সুশাসন কেন চাই

সুশাসন কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি অপরিহার্যতা। একটি রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক অগ্রগতির জন্য সুশাসনই মূল ভিত্তি। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হতে চায়, তবে সুশাসনের বিকল্প নেই। এখন সময় এসেছে, সবাই একসাথে মিলেমিশে এই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করার; কারণ সুশাসনই পারে আমাদের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় করে তুলতে।

সাঈদ বারী
রাষ্ট্রের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা যখনই সামনে আসে, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে- কী সেই শক্তি, যা একটি দেশকে অনুন্নয়ন থেকে উন্নয়নের সোপানে নিয়ে যায়? অর্থনীতি, প্রযুক্তি, প্রাকৃতিক সম্পদ- এসবই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু এগুলোর কার্যকর ব্যবহারের পূর্বশর্ত একটিই, সুশাসন। বিশ্বপরিসরে তাকালে দেখা যায়, ইউরোপ কিংবা আমেরিকার উন্নত রাষ্ট্রগুলো কিংবা এশিয়ার জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সবগুলোই একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্যে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ- সুসংহত সুশাসন।

সুশাসন বলতে আমরা কী বুঝি? এটি কেবল প্রশাসনিক দক্ষতা নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক ধারণা, যার মধ্যে রয়েছে, আইনের শাসন, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত, দুর্নীতির প্রতিরোধ এবং মানবাধিকারের সুরক্ষা। সুশাসন এমন এক কাঠামো, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের কল্যাণে কাজ করে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নটি আরো জরুরি হয়ে ওঠে। আমরা কেন সুশাসন চাই? কারণ, আমাদের উন্নয়নযাত্রা আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচকগুলো ইতিবাচক হলেও, এই অগ্রগতির ধারা টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে সুশাসনের বিকল্প নেই।

প্রথমত, সুশাসন নিশ্চিত করে আইনের শাসন। একটি রাষ্ট্র তখনই স্থিতিশীল থাকে, যখন তার নাগরিকরা বিশ্বাস করে, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা নিশ্চিত হয়েছে। আইনের শাসনের অনুপস্থিতিতে সমাজে বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম এবং অবিচার বাড়ায়। বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা নষ্ট হলে জনগণ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে প্রলুব্ধ হয়, যা রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।

দ্বিতীয়ত, সুশাসন দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাখে। দুর্নীতি একটি দেশের অর্থনীতিকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে। উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ লুটপাট হলে, জনগণের জন্য নির্ধারিত সেবা বাস্তবায়িত হয় না। সুশাসনের কাঠামোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত থাকলে, দুর্নীতির সুযোগ সঙ্কুুচিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়।

তৃতীয়ত, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য সুশাসন অপরিহার্য। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এমন দেশেই বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন, যেখানে নীতির ধারাবাহিকতা রয়েছে, আইনের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া জটিল নয়। সুশাসন থাকলে ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং অর্থনীতি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়।

চতুর্থত, সুশাসন সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে। সুশাসিত রাষ্ট্রে ধনী-গরিব, ক্ষমতাবান-অক্ষম করতে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকার সবার কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্র পালন করে। এতে করে সামাজিক বৈষম্য কমে এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে ওঠে।

পঞ্চমত, সুশাসন নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুশাসনের মাধ্যমে জনগণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে, যা রাষ্ট্রকে আরো কার্যকর ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ করে তোলে।

বাংলাদেশে সুশাসনের অভাবের ফলে যে সমস্যাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তার মধ্যে অন্যতম হলো, প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্নীতির বিস্তার এবং নীতির অস্থিরতা। অনেক সময় দেখা যায়, একটি ভালো নীতি প্রণয়ন করা হলেও, তার বাস্তবায়নে ব্যর্থতা দেখা দেয়। এর প্রধান কারণ, জবাবদিহির অভাব এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।

এক্ষেত্রে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় উদাহরণ হতে পারে সিঙ্গাপুর। একটি সময় এটি ছিল সীমিত সম্পদের একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্র। কিন্তু দৃঢ় নেতৃত্ব, কার্যকর প্রশাসন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের মাধ্যমে এটি আজ বিশ্বের অন্যতম উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থা থেকে উঠে এসে প্রযুক্তি ও শিল্প খাতে বিস্ময়কর উন্নয়ন সাধন করেছে, যার পেছনে ছিল সুশাসনের দৃঢ় ভিত্তি।

বাংলাদেশও এই পথ অনুসরণ করতে পারে, যদি আমরা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক হই। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শক্তিশালী ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, দক্ষ প্রশাসন এবং সক্রিয় নাগরিক সমাজ। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করাও সুশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সুশাসন কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি একটি সম্মিলিত প্রয়াস। নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে, নিজেদের অধিকার সম্পর্কে জানাতে হবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। একই সাথে, নৈতিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা জাগ্রত করতে হবে, যাতে সুশাসনের সংস্কৃতি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়।

পরিশেষে বলা যায়, সুশাসন কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি অপরিহার্যতা। একটি রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক অগ্রগতির জন্য সুশাসনই মূল ভিত্তি। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হতে চায়, তবে সুশাসনের বিকল্প নেই। এখন সময় এসেছে, সবাই একসাথে মিলেমিশে এই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করার; কারণ সুশাসনই পারে আমাদের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় করে তুলতে।

লেখক : প্রকাশক ও কলামিস্ট

[email protected]