স্কুলের নৈশপ্রহরীদের জীবন

বর্তমান নীতিমালায় নৈশপ্রহরীদের কোনো ছুটি নেই, এ ব্যবস্থায় এই পদের একজন কর্মচারীর ছুটি নির্ভর করে প্রধান শিক্ষকের ইচ্ছার ওপর। অন্যান্য কর্মচারীর সাথে সমন্বয় করে তাকে ছুটি দিতে হয়। এ অবস্থার অবসান করতে হলে প্রতি স্কুলে একাধিক নৈশপ্রহরী দরকার। নৈশপ্রহরীরা অধিকারগুলো কেন পাবেন না? তাদের অধিকার দেয়ার জন্য শ্রম আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি, চিকিৎসা ছুটি, শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা দিতে হবে। সেই সাথে অতিরিক্ত কাজের জন্য ওভারটাইমের ব্যবস্থা করলে এবং আইন বাস্তবায়নে তদারকির ব্যবস্থা করলে হয়রানির অবসান হবে

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
রাতের বেলায় স্কুল পাহারায় থাকেন নৈশপ্রহরীরা। দিনে কোনো অনুষ্ঠানে বাড়তি লোক দরকার হলেও নৈশপ্রহরীদের ডাক পড়ে। দিন শেষে সবাই যখন স্কুল ছেড়ে চলে যান, তখন চাবি বুঝিয়ে দিতে ডাকা হয় নৈশপ্রহরীদের। স্কুলে চুরি হলে অনেক ক্ষেত্রে প্রহরীকেই রিমান্ডে নেয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জরিমানাও গুনতে হয় তাদের।

এই পেশায় নিয়োজিতরা এভাবেই সারা বছর নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন। নেই সাপ্তাহিক ছুটি, অর্জিত ছুটি অথবা নৈমিত্তিক ছুটি। অসুস্থ হলে চিকিৎসার ছুটিও নেই। এ যেন মধ্যযুগের সেই দাস প্রথা! বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে এই পদে থাকা লোকদের এমন অমানবিক অবস্থার মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে!

বছরের ৩৬৫ দিন তাদের ডিউটি করতে হয়! অবিশ্বাস্য হলেও এটিই সত্যি। প্রত্যন্ত হাওরে কাজ করা এক নৈশপ্রহরী তার দুঃখগুলো শুনাচ্ছিলেন। তিনি ছুটি চাইলে প্রধান শিক্ষক জানিয়ে দেন, তার কোনো ছুটি নেই। স্ত্রীর অসুস্থতার জন্য একবার তাকে শহরের হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। ছুটি চেয়েও পাননি। ওই দিন তাকে অনুপস্থিত দেখানো হয়। এমন আরও শত শত নৈশপ্রহরীর হতাশা আর বুকভরা কষ্ট নিয়ে চলছে বেসরকারি মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসাগুলো।

আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইন কোনোটাই বাংলাদেশের বিদ্যালয়গুলোর নৈশপ্রহরীদের ওপর এই জুলুমের বিষয়টি সমর্থন করে না। বাংলাদেশের ‘শ্রম আইন ২০০৬’ এর ১০০ ও ১০২ ধারা অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা এবং সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা কাজ করার বিধান আছে। অতিরিক্ত কাজ করলে তা ওভারটাইম হিসেবে গণ্য হবে। তার জন্য মূল মজুরির দ্বিগুণ হারে ভাতা দেয়ার নিয়ম আছে। একই আইনে সাপ্তাহিক ছুটির বাধ্যবাধকতা আছে (কারখানা ও শিল্প ও প্রতিষ্ঠানের জন্য এক দিন, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্য দেড় দিন)।

আশ্চর্যের বিষয় হলো— শ্রম আইনে স্পষ্টভাবে ১৪ দিন অসুস্থতাজনিত ছুটির কথা থাকলেও বাংলাদেশের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এই নিয়ম মানা হয় না। আন্তর্জাতিক শ্রম আইনে (সি-০০১) ওভার টাইমসহ একজন শ্রমিককে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৬০ ঘণ্টার বেশি কাজ করা নিরৎসাহিত করেছে। এই আইনে আরেক ধারায় একজন শ্রমিকের সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৪০ ঘণ্টা কাজকে সমর্থন করা হয়েছে। কিন্তু নৈশপ্রহরীদের ক্ষেত্রে দেশের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কোনো আইনের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।

শুধু কি তাই? এই পেশার লোকগুলো যেন রোবট! এমন বাস্তবতায় এই পেশার মানুষগুলোর দুরবস্থা নিরসনে তৎপর হয়েছিল তাদের সংগঠন। ২০২৬ সালে এপ্রিল মাসে ‘বাংলাদেশ এমপিওভুক্ত নৈশপ্রহরী কল্যাণ পরিষদ’ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, সিনিয়র সচিব, সচিব এবং অধিদফতরের মহাপরিচালক বরাবর আবেদন দাখিল করেন। তারা আশায় ছিলেন, নতুন এমপিও নীতিমালায় তাদের সমস্যার সমাধান অবশ্যই থাকবে। কিন্তু হয়নি কিছুই। এমপিও নীতিমালা-২০২৫ এ তাদের সমস্যার কোনো সমাধান দেয়া হয়নি।

সমস্যা হলো বেশির ভাগ নৈশপ্রহরী স্বল্প শিক্ষিত হওয়ায় আন্দোলন-সংগ্রামেও যেতে পারেন না। তাদের দাবির কথাগুলো তুলে ধরতে পারেন না সবসময়। স্বীকৃত শ্রমিক সংগঠনগুলো নৈশপ্রহরীদের তাদের দলভুক্ত মনে করে না। ফলে এই পেশার লোকগুলোর ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না।

বর্তমান নীতিমালায় নৈশপ্রহরীদের কোনো ছুটি নেই, এ ব্যবস্থায় এই পদের একজন কর্মচারীর ছুটি নির্ভর করে প্রধান শিক্ষকের ইচ্ছার ওপর। অন্যান্য কর্মচারীর সাথে সমন্বয় করে তাকে ছুটি দিতে হয়। এ অবস্থার অবসান করতে হলে প্রতি স্কুলে একাধিক নৈশপ্রহরী দরকার।

নৈশপ্রহরীরা অধিকারগুলো কেন পাবেন না? তাদের অধিকার দেয়ার জন্য শ্রম আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি, চিকিৎসা ছুটি, শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা দিতে হবে। সেই সাথে অতিরিক্ত কাজের জন্য ওভারটাইমের ব্যবস্থা করলে এবং আইন বাস্তবায়নে তদারকির ব্যবস্থা করলে হয়রানির অবসান হবে।

লেখক : শিক্ষক

[email protected]