বাংলা সাহিত্যে ‘সব্যসাচী’ শব্দটি খুব সহজে ব্যবহার করা যায় না। যে লেখক একই সঙ্গে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, গবেষণা, সম্পাদনা ও অনুবাদে সমান দক্ষতা দেখাতে পারেন— তার ক্ষেত্রেই শব্দটি মানায়। সেই বিরল কাতারের লেখকদের একজন ছিলেন আব্দুল মান্নান সৈয়দ। তিনি কেবল একজন কবি নন, কেবল একজন প্রাবন্ধিকও নন; তিনি ছিলেন একাই একটি সাহিত্য-প্রতিষ্ঠান।
অনেকেই তাকে গুলিয়ে ফেলেন সৈয়দ শামসুল হকের সাথে। নামের মিল আছে, বাসস্থানও কাছাকাছি— কলাবাগান-গ্রিন রোডের একই পরিসর। কিন্তু দু’জনের সাহিত্যিক স্বভাব ছিল আলাদা। শামসুল হক মূলত কবি-নাট্যকার; মান্নান সৈয়দ ছিলেন বহুমাত্রিক— কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, গবেষক, সম্পাদক, অনুবাদক— সব মিলিয়ে এক সম্পূর্ণ সাহিত্যভুবন। তার পারিবারিক শিকড় পশ্চিমবঙ্গে। দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দগদগে স্মৃতি নিয়ে তার পিতা সৈয়দ বদরুদ্দোজা পূর্ববাংলায় চলে আসেন। গোপীবাগ থেকে গ্রিন রোড— বাসা বদলেছে, কিন্তু সেই বেদনা বদলায়নি। কলকাতায় ১৯৪৩ সালে জন্ম নেয়া মান্নান সৈয়দের ভেতরে তাই এক ধরনের নির্বাসিত স্মৃতি কাজ করত। তার রচনায় সাম্প্রদায়িকতা নেই, কিন্তু জীবনের বাস্তবতায় তিনি নিজেই সাম্প্রদায়িকতার শিকার। পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার বাগান, ভিটেমাটি— সবই ফেলে আসা ইতিহাস।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি সিলেট সরকারি কলেজে বাংলা পড়াতেন। শিক্ষকতা তার পেশা হলেও, সাহিত্য ছিল তার সাধনা। সে সময়ের একটি সাহিত্য-গোষ্ঠী— ঝড়তোলা এক তরুণ প্রজন্ম— তাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। কবি আফজাল চৌধুরীর সংস্পর্শে এসে তিনি কবিতার ভেতরে আধ্যাত্মিকতা, বিশ্বাস ও মানবিক বোধের সমন্বয় খুঁজে পান। এই প্রভাব তার পরবর্তী রচনায় গভীরভাবে ছাপ ফেলেছে।
আসলে মান্নান সৈয়দের জীবন মানেই ছিল নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্যচর্চা। তিনি শুধু লিখতেন না, অন্যদের লেখা পড়তেন, উৎসাহ দিতেন, সংশোধন করতেন। বাংলা সাহিত্য পরিষদের নানা অনুষ্ঠানে তাকে দেখা যেত নিয়মিত। নিউ এলিফ্যান্ট রোডের অফিসে তরুণ লেখকরা জড়ো হতো, আলোচনায় মাতত। আমি নিজেও সেখানে বহুবার গিয়েছি। বিস্ময়ের বিষয়— তিনি আমার মতো সাধারণ একজন মানুষকেও প্রশংসা করতেন। বড় লেখকরা অনেক সময় দূরে থাকেন, কিন্তু তিনি ছিলেন অমায়িক, সহজ, আপনজনের মতো।
তার গ্রিন রোডের বাসাটিও যেন ছিল এক সাহিত্য-আড্ডাখানা। বাড়িতে গেলে দেখা যেত বইয়ের স্তূপ, কাগজপত্র, খসড়া, পাণ্ডুলিপি। সেই বাড়ির একটি ‘ভয়ঙ্কর’ স্মৃতিও আছে— বিদেশী জাতের একটি কুকুর, যে একদিন আমাকে প্রায় আক্রমণ করেছিল! কুকুর তো সাংবাদিক চিনবে না। আমি ভয়ে দোয়া পড়ছি, আর বৃদ্ধ বদরুদ্দোজা সাহেব এসে আমাকে রক্ষা করলেন। আজ ভাবলে মনে হয়, সেই দৃশ্য যেন মান্নান সৈয়দের জীবনেরই রূপক— ভেতরে তীব্রতা, বাইরে স্নেহ। মান্নান সৈয়দের সাহিত্যবোধ ছিল ব্যাপক ও গভীর। তিনি ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম-বিশেষজ্ঞদের একজন। নজরুল নিয়ে তার গবেষণা ও বিশ্লেষণ এখনো প্রামাণ্য বলে বিবেচিত। টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে, সেমিনারে, আলোচনায় তার ডাক পড়ত নিয়মিত। নজরুলের জীবন ও কাব্য নিয়ে কথা বলতে গেলে তার কণ্ঠে এক ধরনের আবেগ ঝরে পড়ত।
একই সময়ে আমরা দেখেছি বাংলা সাহিত্যে অন্য অনেক লেখকের উত্থান। হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠলেন, হুমায়ূন আজাদ প্রাবন্ধিক হিসেবে আলোচিত হলেন, হুমায়ূন কাদির গল্পকার হিসেবে নাম করলেন। কিন্তু মান্নান সৈয়দের অবস্থান ছিল ভিন্ন— তিনি জনপ্রিয়তার চেয়ে গভীরতাকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন লেখকের লেখক; পাঠকের কাছে নয়, সাহিত্যিকদের কাছে বেশি শ্রদ্ধেয়। তার জীবনে প্রশাসনিক দায়িত্বও এসেছে। জেলা গেজেটিয়ারের সম্পাদক হয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন, গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। কিন্তু আমলাতন্ত্রের চাকচিক্য তার স্বভাবের সাথে মানানসই ছিল না। তার জায়গা ছিল বইয়ের টেবিলে, পাণ্ডুলিপির পাশে, সাহিত্যসভায়। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সংযমী, দায়িত্বশীল। তার একমাত্র কন্যা চিকিৎসক হয়েছেন এবং বাবার কবিতা সম্পাদনার কাজ করেছেন— এ যেন তার সাহিত্য-ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার।
২০১০ সালে নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে একটি টিভি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে তার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। যেন কাজ করতে করতেই বিদায় নিলেন। একজন প্রকৃত সাহিত্যসাধকের জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত বিদায় আর কী হতে পারে?
আজ যখন বাংলা সাহিত্যে বহুমুখী লেখক কমে যাচ্ছে, যখন একেকজন একেক ঘরানায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখছেন, তখন আব্দুল মান্নান সৈয়দকে মনে পড়ে আরও বেশি। তিনি আমাদের শেখান— সাহিত্য কোনো একরৈখিক পথ নয়; এটি বহুধারার সম্মিলন। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, গবেষণা— সব মিলিয়েই একজন লেখকের পূর্ণতা। তাকে মনে হলে আমার চোখে ভেসে ওঠে গ্রিন রোডের সেই বাড়ি, বইয়ের স্তূপ, অমায়িক হাসি, আর এক নিরহঙ্কার মানুষ। সব্যসাচী লেখকের আসল পরিচয় হয়তো এটাই— তিনি নিজের জন্য লেখেন না, তিনি সাহিত্যকেই বাঁচিয়ে রাখেন।
আব্দুল মান্নান সৈয়দ তাই শুধু একটি নাম নন; তিনি এক যুগের বিবেক, এক প্রজন্মের আলোকবর্তিকা, আর বাংলা সাহিত্যের নিভৃত সাধনার এক অনন্য প্রতীক।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক



