পর্যালোচনায় ড. বদিউল আলম

নির্বাচন নিয়ে কিছু প্রশ্ন থাকলেও মানুষ ভোট দিয়েছে নিরাপদে

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) স¤পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কিছু প্রশ্ন থাকলেও মানুষ নিরাপদে ভোট দিতে পেরেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটলেও দলগুলো নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছিলাম। এর সবগুলো গ্রহণ করা হলে এই নির্বাচন নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠেছে সেগুলো হয়তো উঠতো না। যেমন, আমরা নির্বাচনের ছয় মাস আগে ঋণ পরিশোধ করা, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের পরিবর্তে এফিডেভিট করে ৫০০ ভোটারের স্বাক্ষর নেয়ার বিধান করার জন্য সুপারিশ করেছিলাম।

রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে বুধবার সুজন আয়োজিত ‘সুজন এর দৃষ্টিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এমন মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন একরাম হোসেন।

সুজনের দৃষ্টিতে এবারের নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য : এবারের নির্বাচনের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয় সুজন’র পক্ষ থেকে। তার মধ্যে অন্যতম হলো, দ্বি-দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভ্যুদয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতা, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সাফল্য, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলের বিলুপ্তির সম্ভাবনা তৈরি, জামায়াতের উত্থান, দুই বড় দলের জয়ের মার্জিন, দুই দলের আঞ্চলিক প্রাধান্য, বাম দলগুলোর হতাশাব্যঞ্জক ফলাফল, জোটবদ্ধ রাজনীতির প্রবণতা, প্রায় ১৭ বছর পর অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন, ফলাফল কারসাজির অভিযোগ ও ৩০টি আসনে পুনর্গণনার দাবি, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি নতুন এমপি ও প্রথমবারের মতো ভোটারদের অংশগ্রহণ, জাতীয় পার্টির ভরাডুবি, পর্যবেক্ষক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন, ইত্যাদি।

অভিযোগ ইসির তদন্ত করা : বদিউল আলম বলেন, নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করে ফেললে তখন কমিশনের আর কিছু করার থাকে না। বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারে চলে যায়। তখন নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি হয়। কিন্তু আরপিও’র ৯১এফ এ উল্লেখ রয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি নির্বাচিত হওয়ার পরও তার হলফনামা নিয়ে যদি কোনো অভিযোগ ওঠে, তা হলে নির্বাচন কমিশন তদন্ত করে প্রমাণ পেলে তার নির্বাচন পর্যন্ত বাতিল করতে পারে।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে একরাম হোসেন বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন। নির্বাচনে দেশে মোট ৪২ হাজার ৭৯২টি ভোটকেন্দ্র ছিল। এই ভোটকেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৪০ শতাংশ ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। ৬০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫০টি দল এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। নির্বাচনে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে ৮৫ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, যা মোট প্রার্থীর ৪.১৯ শতাংশ। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৫০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২০টি দল থেকে ৬৬ জন নারীকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল, যা মোট নারী প্রার্থীর ৭৭.৬৫ শতাংশ। প্রতিটি রাজনৈতিক দল থেকে ৫ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন প্রদানের ব্যবস্থা রেখে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ চূড়ান্ত করা হলেও ৩০টি রাজনৈতিক দল কোনো নারীকে মনোনয়ন দেয়নি। এই নির্বাচনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৭৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এককভাবে ২০৯টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। অন্যান্য দলের ফলাফলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২, খেলাফত মজলিস ১, গণসংহতি আন্দোলন ১, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)-১ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। এ ছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সাতটি আসনে বিজয়ী হয়েছে। জোটগতভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ৭৭টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। বাম দলগুলোর জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট একটি আসনও পায়নি। নির্বাচনে ৮৫ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাতজন বিজয়ী হয়েছেন। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৭৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। বিজয়ী হয়েছেন চারজন। এই চারজনই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সদস্য।

কিছু অসামঞ্জস্যতা : সুজন-এর নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত তথ্যে বলা হয়েছে, আরপিও’র বিধান মেনে কোনো দলই দলীয় সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে প্যানেল তৈরি করেনি। পাবনার একটি সংসদীয় আসনের একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র দাখিলের ক্ষেত্রে বাধা প্রদানের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় ছোটোখাটো ত্রুটির কারণেও মনোনয়নপত্র বাতিলের অভিযোগ এসেছিল। সবচেয়ে বেশি মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর না মেলায়। তবে নির্বাচন কমিশনে আপিলে অনেকে প্রার্থিতা ফেরত পেয়েছেন। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক মনোনয়নপত্র বাছাইকালে ঋণখেলাপিদের ছাড় দেয়ার অভিযোগও উঠেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মনোনয়ন না পেয়ে অনেকে স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। তাদের ওপর দল থেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের চাপ ছিল। কয়েকজন দলীয় চাপের কারণে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেও অধিকাংশই (৭৮ জন) তা করেননি। পরে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি বলেন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন নির্বাচনের আইনি কাঠামোর সঠিকতার জন্য অনেকগুলো সুপারিশ করেছিল। কিন্তু অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ আমলে নেয়া হয়নি। ফলে ত্রয়োদশ নির্বাচনে সেগুলোর অভাব পরিলক্ষিত হয়।

অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ : সুজন’র পর্যবেক্ষণ হলো, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সার্বিক উপস্থিতি লক্ষ করা গেলেও তাদের ভূমিকা নিয়ে বড় আকারের পক্ষপাতের অভিযোগ পরিলক্ষিত হয়নি। সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা পরিলক্ষিত হওয়ায় এবং এ লক্ষ্যে মোটামুটিভাবে সফল হওয়ায় এ মানদণ্ডে নির্বাচনকে সন্তোষজনক বলা যেতে পারে। নির্বাচনে অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোটাররা তুলনামূলকভাবে নির্বিঘেœ ভোট প্রদান করতে পেরেছেন বলে প্রতীয়মান হয়। একাধিক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা এ মর্মে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রতিবেদন দিয়েছে। ফলে এ মানদণ্ডে নির্বাচনকে উচ্চমানসম্পন্ন নির্বাচন হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

ভোট গণনায় গুরুত্বপূর্ণ আসনে অনিয়ম : ভোট গণনা নিয়ে সুজন’র পর্যালোচনা হলো, ঢাকাসহ দেশের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে গণনা বিলম্ব হওয়া। কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল প্রতিবেদনে ঘষামাজা, এজেন্টদের অগ্রিম স্বাক্ষর নিয়ে নেয়া, স্বাক্ষরবিহীন কেন্দ্র ফলাফল প্রতিবেদন প্রেরণ ও গ্রহণ, ইত্যাদি অনিয়ম লক্ষ করা গেছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট নির্বাচন কমিশন ও গণমাধ্যমের কাছে এ সব অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপন করে ৩০টি আসনের ব্যালট পুনঃগণনার দাবি জানিয়েছে। তাই এ মানদণ্ডে নির্বাচনটি কাক্সিক্ষত মানের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পেরেছে বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয় না।

নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ব্যর্থতা : ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের কিছু বৈশিষ্ট্য ও প্রবণতা তুলে ধরে সুজন। তাদের তথ্য, প্রায় দুই ডজন প্রার্থী অভিযুক্ত ঋণখেলাপি এবং বেশ কয়েকজন দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের দালিলিক প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনে অবাধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারা এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। অনেক প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্ব পরিত্যাগ না করেই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে তাদের পার করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ইসির বিরুদ্ধে।

জাপা ও বামদের ভরাডুবি : সুজন’র তথ্য বলছে, বিএনপির ৪৯.৯৭ শতাংশ ভোট এককভাবে দেশের প্রায় অর্ধেক ভোটারের সমর্থন নির্দেশ করে। এই ফলাফল বিএনপিকে নির্বাচনের প্রধান নিয়ামক শক্তিতে পরিণত করেছে। দলটি অতীতে সর্বোচ্চ ৪১.১৬ শতাংশ (১৯৭৯) পেয়েছিল। অন্য দিকে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট নিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম ভোটব্যাংক হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। দলটি অতীতে সর্বোচ্চ ১৮টি আসন (২০০১) এবং সর্বোচ্চ ১২.১৩ (১৯৯১) শতাংশ ভোট পেয়েছিল। নির্বাচনে ভরাডুবির মুখে পড়েছে জাতীয় পার্টি ও বামপন্থী দলগুলো।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এর শুরু হয় যথাযথ আইনি কাঠামো তৈরির মাধ্যমে। আইনি কাঠামো সঠিক হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ সুগম হয়। আগের সরকারের আমলে পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এর ফলে দলীয় সরকারের অধীনে কোনোভাবেই সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনের পথ সুগম হয়নি। তিনি বলেন, গত ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে আমাদের একজন নির্বাচন কমিশনার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি গোপন করলে ভোটের পরেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা আশা করি, এসব বিষয়ে যেসব প্রশ্ন রয়েছে সেগুলোর যাতে সুরাহা হয় সে জন্য তদন্ত করবে।