গোলাম রব্বানী কয়রা (খুলনা)
নিষিদ্ধ সময়ে খালে বিষ প্রয়োগ ও হরিণ শিকার বেড়েছে
খুলনা রেঞ্জে ১ বছরে ২৯৪ মামলায় গ্রেফতার ৩৯৬ জন
সুন্দরবনে বনদস্যু, চোরা শিকারি ও বন অপরাধীদের তৎপরতা পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না। বন বিভাগের ধারাবাহিক অভিযানে বিপুলসংখ্যক অপরাধী গ্রেফতার হলেও বন আইনের দুর্বল প্রয়োগ, আদালত থেকে দ্রুত জামিন এবং দৃশ্যমান শাস্তির অভাবে অনেকেই আবারো একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। বিশেষ করে নিষিদ্ধ সময়ে খাল ও নদীতে বিষ প্রয়োগ করে মাছ আহরণ এবং হরিণ শিকার নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে। তবে বন বিভাগ বলছে, সীমিত জনবল ও সরঞ্জাম নিয়েও নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযানের ফলে আগের তুলনায় বন অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খুলনা রেঞ্জে জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে ২৯৪টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৯৬ জনকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আরো ৬৩ জন আসামি পলাতক রয়েছে।
মামলাগুলোর মধ্যে অভয়ারণ্যে অবৈধভাবে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের অভিযোগে ১০৬টি, নদী-খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের অভিযোগে ৩৩টি এবং হরিণ শিকারসংক্রান্ত ৩৩টি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া ৮৪টি পিওআর, চারটি সিআর এবং ২০৬টি ইউডিআর মামলা করা হয়েছে।
বন বিভাগ দাবি করছে, তাদের অভিযানে ২২টি ট্রলার, ৩৪৯টি নৌকা, ছয় হাজার ৯৮৬টি অবৈধ কাঁকড়া ধরার আটন, ৯ হাজার ৮৩৩ মিটার দৌনদড়ি, দুই হাজার ৬১২ কেজি মাছ, এক হাজার ৯৮১ কেজি অবৈধভাবে আহরিত কাঁকড়া, ২০৩ কেজি মধু, ৪৮৭ কেজি হরিণের গোশত এবং পাঁচ হাজার ৭১২ মিটার হরিণ ধরার ফাঁদ জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি নদী ও খালে বিষ প্রয়োগকারী চক্রের কাছ থেকে ৮৭ বোতল অবৈধ কীটনাশকও উদ্ধার করা হয়েছে।
বন বিভাগ জানায়, হরিণ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী শিকারের সাথে জড়িত ১৩৫ জনের একটি বিশেষ তালিকা তৈরি করে তাদের ওপর নিবিড় নজরদারি চালানো হচ্ছে। এতে বন অপরাধের হার আগের তুলনায় কমেছে।
তবে মাঠপর্যায়ের বনকর্মীরা বলছেন, বিশাল বনাঞ্চল পাহারায় জনবল ও আধুনিক জলযানের সঙ্কট রয়েছে। যে কারণে তাদের প্রচুর আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও কার্যক্ষেত্রে গিয়ে নানা বাধার মুখে পড়তে হয় তাদের। অনেক সময় অভিযানে গেলে অপরাধীদের পাশাপাশি অনেকেক্ষেত্রে জেলেদের আগ্রাসী আচরণের মুখোমুখি পড়তে হয় তাদের, যা অভিযান পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
কয়রা উপজেলার সুন্দরবন ও পরিবেশ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি এবং ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আবু হাসান সরদার বলেন, বন বিভাগকে আধুনিক সরঞ্জামে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি বননির্ভর মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো গেলে বন অপরাধ আরো অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো: শরিফুল ইসলাম বলেন, স্মার্ট টহল, বিশেষ টহল এবং পায়ে হেঁটে টহলের মাধ্যমে বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। কিন্তু জনবল সঙ্কট, আধুনিক জলযানের অভাব এবং বননির্ভর মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা তাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। তার মতে, হরিণ শিকার ও বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করতে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার।
পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, দুর্গম বনাঞ্চলে চরম ঝুঁকি নিয়ে বনরক্ষীরা নিয়মিত টহল দিচ্ছেন। ফুট পেট্রোলিং, বিশেষ অভিযান, ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ফলে বন অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনকে সুরক্ষিত রাখতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তা আরো জোরদার করা প্রয়োজন।



