গুমের বিচার ও প্রতিরোধে স্বাধীন তদন্ত সংস্থার দাবি

Printed Edition
গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে জাতীয় প্রেস ক্লাবে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির আলোচনা সভায় মীর আহমাদ বিন কাসেম এমপিসহ অতিথিরা : নয়া দিগন্ত
গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে জাতীয় প্রেস ক্লাবে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির আলোচনা সভায় মীর আহমাদ বিন কাসেম এমপিসহ অতিথিরা : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

জোরপূর্বক গুমের প্রতিটি অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। একই সাথে আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে দিয়ে তদন্ত না করিয়ে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনা করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। আন্তর্জাতিক গুম দিবস ২০২৬ উপলক্ষে শনিবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘জোরপূর্বক গুমের বিচার, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণ, নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহিতা এবং আইনি সংস্কার’ শীর্ষক এ আলোচনার আয়োজন করে এইচআরএসএস।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মনিরুজ্জামান এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম।

প্রস্তাবিত আইনের সমালোচনা ও অতিথিদের বক্তব্য

আলোচনায় বক্তারা বলেন, গুমের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে হবে। অভিযুক্ত বাহিনীর হাতেই তদন্তের দায়িত্ব দিলে স্বার্থের সঙ্ঘাত তৈরি হয় এবং তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়।

ব্যারিস্টার সারা হোসেন : ব্লাস্টের অনারারি নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, তদন্ত প্রক্রিয়া স্বাধীন না হলে পুরো আইনটিই অর্থহীন হয়ে পড়বে। তবে খসড়া আইনটি বাতিল না করে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে সংস্কারের জোর দাবি জানান তিনি। তিনি উল্লেখ করেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রস্তাবিত আইনটি মানবাধিকার কমিশনকে দুর্বল করে তুলছে।

শহিদুল আলম : আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার পরিবর্তনের পরও ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। খসড়া আইনে ‘মিথ্যা অভিযোগের জন্য অভিযোগকারীকে শাস্তির’ যে বিধান রাখা হয়েছে, তা অত্যন্ত অন্যায্য এবং এতে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার চাইতে ভয় পাবেন।

মো: নূর খান লিটন : গুমবিষয়ক তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য মো: নূর খান বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপরাধের তদন্তই করতে না পারে, তবে এমন নিষ্ক্রিয় কমিশন রাখার প্রয়োজন নেই। তিনি সম্প্রতি নিখোঁজ হওয়া মিরাজ শেখকে অবিলম্বে খুঁজে বের করার দাবি জানান।

ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান) : গুমের ভুক্তভোগী ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম খসড়া আইনটিকে ‘অত্যন্ত দুর্বল’ উল্লেখ করে বলেন, প্রস্তাবিত আইনটি গুম কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনকে কাগুজে বাঘে পরিণত করবে। অভিযোগকারীর সাজা সংক্রান্ত বিপজ্জনক ধারাটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বেপরোয়া হওয়ার সুযোগ দেবে বলে তিনি সতর্ক করেন।

ড. নাবিলা ইদ্রিস : তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, প্রস্তাবিত খসড়া আইন দু’টিতে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের পথ বন্ধ করা হয়েছে, যা সংবিধানের সমঅধিকারের চেতনার পরিপন্থী।

ব্যারিস্টার শায়খ মাহদী : আন্তঃবাহিনী বন্দী হস্তান্তরের কারণে গুমের তদন্ত জটিল রূপ নেয় উল্লেখ করে ব্যারিস্টার শায়খ মাহদী একটি স্বতন্ত্র কমান্ড স্ট্রাকচারের অধীনে স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠনের প্রস্তাব দেন, যা কোনো নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় বা মানবাধিকার সংস্থার অধীনে পরিচালিত হবে।

ভুক্তভোগী পরিবারের আকুতি

আলোচনার দ্বিতীয় অধিবেশনে গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা তাদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও কষ্টের কথা তুলে ধরেন। এতে বক্তব্য দেন নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজন নাসিমা বেগম, মো: জিয়াউর রহমান, মামুনুর রশিদ, লিজা ইসলাম ও আবদুল হাই।

তারা জানান, ন্যায়বিচার বলতে তারা শুধু অপরাধীর শাস্তি নয়, বরং স্বজনদের প্রকৃত ভাগ্য জানা, লাশ উদ্ধার (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে যেন আর কেউ গুম না হয় তার রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা চান। সম্প্রতি নিখোঁজ মিরাজ শেখের বোন লিজা ইসলাম অভিযোগ করেন, গত ১০ এপ্রিল বাগেরহাটের মোংলা থেকে তার ভাইকে তুলে নেয়ার পর থেকে কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

এইচআরএসএস-এর ১২ দফা দাবি

গোলটেবিল বৈঠক থেকে এইচআরএসএস ১২টি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরে : ১. মিরাজ শেখসহ সব নিখোঁজ ব্যক্তিকে অবিলম্বে উদ্ধার ও প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন তদন্ত করা। ২. গুমের ঘটনায় অভিযুক্ত বাহিনী বা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থাকে তদন্তের দায়িত্ব না দেয়া। ৩. গুম কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট সময়সীমার ‘জাতীয় কর্মপরিকল্পনা’ গ্রহণ করা। ৪. ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সংঘটিত সব গুমের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। ৫. ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ আইনের আওতায় আদেশদাতা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি করা। ৬. ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ চূড়ান্ত করার আগে অংশীজনদের সাথে আলোচনা করা। ৭. জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ‘প্যারিস প্রিন্সিপালস’ অনুযায়ী স্বাধীন সংস্থা হিসেবে গঠন করা। ৮. ভুক্তভোগী পরিবারের ‘সত্য জানার অধিকার’ নিশ্চিত করা। ৯. ক্ষতিপূরণ, আইনি ও মানসিক চিকিৎসা সহায়তার জন্য জাতীয় পুনর্বাসন কাঠামো তৈরি। ১০. ডিজিটাল কাস্টডি রেজিস্টার, সিসিটিভি এবং আটকের তথ্য ডিজিটাল নথিভুক্তকরণ বাধ্যতামূলক করা। ১১. কার্যকর সাক্ষী ও ভুক্তভোগী সুরক্ষা আইন চালু করা এবং ১২. ‘আয়নাঘর’ সহ সব গোপন আটককেন্দ্র সংরক্ষণ করে স্মৃতি ও দলিল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। এইচআরএসএস স্পষ্ট করে জানায়, গুমের বিচার কোনো রাজনৈতিক প্রতিশোধের বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের আইনি ও নৈতিক জবাবদিহির মূল ভিত্তি।