ড. মুহাম্মদ আনোয়ার জাহিদ
চব্বিশের জুলাইয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণ-অভ্যুত্থান চূড়ান্ত রূপ নেয়; এতে প্রায় দেড় হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। হাজারো মানুষ আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেন। এ বিপর্যয়ের মানবিক মূল্য জাতির ওপর এক গভীর নৈতিক দায় আরোপ করে— সংবিধানের অবক্ষয় ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি যেন আর কখনো গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে স্তব্ধ করে দিতে না পারে।
পরবর্তী পরিস্থিতিতে একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। উল্লিখিত সরকারের ক্ষমতা সংবিধানের লিখিত বিধান থেকে উৎসারিত ছিল না; বরং তা উদ্ভূত হয়েছিল প্রয়োজনের তাগিদে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট রাষ্ট্রের প্রয়োজনের নীতির (doctrine of state necessity) ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা স্বীকৃতি দেয়— যে নীতি সাংবিধানিক বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃত, বিশেষত যখন স্বাভাবিক আইনগত শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে এবং নৈরাজ্য এড়াতে শাসনব্যবস্থা বজায় রাখা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এটি নজিরবিহীন নয়। The State v Dosso, P.L.D. (1958 S.C. 533) মামলায় পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট হ্যান্স কেলসেনের বিপ্লবী বৈধতার তত্ত্ব (theory of revolutionary legality) প্রয়োগ করে একটি নতুন সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে বৈধতা দিয়েছিল।
অন্তর্বর্তী সরকার ফ্যাসিবাদবিরোধী সব প্রধান রাজনৈতিক দলের সাথে পরামর্শক্রমে সংস্কার কমিশন গঠন করে। লক্ষ্য ছিল পতিত শাসনামলে সৃষ্ট কাঠামোগত দুর্বলতা ও দুর্নীতির উৎসগুলো চিহ্নিত ও সংশোধন করা। এসব সুপারিশ সমন্বিত হয়ে ‘জুলাই সনদ’ নামে একটি ঐকমত্যভিত্তিক সংস্কার রূপরেখা গঠিত হয়। সব প্রধান রাজনৈতিক দল এতে সম্মতি দেয়।
সনদ কার্যকর করতে গণভোটের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারিত হয়। বিএনপি সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজনের দাবি তোলে। অন্তর্বর্তী সরকার তা মেনে নেয়। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণ ভোট দেন। বিএনপি নিরঙ্কুশ সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং জুলাই সনদের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিপুলভাবে জয়ী হয়। কিন্তু এরপর নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। বিএনপি সংসদ সদস্যরা এমপি হিসেবে শপথ নিলেও প্রস্তাবিত গণপরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান। গণভোট বাতিল ঘোষণায় রিট আবেদন দাখিল হয়েছে।
দেশ আজ এক সাংবিধানিক সন্ধিক্ষণে। একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন হলো : প্রয়োজনের ভিত্তিতে বৈধ ঘোষিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন গ্রহণ করে, একই কর্তৃত্বে একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোট কি প্রত্যাখ্যান করা যায়? সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধটিতে এ বিষয়ে আলোকপাত করা হবে।
১. বৈধতার অবিভাজ্যতা : অন্তর্বর্তী সরকারের কর্তৃত্ব প্রয়োজনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। যদি বিএনপি যুক্তি দেয় যে, অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ববর্তী সংবিধানের সৃষ্ট সত্তা নয় বিধায় গণভোটটি সংবিধানসম্মত বৈধতা পায়নি, তবে একই আপত্তি সংসদীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য হবে। একই বিষয়ে একই সাথে গ্রহণ ও বর্জন করা যায় না।
Lissenden v CAV Bosch Ltd, [1940] 1 All E.R. 425 (H.L.) মামলায় হাউজ অব লর্ডসে নীতি সংক্ষেপে ব্যক্ত করে— কোনো পক্ষ একই দলিল এক দিকে গ্রহণ এবং অন্য দিকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। নির্বাচন ও গণভোট আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে অবিচ্ছেদ্যের ন্যায়। একটিকে অকার্যকর ঘোষণা করা মানে অন্যটির বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।
অতএব, বিএনপির সামনে দু’টি বিকল্প উন্মুক্ত : প্রয়োজনের ভিত্তিতে সার্বভৌম জনগণের অভিব্যক্তি হিসেবে উভয় প্রক্রিয়াকে বৈধ হিসেবে স্বীকার করা, অথবা উভয়কে প্রত্যাখ্যান করা। বেছে বেছে গ্রহণের এ প্রবণতা আইনগত সামঞ্জস্যতা ও জনআস্থা ক্ষুণ্ন করে।
২. Pacta Sunt Servanda-প্রতিশ্রুতি মানতে হবে : বিএনপি জুলাই চার্টারের শর্তাবলিতে সম্মতি দিয়েছিল। গণভোট আয়োজনের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছিল; বরং সংসদীয় নির্বাচনের সাথে একই দিনে গণভোট আয়োজনের পক্ষে জোরালো মত দিয়েছিল।
Pacta sunt servanda-অর্থাৎ চুক্তি বা অঙ্গীকার অবশ্যই রক্ষা করতে হবে— আইনের একটি মৌলিক নীতি। যদিও এটি সবচেয়ে সুপরিচিতভাবে ভিয়েনা কনভেনশন অন দ্য ল’ অব ট্রিটিজের ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লিখিত, তবু এটি একটি সর্বজনীন আইনি নৈতিকতার প্রতিফলন। অভ্যন্তরীণ বিচারব্যবস্থাতেও এ নীতির প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। Balfour v Balfour, [1919] 2 KB 571 মামলায় আদালত উল্লেখ করেন, যখন পক্ষগুলো নিজেদের অভিপ্রায় স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে এবং তার উপর নির্ভরতা সৃষ্টি হয়, তখন বাধ্যতামূলক অঙ্গীকারের উদ্ভব ঘটে। এখানে বিএনপির সম্মতি ছিল না আকস্মিক, না অস্পষ্ট। তারা অন্তর্বর্তী সরকারকে নির্বাচন ও গণভোট একই সাথে আয়োজন করতে প্রভাবিত করেছিল। এখন যদি বিএনপি দাবি করে যে তারা কেবল কৌশলগত কারণে সম্মতি দিয়েছিল, ফল মেনে নেয়ার প্রকৃত অভিপ্রায় তাদের ছিল না— তবে তা ভ্রান্ত উপস্থাপনার (misrepresentation) শামিল হতে পারে। আইনের শাসন কৌশলগত দ্বিচারিতাকে পুরস্কৃত করে না।
৩. Estoppel-একই বিষয়ে বিপরীত অবস্থান গ্রহণ অগ্রহণযোগ্য : এস্টপেলের নীতি অনুযায়ী, কোনো পক্ষ পূর্বে যে বিষয়টি স্বীকার বা নিশ্চিত করেছে, পরবর্তীতে যদি অন্যরা সেই স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করে থাকে, তবে সেই পক্ষ তা অস্বীকার করতে পারে না। Central London Property Trust Ltd v High Trees House Ltd [1947] KB 130 মামলায় লর্ড ডেনিং প্রমিসরি এস্টপেলের নীতিটি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন, যদি কোনো স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি এমন উদ্দেশে দেয়া হয় যে তা বাস্তবায়িত হবে এবং বাস্তবেও যদি তার ওপর নির্ভর করে কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তবে তা অন্যায়ভাবে প্রত্যাহার করা যায় না।
বিএনপি প্রকাশ্যে জুলাই চার্টার এবং গণভোট সমর্থন করেছিল। ভোটাররা সেই আশ্বাসের ওপর আস্থা রেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বিএনপি নেতাদের আহ্বানে অনেকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। রাষ্ট্রও দ্বৈতপ্রক্রিয়া আয়োজনে বিপুল সম্পদ ব্যয় করেছে। এখন গণভোটকে অস্বীকার করা প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক ক্ষতির কারণ হবে। তাই এস্টপেলের নীতি অনুযায়ী এমন আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য নয়।
৪. সদিচ্ছা (Good Faith) একটি সাংবিধানিক মূল্যবোধ : সদিচ্ছা বা good faith কেবল আন্তর্জাতিক আইনের একটি নীতি নয়; এটি সাংবিধানিক শাসনের অন্তর্নিহিত একটি নৈতিক ভিত্তি। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা জনসমক্ষে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির সততার ওপর নির্ভর করে। সদিচ্ছার অনুপস্থিতিতে নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক নাটকে পরিণত হয়, যার প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্য থাকে না।
ভোটাররা বিএনপির গণভোট সমর্থনসূচক নির্বাচনী প্রচারের আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। নির্বাচনের ফল থেকে সুবিধা গ্রহণ করার পর গণভোট প্রত্যাখ্যান করা সদিচ্ছার নীতির পরিপন্থী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। গণতান্ত্রিক বৈধতা দাবি করে, নির্বাচনের পূর্ববর্তী বক্তব্য ও নির্বাচনের পরবর্তী আচরণের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকতে হবে।
বিভিন্ন দেশের আদালত সাংবিধানিক ব্যাখ্যায় গণতান্ত্রিক নৈতিকতার গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছে। Kesavananda Bharati v State of Kerala, AIR 1973 SC 1461 (1973) 4 SCC 225 মামলায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট ‘মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব’ (basic structure doctrine) ব্যাখ্যা করে বলেন, সাংবিধানিক সংশোধন এমন হতে পারে না যা সংবিধানের মৌলিক নীতিগুলো ধ্বংস করে। সদিচ্ছা এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব— যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৌলিক নীতির অন্তর্ভুক্ত।
৫. নৈতিকতা ও শাসনের কর্তৃত্ব : আইন যদি নৈতিকতার ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে তা জবরদস্তির মাধ্যম হয়ে ওঠে। নির্বাচনী প্রচারের সময় বিএনপির চেয়ারম্যান— বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী, তারেক রহমান গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে জনগণের প্রতি প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়েছিলেন। এ ধরনের আহ্বান গণভোটে বিপুল সমর্থন অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এখন গণভোট প্রত্যাখ্যান করা কেবল আইনি অসামঞ্জস্য নয়; এটি একটি নৈতিক লঙ্ঘনও বটে। এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে যে, জনগণের সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত ইচ্ছাকে একটি সরকার বাস্তবায়ন করতে অস্বীকার করে, সেই জনগণের কাছ থেকে কি সেই সরকারের নৈতিক কর্তৃত্ব অর্জিত হতে পারে?
রাজনৈতিক নৈতিকতা সাংবিধানিক বৈধতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। যে রাজনৈতিক দল সংস্কারমূলক ম্যান্ডেট সমর্থন করে ক্ষমতায় এসেছে, সে দল যদি ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই ম্যান্ডেট অস্বীকার করে, তবে তার শাসনের নৈতিক ভিত্তি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গণভোটকে সম্মান করার বিকল্প নেই : এখন স্পষ্ট যে গণভোট বিষয়ে বিএনপির অবস্থান আইনগত ও নৈতিকভাবে টেকসই নয়। তবে বর্তমান অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে এবং গণভোটের ফল অকার্যকর ঘোষিত হলে, বিপ্লব-পূর্ব সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক কাঠামোগুলো অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা তৈরি হবে। জুলাই চব্বিশের আকাঙ্ক্ষায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন বা স্থায়ীভাবে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের স্মৃতি রাজনৈতিক সুবিধাবাদের বিষয়বস্তুতে পরিণত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিপ্লবকে একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মুহূর্ত হিসেবে না দেখে; বরং প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার একটি বেদনাময় প্রাক্কাল হিসেবে স্মরণ করা হতে পারে।
অন্য দিকে, গণভোটের রায় বহাল রাখা এটি নিশ্চিত করবে, সার্বভৌম জনগণের ইচ্ছা, যখন প্রয়োজনের ভিত্তিতে আইনসম্মতভাবে প্রকাশিত হয় এবং যখন প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো তাতে সম্মতি দেয়, তখন সেটি সহজে উপেক্ষা করা যায় না। এটি এমন একটি বার্তা দেবে, গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়; বরং তা বাস্তব ও বাধ্যতামূলক দায়িত্ব।
উপসংহার : আইনি ও নৈতিক যুক্তি এখানে এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। প্রয়োজনের ভিত্তিতে বৈধতা প্রাপ্ত অন্তর্বর্তী সরকারের কর্তৃত্বই নির্বাচন ও গণভোট— উভয় প্রক্রিয়ার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। বিএনপি একটিকে গ্রহণ করে অন্যটিকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। জুলাই চার্টারে সম্মতি প্রদান, গণভোটের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ এবং সমন্বিত প্রক্রিয়া থেকে নির্বাচনে সুবিধা লাভের মাধ্যমে দলটি আইনগতভাবে pacta sunt servanda, এস্টপেল এবং একই বিষয়কে এক দিকে স্বীকার ও অন্য দিকে অস্বীকার না করার নীতির (principle against approbation and reprobation) দ্বারা আবদ্ধ হয়েছে। পাশাপাশি জনগণের প্রতি সদিচ্ছার ভিত্তিতে প্রদত্ত প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে দলটি নৈতিকভাবেও দায়বদ্ধ হয়েছে। একই দিনে জনগণ দু’টি মতামত প্রকাশ করেছেন। গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটকে অর্ধেক ভাগে বিভক্ত করা যায় না।
লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ঢাকা



