পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় : কী হতে যাচ্ছে

‘পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের পর সেখানে রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে। এর ফলে বাংলাদেশে কোনো ধরনের অনুপ্রবেশ বা ‘পুশইন’ হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। আগাম সতর্কতা হিসেবে বিজিবিকে সীমান্ত এলাকায় কড়া নজরদারি ও সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে।’ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই উত্থান এবং কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রচার দুই দেশের মানুষের মধ্যে বিভাজন বাড়িয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশের সাথে পশ্চিমবঙ্গের দুই হাজার কিলোমিটারেরও বেশি সীমান্তের ব্যবস্থাপনা এখন আলোচনার বিষয় হবে। এ বিশাল সীমান্ত এবং নিবিড় আর্থসামাজিক সম্পর্কের কারণে এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঢাকার জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ

‘উন্নয়নের সামনের সারিতে’ নিয়ে আসার অঙ্গীকার করে পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছেন নরেন্দ্র মোদির বিজেপি। মহারাষ্ট্র, গুজরাট, তামিলনাড়ু, কর্নাটকের মতো পশ্চিমবঙ্গকেও শিল্পোন্নত রাজ্যে পরিণত করবেন জানিয়েছেন তিনি। ভাতাভিত্তিক জীবন থেকে ‘ভালো থাকার’ স্বপ্ন বঙ্গবাসী এখন দেখতেই পারে। এই প্রথম বাংলাদেশকে বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে ফেলল বিজেপি। বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক সবসময়ই নয়াদিল্লির সাথে, কলকাতার সাথে নয়। তবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বরাবরই দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে। এখন কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই দল ক্ষমতায়। এই ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কেও বড় প্রভাব ফেলবে।

দিল্লির হিন্দু জাতীয়তাবাদী কেন্দ্রীয় সরকার মিডিয়া ও প্রচার কৌশল, সোশ্যাল মিডিয়া, আইটি সেল, লক্ষ্যভিত্তিক প্রচারণা— এসব ব্যবহার করে দ্রুত জনমত তৈরি করতে সক্ষম হয়। বিজেপি বিপুল শক্তি ব্যবহার করে গ্রাম পর্যন্ত সংগঠন বিস্তার করে এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, যেমন— প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নির্বাচনী প্রচারে জোরালোভাবে যুক্ত হয়ে জয়ের পাল্লা ভারী করে। রাজনৈতিক সহিংসতাও আরেক বাস্তবতা। তৃণমূল কংগ্রেসের টানা শাসনের পতন, রাজ্য শাসনে প্রথমবারের মতো বিজেপির উত্থান— সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদল এখন পুরো ভারতে আলোচনার কেন্দ্রে। বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে রাজ্যে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি রাজ্যজুড়েই। আটকের ঘটনা শত শত ছাড়িয়ে চলে গেছে হাজারে। বিজয়ী বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহকারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

১৯৪৭ সালের আগস্ট থেকে ১৯৫০-এর জানুয়ারি পর্যন্ত সরকারের প্রধানকে পশ্চিমবঙ্গের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিহিত করা হতো। তারপর ‘প্রধানমন্ত্রী’ শব্দটির পরিবর্তে ‘মুখ্যমন্ত্রী’ শব্দটি চালু হয়। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তিনি মাত্র পাঁচ মাস ওই পদে আসীন ছিলেন। এরপর তারই সহকর্মী ডা: বিধানচন্দ্র রায় তার স্থলাভিষিক্ত হন এবং ১৯৬২ সাল পর্যন্ত টানা ১৪ বছর প্রথমে প্রধানমন্ত্রী ও পরে মুখ্যমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। বাষট্টির ১ জুলাই তার মৃত্যুর পর চলতি বিধানসভার অবশিষ্ট মেয়াদে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন প্রফুল্লচন্দ্র সেন, তিনি ১৯৬২ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৭ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। এরপর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়। তিনি বাংলা কংগ্রেসের নেতা হিসেবে ১ মার্চ, ১৯৬৭ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং ২১ নভেম্বর ১৯৬৭ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৬৭ সালের শেষদিকে কিছু সময়ের জন্য প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ মুখ্যমন্ত্রী হন। এরপর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুকালের জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে অস্থির রাজনৈতিক অধ্যায় হিসেবে ধরা হয়। মতবিরোধের কারণে সরকার বারবার ভেঙে যায়। কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী), কংগ্রেস এবং আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্বের কারণে প্রশাসন প্রায় অচল হয়ে পড়ে।

১৯৬৭ সালে শুরু হয় রাজ্যে সহিংসতা ও অস্থিরতা এবং এর মধ্যে উগ্রবাদীদের উন্মেষ ঘটে। বিধায়কদের (এমএলএ) বারবার দলবদলের কারণে সরকারের আয়ুষ্কাল সীমিত হয়ে যায়। কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের কারণে রাজ্যে বিরোধী জোট বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে সামনে আসে বিপ্লবীরা। ১৯৬৯ সালের মে দিবসে কলকাতার ময়দানে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) গঠনের ঘোষণা দেন কানু সান্যাল। চারু মজুমদার এ পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও প্রধান তাত্ত্বিক নেতা নিযুক্ত হন। এরপর পার্টি গোপন (আন্ডারগ্রাউন্ড) রাজনীতি শুরু করে। নবগঠিত এ পার্টি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ (মাও সে তুংয়ের চিন্তাধারা) অনুসরণ করতে থাকে। চীনের বিপ্লবের আদলে ভারতে সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের ডাকে ভারতের তৎকালীন শাসকরা তটস্থ হয়ে ওঠেন। ওই সময়েই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়।

চারু মজুমদারকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ লকআপে চারু মজুমদারের মৃত্যু হয়। চারু মজুমদারের মতাদর্শ ভারতের বামপন্থী রাজনীতিতে একটি আমূল পরিবর্তনবাদী ধারার জন্ম দিয়েছিল, যা আজও নকশালবাড়ি আন্দোলন হিসেবে পরিচিত। ভারতের বেশ কিছু রাজ্যে তারা এখনো কম-বেশি সক্রিয়। মার্কসবাদীদের উত্থানে ১৯৬৭ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত রাজ্যে মোট চারটি জোট সরকার গঠিত হয় এবং তিনবার সীমিত সময়ের জন্য রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়। এরপর সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের মুখ্যমন্ত্রিত্বে কংগ্রেস পাঁচ বছরের পূর্ণ মেয়াদে পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিচালনা করে। ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী) নেতৃত্বে বামফ্রন্ট বিপুল ভোটে জিতে। টানা ২৩ বছর জ্যোতি বসু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘকালীন মুখ্যমন্ত্রিত্বের এটি একটি সর্বভারতীয় রেকর্ড। জ্যোতি বসুর পদত্যাগের পর তার উত্তরসূরি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পরবর্তী ১০ বছর রাজ্যের কমিউনিস্ট সরকারের নেতৃত্ব দেন। ২০১১ সালের নির্বাচনে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল জোট (ইউপিএ) বামফ্রন্টকে পরাজিত করে ১৯ মে মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এবারের নির্বাচনের পর শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিরোধী দল বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে হামলা, দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর, সংঘর্ষ, আগুন এবং হত্যাকাণ্ডসহ ঘটনাবলিকে ক্যাশ করছে হিন্দু জাতীয়তাবাদী শক্তি। সেই সাথে অনেকে স্মরণ করছেন সেই ১৯৬৭ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে অস্থির রাজনৈতিক অধ্যায়ের কথা। পশ্চিমবঙ্গের নয়া নেতা শুভেন্দু শেখ হাসিনার জন্য আবার রাজসম্মানের অন্যতম আয়োজক। শেখ হাসিনাকে ঢাকার বিমানবন্দরে বিশাল সমাবেশে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করানোর ঘোষণা রয়েছে তার।

বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য তা অবশ্যই ভাবনার নতুন বিষয়। তার ওপর সীমান্ত সমস্যা, অনুপ্রবেশ তকমা ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে চাপ তৈরির বাতাস ঘুরছে। আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ মিলিয়ে লাখ লাখ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া সীমান্ত সঙ্কটে নতুন মাত্রা যোগ করবে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বড় অংশই মুসলিম, যাদের ‘বাংলাদেশী’ বা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে বিজেপি। শুভেন্দু সরাসরিই বলেছেন, এরা মমতাকে পছন্দ করে ভোট দেয়। কোণঠাসা হয়ে পড়লে তাদের একটি অংশ জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে চলে আসতে চাইতেও পারে।

এবারের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের মূল অভিমুখই ছিল, পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীতে ভরে গেছে। নির্বাচনের দিনও ভবানীপুর কেন্দ্রে শুভেন্দু বলেছেন, ‘বাংলাদেশী রোহিঙ্গা’ ও ‘বাংলাভাষী’রা এখানে রয়েছে। বিজেপির সার্বিক প্রচারটাই ছিল যে, গোটা পশ্চিমবঙ্গে লাখ লাখ রোহিঙ্গা, এরা সবাই বাংলাদেশ থেকে এসেছে এবং এদের তাড়াতে হবে। আসামের হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এবং পশ্চিমবঙ্গের শুভেন্দু অধিকারীর মতো নেতারা বিজেপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়াতে যেভাবে ‘বাংলাদেশবিরোধী’ বক্তব্যকে রাজনৈতিক পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন, তাতে আগামীতে পশ্চিমবঙ্গেও ‘পুশইন’ বা ‘পুশব্যাক’ আতঙ্ক বাড়তে পারে।

বিজেপির এই জয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুযোগ তৈরি করতে পারে এমন বলছেন কেউ কেউ। সেটি বিশেষ করে তিস্তা প্রশ্নে। ২০১১ থেকে ‘তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি’ অধরা। মনমোহন সিং ও নরেন্দ্র মোদি বারবার যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রসঙ্গ তুলে চুক্তি সই থেকে পিছিয়ে গেছেন। মমতার বিরোধিতাকে আমল দিয়েছেন। কলকাতা ও দিল্লিতে এখন একই দলের সরকার কায়েম হওয়ায় সেই অজুহাত আর খাড়া করা যাবে না। পাশাপাশি গঙ্গা চুক্তির নবায়ন ও ভিসা সমস্যা সমাধানের বিষয়েও আলোচনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এখন কেন্দ্র ও রাজ্য— উভয় জায়গায় একই দল ক্ষমতায় থাকায় বাংলাদেশ পানি বণ্টনের বিষয়ে জোরালো দাবি তোলার একটি পরিষ্কার সুযোগ হয়েছে। সীমান্তে বেসামরিক মানুষ প্রায়ই নিগৃহীত হয়, এমনকি সীমান্ত চুক্তি থাকার পরও। অনেকেরই পরিবার-পরিজন দুদিকেই আছে, কর্মসংস্থান দুদিকে। তারা অনেক সময় মরিয়া হয়ে আসা-যাওয়ার চেষ্টা করে। বিজেপির দিক থেকে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরো কঠোর করা হলে নিগৃহীত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়বে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের পর সেখানে রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে। এর ফলে বাংলাদেশে কোনো ধরনের অনুপ্রবেশ বা ‘পুশইন’ হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। আগাম সতর্কতা হিসেবে বিজিবিকে সীমান্ত এলাকায় কড়া নজরদারি ও সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে।’ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই উত্থান এবং কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রচার দুই দেশের মানুষের মধ্যে বিভাজন বাড়িয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশের সাথে পশ্চিমবঙ্গের দুই হাজার কিলোমিটারেরও বেশি সীমান্তের ব্যবস্থাপনা এখন আলোচনার বিষয় হবে। এ বিশাল সীমান্ত এবং নিবিড় আর্থসামাজিক সম্পর্কের কারণে এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঢাকার জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]