ব্রাজিল কাউন্টার এটাকে বেশ কয়েকবার গোলের সুযোগ পায় কিন্তু কখনোই সেগুলোকে সঠিক ভাবে কাজে লাগাতে পারেনি।

বল পজিশনে ও গেইম ডমিনেশনে নরওয়ে এগিয়ে থাকলেও ম্যাচের বিগ মোমেন্ট এবং সুযোগ গুলো কিন্তু ছিল ব্রাজিলের পক্ষেই বেশি। কিন্তু সেই মুহূর্তগুলো কাজে না লাগানোই ছিল সব থেকে বড় ব্যর্থতা। এক্সপেকটেড গোল হচ্ছে ব্রাজিলের ২.৭৩ অন্য দিকে নরওয়ের ০.৮৪, ব্রাজিল বিগ চান্স পেয়েছে পাঁচটি নরওয়ে তিনটি, টোটাল শট ব্রাজিল নিয়েছে ১৪টি নরওয়ে ৯টি। মোটকথা নরওয়ে গেইম ডমিনেশন করলেও ম্যাচটি জয়ের সম্ভাবনা ছিল ব্রাজিলেরই বেশি।

পার্থক্য গড়ে দিয়েছে ৬ ফিট ৫ ইঞ্চির হলুদ/সাদা চুলের এক ভাইকিং দানব। ০.৩৯ এক্সপেকটেড গোল থেকে দু’টি গোল বের করেছে এই দানবটি। অন্য দিকে তার প্রতিপক্ষ গাব্রিয়েল ছিল ম্যাচের অন্যতম ফ্লপ। প্রথম গোলে গ্যাব্রিয়েলের সাথে ছেলে খেলা করেছে হলান্ড, আর দ্বিতীয় গোলে সে শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে। হলান্ডের মতো স্ট্রাইকারকে যদি এত স্পেইস ও সময় দেয়া হয় তাহলে যা হওয়ার সেটিই হয়েছে। একদম একা দাঁড়িয়ে বল রিসিভ করেছে এবং গোলকিপারকে লক্ষ্য করে শট নিয়েছে, অথচ একজন ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডারও আসেনি সেখানে ট্যাকেল করতে অথবা মার্কিং করতে।

পেনাল্টি মিসে ৪০ বছর আগের স্মৃতি

সবাই ভেবেছিলেন, পেনাল্টি শটটি ভিনিসিয়াস জুনিয়রই নেবেন। কিন্তু গোটা পৃথিবীকে অবাক করে দিয়ে ভিনিসিয়াস বল তুলে দেন ব্রুনো গিমারাইসের হাতে। খটকাটা লেগেছে ঠিক তখনই! ভিনি তার ক্যারিয়ারে ১৯টি পেনাল্টি নিয়ে ১৩টিতে গোল করেছেন। ব্রাজিলের জার্সিতে অবশ্য তিনটি পেনাল্টি শটে তার গোল একটি। ওদিকে গিমারাইস তার গোটা ক্যারিয়ারেই মাত্র তিনবার পেনাল্টি শট নিয়েছেন। সব ক’টিতেই গোল পেলেও এর আগে ব্রাজিলের জার্সিতে কখনো পেনাল্টি শট নেননি। ম্যাচটি ছিল বিশ্বকাপের শেষ ষোলো। একটি ভুল অপেক্ষা বাড়ল চার বছরের।

গিমারাইসের আগে বিশ্বকাপে ব্রাজিল সর্বশেষ পেনাল্টি (টাইব্রেকার বাদে) থেকে গোল করতে ব্যর্থ হয় ১৯৮৬ আসরে। সেটা ছিল ফ্রান্সের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ। ৭২ মিনিটে পেনাল্টি পেয়েছিল ব্রাজিল। পোল্যান্ডের বিপক্ষে তার আগের ম্যাচেই সক্রেটিস ও ক্যারেকা পেনাল্টি থেকে গোল করলেও সেদিন ফ্রান্সের বিপক্ষে শটটি নিয়েছিলেন মাত্র দুই মিনিট আগে বদলি হয়ে নামা সাদা পেলে খ্যাত জিকো। গিমারাইসের মতো ব্রাজিলের এই কিংবদন্তিও সেদিন গোল করতে পারেননি। ব্রাজিল এরপর বিশ্বকাপের ম্যাচে ছয়টি পেনাল্টি পেয়েছে। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে রাই থেকে শুরু করে পরে রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহো ও নেইমাররা কখনো পেনাল্টি মিস করেননি।

দোষ কোচ আনচেলত্তিরও : মেলো

ব্রাজিলের সাবেক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ফেলিপে মেলো সরাসরি বলেছেন, ব্রাজিলের এই হারে আনচেলত্তি অন্যতম দোষীদের একজন। ২০১০ বিশ্বকাপে খেলা মেলো সেই ব্যাখ্যায় নেইমারের প্রসঙ্গ টেনেছেন। ইতিহাসে অন্যতম সেরা কোচকে নিয়ে এসেছি আমরা। সবার আগে দোষটা তারই।

ব্রাজিলের হয়ে কনফেডারেশনস কাপজয়ী মেলো মনে করেন, লুকাস পাকেতার অনুপস্থিতিতে নেইমারকে শুরু থেকেই খেলানো উচিত ছিল আনচেলত্তির। চোট পাওয়ায় নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে ছিলেন না পাকেতা। গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লিকে তার জায়গায় খেলান ইতালিয়ান এই কোচ। নেইমার শুরু থেকে খেললে সম্ভবত ১৪ মিনিটে ব্রাজিলের পাওয়া পেনাল্টিটি তিনিই নিতেন।

ব্রুনো গিমারাইস সেই পেনাল্টি শট থেকে গোল করতে পারেননি। পরে ৬৭ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির বদলি হয়ে নামেন। ম্যাচের একেবারে শেষ দিকে পেনাল্টি থেকে ব্রাজিলের একমাত্র গোলটি করেন নেইমার। আনচেলত্তি হারের পর নিজেই বলেছেন, ব্রাজিল দলে পেনাল্টি নেয়ায় নেইমারই সবচেয়ে দক্ষ।

মেলো এ নিয়ে বলেন, ‘আমি বুঝি যে কোচের নিজস্ব কিছু ভাবনা-দর্শন থাকে, কিন্তু তুার তো পরিস্থিতিটাও একটু বোঝা উচিত। আমি হলে শুরু থেকে নেইমারকে খেলাতাম, শুরুতে ওকে নামাতাম।

ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ‘ও গ্লোবো’তে লেখা কলামে বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি রোমারিও লেখেন, ‘আমি হলে বিশ্বকাপের আগে আনচেলত্তির চুক্তি নবায়ন করতাম না। কোচের কাজের মূল্যায়ন হওয়া উচিত সব সময় প্রতিযোগিতার পর। আর ফুটবল তো পারফরম্যান্সের চেয়েও বেশি ফলাফলের খেলা, এখানে ফলটাই শেষ কথা।’

নরওয়ের বিপক্ষে কাক্সিক্ষত সেই ফলটা না পাওয়ায় আনচেলত্তির সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেন ১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী রোমারিও, ‘সত্যি বলতে, ব্রুনো গিমারাইসকে মাঠ থেকে তুলে নেয়া। এই পরিবর্তনের পর এমনিতেই ধুঁকতে থাকা দলটির খেলার ধার আরও কমে যায়। এতে প্রতিপক্ষ মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং হলান্ড অবাধ সুযোগ পেয়ে যায়।’

পেনাল্টি নেয়া ছিল কোচের সিদ্ধান্ত : ভিনি

শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে পরাজয়ের মাধ্যমে পেনাল্টি মিসের খেসারত দিয়েছে সেলেসাওরা। ভিনিসিয়াস জুনিয়র ও ব্রুনো গিমারায়েসকে বল হাতে পেনাল্টি স্পটের কাছে বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা করতে দেখা যায়। সবাই হয়তো ভেবেই নিয়েছিলেন শট নেবেন ভিনিসিয়াস। কিন্তু পেনাল্টি নেন নিউক্যাসলের মিডফিল্ডার ব্রুনো। ম্যাচ শেষে প্রশ্ন উঠেছে, পেনাল্টি শটটি কেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র নিলেন না? রিয়াল মাদ্রিদের এই ব্রাজিলিয়ান তারকা সোজাসাপ্টাই জানিয়েছেন, ব্রুনোর পেনাল্টি নেয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল কোচ কার্লো আনচেলত্তির। কোচ ম্যাচ শুরুর আগেই পেনাল্টিকে নেবেন, সেটা ঠিক করে দেন। তিনি ব্রুনোকে বেছে নিয়েছিলেন। আমার মধ্যে কখনো কোনো দম্ভ ছিল না। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হতে হবে, এমন কোনো ভাবনাও আমার ছিল না। এ কারণেই ব্রুনো পেনাল্টি নিয়েছিল। ও আমার চেয়ে ভালো পেনাল্টি মারে, তাই কোচ ব্রুনোকে বেছে নেন।’

তিনি আরো জানান, দল চাইলে তিনি পেনাল্টি নিতে প্রস্তুত ছিলেন। ‘অনেকে হয়তো বলবেন, আমি পেনাল্টি নিতে চাইনি। কিন্তু আমি দায়িত্ব ছেড়ে পালানোর পাত্র নই। রিয়াল মাদ্রিদে কোচ যখন আমাকে বেছে নেন, আমি পেনাল্টি নিই।’

ম্যাচ শেষে আনচেলত্তিও জানিয়েছেন, পেনাল্টি নেয়ার ক্রম আগে থেকেই টেকনিক্যাল স্টাফ ঠিক করে রেখেছিল। তার মতে, দলে সেরা পেনাল্টি টেকারদের তালিকায় সবার ওপরে ছিলেন নেইমার, এরপর ইগর থিয়াগো, রাফিনিয়া ও ব্রুনো গিমারাইস। ওই সময়ে প্রথম তিনজন মাঠে না থাকায় দায়িত্ব পড়ে ব্রুনোর ওপর। মাঠে থাকা খেলোয়াড়দের মধ্যে ব্রুনোকেই সবচেয়ে উপযুক্ত মনে হয়েছিল।