ডাকসু নির্বাচনে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

আমরা আশা করি, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে যদি আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টা চালানো যায়; তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিনের এ পুঞ্জীভূত অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও ন্যায় পরিপন্থী পন্থা থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে। সেই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রকৃত অর্থে একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

কথায় বলা হয় ইতিহাস নিজে থেকে নিজের পুনরাবৃত্তি ঘটায়। কথাটির একটি বিশেষ তাৎপর্য আছে। বরং এর সমর্থনে পবিত্র আল কুরআনের একটি আয়াতে আল্লাহর ঘোষণা- ‘আমি মানুষের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ইতিহাসের এ দিনগুলোর পালাবদল ঘটাই, যাতে করে তোমাদের মধ্যে কারা প্রকৃত ঈমানের অধিকারী তা তিনি বাস্তবে দেখতে পারেন, আর তিনি তোমাদের কিছু লোককে শহীদ হিসেবে গ্রহণ করতে চান’। (আল কুরআন-৩ : ১৪০)

এবারের ডাকসু নির্বাচনের ফল সামনে রেখে পর্যালোচনা করলে একটি চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে, তা হলো এই : ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পরবর্তী পরপর দু’বছর ডাকসুর জিএস পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন অধ্যাপক গোলাম আযম এবং হাসিনার স্বৈরশাসনমুক্ত হয়ে ভারতীয় আগ্রাসনমুক্ত বাংলাদেশে ২০২৪ সালে দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জনের পরবর্তী বছর, তথা সাম্প্রতিককালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও বিপুল বিজয় পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের ৮০ শতাংশ প্রার্থী। এভাবে দেখা যায়, দীর্ঘ ৭৭ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক অভিন্ন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল।

প্রফেসর গোলাম আযম যখন ডাকসুর জিএস পদে নির্বাচিত হন; তখন তিনি জামায়াত সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী ছিলেন না। কারণ, জামায়াতে ইসলামী তখন পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে ডাকসু নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করার মতো অবস্থানে পৌঁছায়নি। তবে অধ্যাপক গোলাম আযম পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীর সদস্য পদ লাভ করে অবিভক্ত পাকিস্তান ও বিভাগ পূর্ববর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক মাইলফলক সৃষ্টির কৃতিত্ব অর্জন করেন। এই মাইলফলকগুলোর অন্যতম হচ্ছে :

১. বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র-ভাষার মর্যাদার দাবিতে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকারের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলীর খানের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি স্মারকলিপি দেন। স্মারকলিপিটি রচনার দায়িত্ব ছিল সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিপি আব্দুর রহমান চৌধুরীর ওপর। অধ্যাপক গোলাম আযমের দাবির মুহূর্তে তখন লিয়াকত আলী খান এ দাবি পূরণে কোনো প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত কনেননি। তবে এ দাবি ঘিরে ১৯৫২ সালে তীব্র ছাত্র আন্দোলন শুরু হয় এবং পুলিশের গুলিতে কয়েকজন ছাত্র শাহাদতবরণ করেন। যার ফলে পাকিস্তানে বাংলা ভাষা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

পরবর্তীতে অধ্যাপক গোলাম আযম জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর জামায়াতের আমির নির্বাচিত হন।

২. তার নেতৃত্বে জামায়াত স্বৈরাচার আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া অধ্যাপক গোলাম আযম স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আশির দশকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

৩. নব্বইয়ের দশকে কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতির প্রস্তাব পেশ করে জাতিকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন। তিনি সততা, যোগ্যতা, সৎ-সাহস এবং চারিত্রিক বলিষ্ঠতায় এ কথা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, একজন দেশপ্রেমিক, সৎ ও যোগ্য নেতার ভূমিকার কারণে গোটা জাতি কিভাবে সুফল ভোগ করতে পারে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, আমরা জাতীয়ভাবে অধ্যাপক গোলাম আযমের প্রতি যে আচরণ করেছি তা পীড়াদায়ক। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক হিসেবে জাতি অধ্যাপক গোলাম আযমের অবদানের স্বীকৃতি এখনো দেয়নি। অনেকে কারণে-অকারণে একুশে পদক পেলেও অধ্যাপক গোলাম আযমকে এ পদকে ভূষিত করা হয়নি।

এখন ভারতীয় হেজিমনিমুক্ত বাংলাদেশের শাসনভার যাদের ওপর ন্যস্ত তাদের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে এ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রফেসর গোলাম আযমকে আগামী বছর (২০২৬ সালে) মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা। আসলে এ স্বীকৃতি প্রদানে তার কোনো উপকারে আসবে না, তবে জাতি হিসেবে আমরা একজন কৃর্তীমানের প্রাপ্য অধিকার দিয়ে নিজেদের উদারতা দেখাতে পারি।

এবার আমরা ভারতীয় আগ্রাসনমুক্ত দ্বিতীয় স্বাধীনতা-উত্তর প্রথম ডাকসু নির্বাচনে ভিপি, জিএসপদসহ ৮০ শতাংশ পদে বিপুল বিজয় অর্জনকারী ছাত্র সংগঠন তথা ছাত্রশিবিরের কাছ থেকে জাতির প্রত্যাশা কী সে সম্পর্কে কিছু প্রস্তাব তুলে ধরছি:

১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম্বলেম পরিবর্তন। পাকিস্তান অর্জনের পর থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয় পর্যন্ত, তথা ১৯৫২-৭২ সময়কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম্বলেমে পবিত্র কুরআনের যে আয়াতটি খচিত ছিল তা প্রতিস্থাপন করা।

এতে স্বীকৃতি ছিল যে, মানুষকে যেসব জ্ঞান দান করা হয়েছে সব মূলত আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের অংশ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ১৯৭৩ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম্বলেমটি পরিবর্তন করে তদস্থলে একটি ধর্ম-বিবর্জিত এম্বলেম প্রতিস্থাপন করা হয়, এতে যে স্লোগানটি খচিত হয়েছে; তা হলো : ‘জ্ঞানই আলো’, যা সত্যের অপলাপ মাত্র। কারণ, যে জ্ঞান স্রষ্টার সাথে সম্পর্কিত নয় তা আলো নয়; বরং অন্ধকার। এ ধর্মহীন স্লোগানটির রিবর্তনে বর্তমান ছাত্র সংসদকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

২. দীর্ঘদিন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীরা যে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন তার পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। সব উচ্চ মাধ্যমিক বা আলিম পাস শিক্ষার্থীর জন্য উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যেকোনো বিষয়ে ভর্তির সুযোগ রাখা বাঞ্ছনীয়।

৩. দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারপন্থী ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা ছাড়া অন্য কোনো সংগঠনের শিক্ষার্থীদের জন্য আসন বরাদ্দ পাওয়া কষ্টসাধ্য ছিল। যার দরুণ রাজনৈতিক বিবেচনায় সিট বরাদ্দে যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। নবনির্বাচিত ডাকসুর কাছে জাতির প্রত্যাশা- সব বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে শুধু মেধার ভিত্তিতে সিট বরাদ্দের নিয়ম চালু করা।

৪. বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর হতে এ যাবতকাল একমাত্র রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত দলের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া ছাড়া অন্যদের কোনো অধিকার স্বীকৃত ছিল না বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের।

অতএব বর্তমানে যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন; তাদের দায়িত্ব হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব অনিয়ম থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে মুক্ত করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো।

আমরা আশা করি, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে যদি আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টা চালানো যায়; তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিনের এ পুঞ্জীভূত অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও ন্যায় পরিপন্থী পন্থা থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে। সেই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রকৃত অর্থে একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্র সংসদকে আল্লাহ যেন এ ন্যায়ানুগ কাজগুলো সম্পাদনের তৌফিক দান করেন।

লেখক : আইআইইউসির সাবেক ভিসি এবং ইসলামী ব্যাংকের শরিয়াহ সুপারভাইজরি কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান