ওয়ালীউল হক
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ঘিরে ১৯৭১ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তৃতীয় দফা যুদ্ধ হয়। এর আগে ১৯৪৮ সালে প্রথমবার এবং ১৯৬৫ সালে দ্বিতীয়বার দু’দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল কাশ্মির নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং মুক্তিযুদ্ধকে একটি সফল পরিণতিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করে। মুক্তিযুদ্ধের একপর্যায়ে নভেম্বরের শেষদিকে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান পরিচালনা করলে পাকিস্তান ৩ ডিসেম্বর ভারতের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে। ১৩ দিনের এই যুদ্ধে পাকিস্তান শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত তাদের সব সৈন্য ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতের কতজন সৈন্য নিহত হয়েছে তার সঠিক হিসাব এখনো পাওয়া যায় না। যেমন পাওয়া যায় না মুক্তিযুদ্ধে আমাদের কতজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছে- তারও নিশ্চিত হিসাব। ভারতের কতজন সৈন্য নিহত হয়েছে তার সঠিক হিসাব না পাওয়া বিস্ময়কর। কারণ, যুদ্ধে যেকোনো বাহিনীর হতাহত ও নিখোঁজ সৈন্যের হিসাব না থাকার কোনো কারণ নেই, যেহেতু তারা শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধকালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কতজন শহীদ হয়েছে, ইপিআরের কতজন শহীদ হয়েছে, এমনকি পুলিশের কতজন শহীদ হয়েছে তার হিসাব সরকারের কাছে আছে। শুধু নেই সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের হিসাব, কারণ তাদের নাম আগেভাগে তালিকাভুক্ত ছিল না এবং তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগও নেয়া হয়নি। নিহত ভারতীয় সৈন্যসংখ্যা সম্পর্কে একেকজন একেকরকম তথ্য দিয়েছেন। এখন দেখা যাক কে কী তথ্য দিয়েছেন।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ লে. জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব তার ‘সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা : বার্থ অব এ ন্যাশন’ বইয়ে জানিয়েছেন ডিসেম্বর মাসে সংঘটিত পাক-ভারত লড়াইয়ে ভারতের হতাহতের সংখ্যা ছিল- এক হাজার ৪২১ জন নিহত, চার হাজার ৫৮ জন আহত ও ৫৬ জন নিখোঁজ।
আবার বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, ভারতের নিহত সৈন্যের সংখ্যা হচ্ছে, এক হাজার ৬৮৭ জন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিহত সৈন্যদের সম্মানার্থে এক হাজার ৬৮৭টি ক্রেস্ট তৈরি করে ভারতে পাঠানো হয়েছে।
লেখক সালাম আজাদ ‘মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান’ নামক তার বইয়ে মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতের সাড়ে তিন হাজারেও বেশি সৈন্য নিহত হওয়ার কথা লিখেছেন। নিহত সৈন্যদের নাম ও পদবিসহ একটি তালিকা তিনি তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন। তার তথ্য মতে, ভারতের নিহত সৈন্যের সংখ্যা হচ্ছে তিন হাজার ৬৩০, নিখোঁজ ২১৩ এবং আহত ৯ হাজার ৮৫৯ জন।
মিজানুর রহমান চৌধুরী তার ‘রাজনীতির তিনকাল’ বইয়ে লিখেছেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় নিয়মিত বাহিনীর প্রায় পাঁচ হাজার অফিসার ও সৈনিক নিহত হন। এ ছাড়া পশ্চিম বাংলার প্রাইভেট বাহিনী এমনকি কিছু নকশালীও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে জীবন দিয়েছেন। (পৃষ্ঠা-১৩১)
নূহ-উল-আলম লেনিন সম্পাদিত ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল’ বইয়ে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দলের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিহত ১৪ হাজার জওয়ানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, তারা বাংলার মাটিতে রক্ত দিয়ে বাংলার মানুষকে বাঁচিয়েছিল।
২০১৫ সালে নওগাঁয় আয়োজিত এক মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে ভারতের তৎকালীন সহকারী হাইকমিশনার সন্দীপ মিত্র দাবি করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের ১২ হাজার সেনা প্রাণ দিয়েছেন। সে কারণে ভ্রাতৃপ্রতিম প্রতিবেশীর সাথে ভারতের সম্পর্ক নিবিড়। (দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১২ অক্টোবর ২০১৫)
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রশীদ তার এক লেখায় দাবি করেছেন, মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনীর প্রায় ২৫ হাজারেরও বেশি সৈন্য নিহত হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ভারত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণসহ অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিল। বিজয়ের আগের মুহূর্তে পাকিস্তান কর্তৃক সামরিকভাবে আক্রান্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে নিজস্ব সৈন্য, বর্ডার গার্ড দ্বারা মুক্তিযোদ্ধাদের সক্রিয় সহযোগিতা প্রদান করেছিল। ফলে যুদ্ধ সংক্ষিপ্ত হয়েছিল এবং আমাদের বিজয় নিশ্চিত হয়েছিল। যুদ্ধে ভারতের সশস্ত্রবাহিনীর প্রায় ২৫ হাজারের ওপর সৈন্য শহীদ হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, ভারতের নিহত সৈন্যের সংখ্যা এক হাজার ৪২১ থেকে শুরু করে ২৫ সহস্রাধিক। এখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক- হিসাবের এত পার্থক্য কেন? জেনারেল জ্যাকবের দেয়া হিসাব হচ্ছে- ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব। পাকিস্তান বিমানবাহিনী ৩ ডিসেম্বর ভারতের বিমানঘাঁটিতে বোমাবর্ষণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধের ঘোষণা দিলেও আসলে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল আরো অনেক আগেই। কারো কারো মতে, ২২ নভেম্বর দু’দেশের মধ্যে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। ভারতীয় বাহিনী চৌগাছা দখল করে যশোর শহরের উপকণ্ঠে পৌঁছে গিয়েছিল এবং শহরের ভেতর কামানের গোলাবর্ষণ করছিল।
জেনারেল জ্যাকবের তথ্যের ব্যাপারে নেতাজী সুভাষ বসুর ভাই শরৎ বসুর নাতনী শর্মিলা বসু তার ‘ডেড রেকনিং’ বইয়ে লিখেছেন, সশস্ত্রবাহিনীর কাছ থেকেই একমাত্র যথাযথভাবে ‘মাথা গণনা’ বা সৈন্য সংখ্যা, আহত ও নিহতের সংখ্যা পাওয়া যেতে পারে। তবে সেগুলোও প্রায়ই একদম সুনির্দিষ্ট হয় না, যেমন সচরাচর মনে করা হয়। তার মতে, ডিসেম্বরের আগে থেকেই ভারতের বাংলাদেশের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি বিবেচনায় আনলে এবং ডিসেম্বরের আগে ভারতীয় সেনাদের হতাহতের ব্যাপারে অনেক বাংলাদেশী ও পাকিস্তানির দাবি হিসাবে ধরলে ভারতের হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা পাওয়া যাবে। অর্থাৎ- তার ধারণা, জ্যাকবের উল্লিøখিত সংখ্যা থেকে অনেক বেশি হবে।
তার এই বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায় ফারুক আজিজ খানের লেখা ‘বসন্ত-১৯৭১’ বইয়ে। ফারুক আজিজ খান প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘যশোরে সম্মুখযুদ্ধে মাহবুবউদ্দিন মারাত্মক আহত হন। সামরিক সচিব আবদুস সামাদ, উপসচিব ওয়ালিউল ইসলাম ও আমি মিলে ব্যারাকপুরে সামরিক হাসপাতালে মাহবুবকে দেখতে যাই। সেটি ১২ অক্টোবর। কলকাতা থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ব্যারাকপুরের রাস্তাটা ভালো ছিল। তার পরও আমাদের দুই ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয়। পথজুড়ে সাঁজোয়া যান ঘন ঘন উত্তর দিকে আসছিল। কয়েক মিনিট পরপরই এসব যানের জন্য অন্যদের পথ ছেড়ে দিতে হচ্ছিল। আবার বিপরীত দিক থেকে একের পর এক অ্যাম্বুলেন্সে করে আহত সেনাদের আনা হচ্ছিল হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য। কেউ কেউ মারাত্মকভাবে আহত ছিল। ব্যারাকপুর হাসপাতাল প্রাঙ্গণে তাঁবু খাটিয়ে বাড়তি চাপ মোকাবেলার ব্যবস্থা করা হয়। এমনকি সড়কের দুই পাশেও তাঁবু খাটাতে হয়। ছোটবেলায় কলকাতা ও সিরাজগঞ্জে সামরিক হাসপাতালে আমি সেনাদের আনাগোনা দেখেছি। সেটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে। সেই দৃশ্য আর এখনকার দৃশ্য একই রকম মনে হলো।
যখন আমরা ব্যারাকপুর হাসপাতালে পৌঁছালাম, তখন সেখানে বিপুল সংখ্যক আহত ভারতীয় সেনা দেখে বিস্মিত হলাম। তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। এরা নিশ্চয়ই সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়নি।’ (পৃষ্ঠা : ১৬৪-১৬৫)
বিএসএফের তৎকালীন প্রধান খসরু ফারামুর্জ রুস্তমজির (কে এফ রুস্তমজির) লেখা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে নোট থেকে জানা যায়, মার্চ মাসেই তার প্রতি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশ ছিল, ‘আপনাদের যেভাবে যা করতে ইচ্ছে হয় করুন; কিন্তু ধরা পড়া যাবে না।’ ইন্দিরা গান্ধীর ওই নির্দেশ থেকে বোঝা যায়, বিএসএফ প্রথম থেকেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সক্রিয় ছিল। ফলে মার্চ থেকে শুরু করে ডিসেম্বরে যুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত যেসব ভারতীয় সৈন্য নিহত হয়েছে তাদের তথ্য ভারত সরকারকে গোপন রাখতে হয়েছে এই কারণে যে, এসব তথ্য প্রকাশিত হলে ভারতকে বহির্বিশ্বে চাপের মুখে পড়তে হতো এবং পাকিস্তানের দাবির সততা প্রমাণিত হতো। পাকিস্তানের অভিযোগ ছিল, ভারত পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করার জন্য গেরিলাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দেয়ার পাশাপাশি নিজেরাও সামরিক তৎপরতা চালাচ্ছে।
ভারতের মেজর জেনারেল এস এস উবানের লেখা, ‘ফ্যান্টমস অব চিটাগাং : দ্য ফিলথ আর্মি ইন বাংলাদেশ’ থেকে জানা যায়, ভারতে অবস্থানরত তিব্বতিদের নিয়ে গঠিত ফ্রন্টিয়ার ফোর্স এসএসএফ মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম দখলে প্রধান ভূমিকা পালন করে। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত লড়াইয়ে ভারত চীনের কাছে পরাজিত হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ভারত দালাই লামার সাথে ভারতে অবস্থানরত তিব্বতিদের নিয়ে এই বাহিনী গঠন করে। উল্লেখ্য, এসএসএফকে যেখানে প্রশিক্ষণ দেয়া হতো সেই একই স্থানে মুজিব বাহিনীকেও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রাম দখলের লড়াইয়ে এসএসএফের যারা হতাহত হয়েছিল তাদের স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর হতাহতের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কারণ এসএসএফ ভারতীয় কোনো সামরিক সংগঠন নয়।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক বাঙালি প্রধান জেনারেল শঙ্কর রায় চৌধুরী ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআইকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, মুক্তিবাহিনীতে ভারতীয় নাগরিকরাও ছিল। তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল ধরা পড়া যাবে না। ধরা পড়লে তাদেরকে অস্বীকার করা হবে। অর্থাৎ- বলা হবে, তারা ভারতীয় নাগরিক নয়। (তার ওই সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ ইউটিউবে দেখা যায়)
মিজানুর রহমান চৌধুরীর তথ্যটিও কৌতূহলোদ্দীপক। তিনি বলেন, পশ্চিম বাংলার প্রাইভেট বাহিনী ও কিছু নকশালীও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। এই প্রাইভেট বাহিনী কাদের উদ্যোগে এবং কাদের দ্বারা সংগঠিত সেটি পরিষ্কার নয়। অতএব এদের মধ্যে কারা হতাহত হয়েছে তা সরকারি হিসাবে তালিকাভুক্ত হওয়ার কথা নয়।
নিহতের সংখ্যা বাড়িয়ে বলার হয়তো আরেকটি কারণ থাকতে পারে। ভারত হয়তো মনে করে থাকতে পারে, নিহতের সংখ্যা যদি বেশি হয় তাহলে তা বাংলাদেশের নাগরিকদের মনে ভারতের প্রতি একটি অন্যরকম অনুভূতি সৃষ্টি করবে, যা কি না বাংলাদেশের ওপর ভারতের আধিপত্য বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে। অর্থাৎ- নিহতের সংখ্যা যত বৃদ্ধি পাবে, বাংলাদেশীদের তা তত বেশি রক্তের ঋণে আবদ্ধ করবে।



