মনিরুজ্জামান সুমন দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা)
মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহ। পাটের ফলনও এবার মন্দ হয়নি। কিন্তু কৃষকের মুখে হাসি নেই। কারণ, মাঠে বাম্পার ফলন হলেও সেই পাট কেনার জন্য বাজারে কাক্সিক্ষত সংখ্যক ক্রেতা আসছেন না। ফলে ‘সোনালি আঁশ’ এখন চুয়াডাঙ্গার কৃষকের কাছে সোনালি স্বপ্নের বদলে লোকসানের নতুন এক আশঙ্কার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেলার দশমী, মতুজাপুর, বোয়ালিয়া, ভুলটিয়া, আসানন্দপুর, কুতুবপুর, পদ্মবিলা ও শংকরচন্দ্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকার পাটচাষিদের সাথে কথা বলে এমন নিরাশাজনক চিত্র পাওয়া গেছে। কৃষকদের মূল অভিযোগ উৎপাদন খরচ বিগত বছরের তুলনায় বেড়েছে কয়েক গুণ, কিন্তু সেই অনুপাতে পাটের দর বাড়েনি। তবে সবচেয়ে বড় সঙ্কট দেখা দিয়েছে বাজারে বড় ক্রেতা বা করপোরেট পাইকারদের অনুপস্থিতিতে।
বোয়ালিয়া গ্রামের কৃষক আবুল মিয়া হতাশা প্রকাশ করে বলেন, এক বিঘা জমিতে পাট চাষে বীজ, সার, সেচ ও নিড়ানি মিলিয়ে প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। এতে যদি ৮ মণ পাট পাওয়া যায়, তবে সরকারি ও বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করে পাওয়া যাবে ২০ হাজার টাকা। সব খরচ বাদ দিলে হাতে থাকে সামান্য কিছু টাকা। এর মধ্যে নিজের টানা কয়েক মাসের কায়িক শ্রমের কোনো দামই ধরা হয় না। এভাবে লোকসান দিয়ে পাট চাষ করে কৃষক কিভাবে বাঁচবে?
শুধু কৃষক নন, পাটের বাজারের সাথে যুক্ত দিনমজুর ও শ্রমিকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। দশমী এলাকার দিনমজুর আব্দুর রহমান বলেন, পাটের মৌসুমে তারা কাজ করে সংসার চালান। কিন্তু কৃষক যদি পণ্যের ভালো দাম না পান, তবে তারা শ্রমিকের খরচ কমানোর চেষ্টা করেন। এতে দিনমজুরদের কাজের সুযোগ কমে যায়। ফলে কৃষক ও শ্রমিক দুই পক্ষই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কৃষকদের বিস্তারিত হিসাব অনুযায়ী, বীজ রোপণ থেকে শুরু করে কাটা, জাগ দেয়া, আঁশ ছাড়ানো, শুকানো ও হাটে পরিবহন করা পর্যন্ত একজন শ্রমিককে প্রতিদিন দিতে হচ্ছে ৫০০ টাকা মজুরি। এক বিঘা জমিতে গড়ে ৮ থেকে ১০ মণ পাট হয়। প্রতি মণ ২ হাজার ৫০০ টাকা হিসেবে বিক্রি করলে উৎপাদন খরচ তুলে লাভ থাকে খুব কম। কিন্তু এই হিসাবে জমির ইজারা ও অতিরিক্ত যাতায়াত খরচ যুক্ত করলে লাভের মুখ দেখা সম্ভব হয় না।
এই সঙ্কট সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে জেলার ঐতিহ্যবাহী পাইকারি পাটের বাজার সরোজগঞ্জে। একসময় মৌসুম এলেই ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বড় বড় ব্যবসায়ী ও জুট মিলের ব্যাপারীরা সরোজগঞ্জে এসে সরাসরি দরদাম করে বিপুল পরিমাণ পাট কিনতেন। ক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকায় কৃষকরাও তখন উপযুক্ত দাম পেতেন। এখন বড় ক্রেতা না থাকায় আড়তদারদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সরোজগঞ্জ বাজারের পাট ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আগে বড় ব্যবসায়ীরা সরাসরি বাজারে এসে পাট কিনতেন। এখন তাদের উপস্থিতি না থাকায় বাজারে প্রতিযোগিতা নেই। ফলে দামও উঠছে না। কৃষকদের আশঙ্কা, দর না পেলে আগামীতে অনেকে পাটের বদলে অন্য লাভজনক ফসলে ঝুঁকে পড়বেন।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো: মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, বর্তমানে ভরা মৌসুম চলায় বাজারে সরবরাহ বেশি এবং দাম কিছুটা কম। এখন মণপ্রতি ৩ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষকেরা কিছুটা ধৈর্য ধরে পাট সংরক্ষণ করে পরে বিক্রি করলে মণপ্রতি চার হাজার টাকার ওপর দাম পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।



