পলি জমে জেটিতে ভিড়তে পারছে না কার্গো

নওয়াপাড়া বন্দরে লোড আনলোড ব্যাহত

Printed Edition
যশোরের অভয়নগর উপজেলায় অবস্থিত নওয়াপাড়া নৌ বন্দর : নয়া দিগন্ত
যশোরের অভয়নগর উপজেলায় অবস্থিত নওয়াপাড়া নৌ বন্দর : নয়া দিগন্ত

মফিজুর রহমান অভয়নগর (যশোর)

যশোরের অভয়নগর উপজেলার শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র নওয়াপাড়া বন্দরের প্রাণ হিসেবে পরিচিত ভৈরব নদ। এক সময় এই জলপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বড় বড় কার্গো জাহাজ ও পণ্যবাহী নৌযান নিয়মিত চলাচল করত। কিন্তু দীর্ঘদিনের নাব্যতা সঙ্কট, নদীর তলদেশে পলি জমে চর সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় খননের অভাবে এই নদ এখন তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারাতে বসেছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে নওয়াপাড়া বন্দরের পণ্য পরিবহন ও লোড-আনলোড কার্যক্রমে। এতে তির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শ্রমিক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল নওয়াপাড়ায় প্রতিদিন হাজার হাজার টন সার, খাদ্যশস্য, কয়লা, কিংকার, সিমেন্ট, পাথর, ভোজ্যতেল ও বিভিন্ন শিল্পকারখানার কাঁচামাল নদীপথে পরিবহন করা হয়। কিন্তু নদীর বিভিন্ন অংশে পলি জমে গভীরতা কমে যাওয়ায় বড় আকৃতির কার্গো জাহাজ বন্দরে ভিড়তে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। অনেক জাহাজকে জোয়ারের জন্য দীর্ঘ সময় অপো করতে হচ্ছে। আবার কোনো কোনো নৌযান মাঝপথে আটকে পড়ছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় জেটির কাছে বড় জাহাজ ভিড়তেই পারছে না। ফলে পণ্য খালাস ও লোডিং কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অনেক েেত্র বড় জাহাজের পরিবর্তে ছোট নৌযান ব্যবহার করতে হচ্ছে লোড-আনলোড কার্যক্রম চালানোর জন্য। এতে করে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, অনেক ক্ষেত্রে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। বিশেষ করে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব না হওয়ায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

নওয়াপাড়া শিল্পাঞ্চলের একাধিক উদ্যোক্তা বলেন, ভৈরব নদই এ অঞ্চলের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। জলপথ সচল না থাকলে বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের কার্যক্রমও হুমকির মুখে পড়বে। বর্তমানে অনেক জাহাজ ধারণমতার তুলনায় কম মালামাল নিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ব্যবসায়ীরা পিছিয়ে পড়ছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নওয়াপাড়া বন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য নদীপথে পরিবহন করা হয়। ভৈরব নদের নাব্যতা সঙ্কটের কারণে অনেক উদ্যোক্তা বাধ্য হয়ে সড়কপথে পণ্য পরিবহন করছেন। এতে যেমন ব্যয় বাড়ছে, তেমনি সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে বন্দরের শ্রমবাজারেও। নওয়াপাড়া নৌবন্দরের শ্রমিকরা জানান, আগে প্রতিদিন অসংখ্য কার্গো জাহাজ বন্দরে ভিড়ত। এখন জাহাজের সংখ্যা কমে যাওয়ায় লোড-আনলোড কার্যক্রম কমে এসেছে। ফলে অনেক শ্রমিকের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

একজন প্রবীণ নৌযানচালক বলেন, একসময় ভৈরব নদ দিয়ে বড় জাহাজ সহজেই চলাচল করত। বর্তমানে অনেক স্থানে চর জেগে উঠেছে। জোয়ার ছাড়া নৌযান চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে, যা নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ভৈরব নদ শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের নয়, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় মাছের উৎপাদন কমেছে। তিগ্রস্ত হচ্ছেন নদীনির্ভর জেলেরা। পাশাপাশি পানি ধারণমতা কমে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। ব্যবসায়ী নেতারা জানান, অতীতে কয়েক দফা খননকাজ হলেও তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তাদের দাবি, নদের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো দ্রুত পুনঃখননের পাশাপাশি নিয়মিত ড্রেজিং ও দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

নওয়াপাড়া চেম্বার অব কমার্সের নেতাদের ভাষ্য, দেশের অর্থনীতিতে নওয়াপাড়া শিল্পাঞ্চল ও নৌবন্দরের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভৈরব নদে নাব্যতা সঙ্কট অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে শিল্প ও বাণিজ্য খাত বড় ধরনের তির মুখে পড়বে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, নদী খননের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপরে নজরে আনা হয়েছে। নাব্যতা পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদপে গ্রহণের উদ্যোগ চলছে। তবে সচেতন মহলের মতে, শুধু খনন নয়, নদী দখল ও দূষণ রোধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

অভয়নগরের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ভৈরব নদ আজ সঙ্কটের মুখে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নওয়াপাড়া বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের স্বার্থে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ নেয়া এখন সময়ের দাবি।