ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের দিন খুনোখুনি না হলেও এই নির্বাচন ঘিরে ফেব্রুয়ারি মাসে বিভিন্ন সংঘর্ষে ১০ জন নিহত এবং এক হাজার ৯৩৩ জন আহত হন। (ডেইলি স্টার, ৪ মার্চ ২০২৬) ১১ দলীয় জোট নেতারা ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর অভিযোগ আনেন। এই নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয় হলেও বলতেই হবে, জামায়াতের অর্জনও অনেক। কিন্তু বিএনপির সামনে আছে পাহাড়সমান চ্যালেঞ্জ।
জামায়াতের অর্জন : নির্বাচনে দৃশ্যমানভাবে জামায়াত পরাজিত হয়েছে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি জামায়াতের সুদূরপ্রসারী বিজয়। আশির দশকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রাজনীতি শুরুর পর থেকে এত বড় বিজয় আর কখনো পায়নি। ১৯৮৬-এর সংসদ নির্বাচনে পেয়েছিল ১০টি, ১৯৯১-এর নির্বাচনে ১৮টি, ১৯৯৬-এ তিনটি, ২০০১-এ ১৭টি এবং ২০০৮-এ দু’টি আসন পেয়েছিল জামায়াত। আর এবার পেয়েছে ৬৮টি আসন। জামায়াত মোট ভোটের ৩১.৭৬ শতাংশ আর বিএনপি ৪৯.৯৭ শতাংশ পেয়েছে। ২০০১ সালে এই হার ছিল যথাক্রমে ৪.২৮ এবং ৪০.৯৭ শতাংশ। ২৫ বছরে জামায়াতের ভোট বেড়েছে প্রায় আটগুণ এবং বিএনপির সাথে ব্যবধান ৩৬ শতাংশ থেকে কমে ১৮ শতাংশ হয়েছে। এত বিপুল জনসমর্থন বেড়ে যাওয়া জামায়াতের বিরাট বিজয় বলতে হবে।
এতে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এখন একটি গণসংগঠনে রূপ নিয়েছে। সংসদে বিরোধী দলে পরিণত হয়ে ঘরে-বাইরে, সমাজে এবং রাজনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবে। এভাবে তারা ভবিষ্যতে সরকার পরিচালনার মতো আত্মবিশ্বাস এবং যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ পাবে।
দেশের চলমান আর্থসামাজিক অবস্থায় ক্ষমতাসীনদের অসংখ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। দুর্নীতি ও অপশাসনের ঊর্ধ্বে ওঠে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা খুবই দুরূহ হবে। এই সুযোগে জামায়াতের এমপিরা আগামী পাঁচ বছর নিজেদের সততা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারলে সেটিই জামায়াতের বিজয়ের পথ মসৃণ করতে পারে। কাজেই সার্বিক দৃষ্টিতে এই নির্বাচনে আপাত পরাজিত হলেও প্রকৃতপক্ষে তা জামায়াতের বিজয়ের পথে এগোনোর সোপান।
নির্বাচনে উত্থাপিত অভিযোগ : জামায়াতের অভিযোগ, পঞ্চাশেরও বেশি আসনে কারচুপি ও ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। বেশ কিছু কেন্দ্রে ভোট চলাকালীন নীরব কারচুপি হয়েছে, আর মূল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজটি করা হয়েছে ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণার সময়। ভোটকেন্দ্র থেকে জামায়াতের এজেন্ট বের করে দেয়া, গণসিল মারা, গণনার সময় এজেন্ট থাকতে না দেয়া— ইত্যাদি অনেক কেন্দ্রেই ঘটার অভিযোগ রয়েছে। বেশ কিছু আসনে রেজাল্ট শিটে ওভাররাইটিং করা হয়েছে। তবে আলামত বলছে, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিষয়টি ছিল সুসমন্বিত ও সুপরিকল্পিত। কিছু আসনে জামায়াত জোটের শীর্ষ নেতাদের পরাজয় এবং বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থীদের সরু প্রান্তিক ব্যবধানে বিজয় সন্দেহ সৃষ্টি করে। আসন সুনির্দিষ্ট করে এসব ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে বলে অনেকে মনে করে। ৫৩টি আসনে মাত্র দুই থেকে সাত হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজয় সন্দেহজনক বলে মনে করে জামায়াত। এভাবে জামায়াতের দাবিমতে— শ’ খানেক আসনে ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে।
জামায়াতের নির্বাচনী সংগ্রাম : এই নির্বাচনে জামায়াতকে একসাথে অসংখ্য ফ্রন্টে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়েছে। প্রথমত, প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব। নির্বাচনী ডামাডোল শুরুর পর থেকে স্পষ্ট দেখা গেছে, প্রশাসন একদিকে হেলে পড়েছে। আর ফলাফল ঘোষণার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তা প্রমাণিত হয়েছে। নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একজন নেতার টাকা আটকের গল্প সাজিয়ে জামায়াতকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করে। মিডিয়া নির্লজ্জভাবে একটি দলের পক্ষে এবং জামায়াতের বিপক্ষে নিরবচ্ছিন্ন প্রচারাভিযান চালিয়েছে। জামায়াতের শীর্ষ নেতার ‘এক্স হ্যান্ডেল’ হ্যাক করার জন্য ভারতীয় সূত্র এবং বঙ্গভবনের কর্মকর্তার অফিস একযোগে কাজ করেছে। হেফাজতের শীর্ষ নেতা জামায়াতের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর ফতোয়া দিয়েছেন! অর্থাৎ— জামায়াতকে একসাথে অসংখ্য শক্তির বিরোধিতার মোকাবেলা করতে হয়েছে। সেই সাথে জামায়াতের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং সুশাসনের প্রতিজ্ঞা যত কঠোর হয়েছে— প্রশাসন ও বিভিন্ন সংস্থা ততই ভীত হয়ে পড়েছে। একই সাথে পশ্চিমা বিশ্ব জামায়াতের কার্যালয়ে ঘন ঘন যাতায়াত করে একটি ‘ক্যামোফ্ল্যাজ’ বা আড়াল সৃষ্টি করে জামায়াতকে আত্মতুষ্টিতে মশগুল রেখেছে। অন্যদিকে বেসরকারি ফলাফলের ভিত্তিতে শুভেচ্ছা জানিয়ে ভারত ও আমেরিকা দ্রুত নির্বাচনকে বৈধতা দিয়েছে।
জামায়াতের দুর্বলতাগুলো : সমাজে এবং রাজনীতিতে মহিলাদের অবস্থান এবং শরিয়াহ আইনের বিষয়ে জনগণের নেতিবাচক ধারণা দূর করতে পারেনি জামায়াত। এক শ্রেণীর সেক্যুলার এবং মিডিয়া গোষ্ঠী শরিয়াহ ও নারীবিষয়ে জামায়াতের অবস্থানকে তীব্রভাবে নেতিবাচক করে তুলেছিল। সেই সাথে কয়েকজন জামায়াত নেতার কিছু অসংযত বক্তব্য বিরোধীদের হাতে ধারালো অস্ত্র তুলে দিয়েছে। তাছাড়া ঐক্য করতে গিয়ে বেশ কিছু নিশ্চিত আসন ছেড়ে দেয়া হয়েছে। চরমোনাইয়ের পীরের সাথে ঐক্যে যাওয়াটা ছিল আত্মঘাতী। ঘন ঘন বিদেশী কূটনীতিকদের যাওয়া-আসায় জামায়াতের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়ে। অন্যদিকে জামায়াতের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় তৃণমূলে দুর্বলতা ছিল। ফলে পোলিং এজেন্ট নিয়োগ থেকে শুরু করে ফল ঘোষণা পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণের কাজটি তারা পেশাদারিত্বের সাথে করতে পারেননি। তারা সম্ভবত ভেবেছিলেন, জনগণ ভোট দিলেই তারা বিজয়ী হয়ে আসতে পারবেন।
জয়-পরাজয়ের হিসাব : ইসলামের ইতিহাস শুধু বিজয় গাথা দিয়ে ভরপুর নয়; আল্লাহর রাসূল সা: বদরে বিস্ময়কর জয়ের পর ওহুদের যুদ্ধে বিপর্যস্ত হন। ১০ বছরের ইতিহাসে বেশ ক’বার পরাজিত হন। মক্কা বিজয়ের পরও পাশের এলাকা তায়েফ অবরোধ করে জয়ী হতে পারেননি। হুদায়বিয়াতে চাপানো শর্তে সন্ধিও করেন। বৃহত্তর স্বার্থে সাময়িক পরাজয় মেনে নিয়ে বা আপস করে বিজয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্যে কাজ করাটাই ইতিহাসের শিক্ষা। সেই সাথে সমসাময়িক ইতিহাসে আলজেরিয়ার নির্বাচন (১৯৯১), মিসরের মুরসির করুণ বিদায়, তিউনিসিয়ার আননাহদা পার্টির বিপর্যয়; আবার তুরস্কে এরদোগানের কৌশলী অগ্রযাত্রা থেকে অনেক শিক্ষাই রয়েছে ইসলামী আন্দোলনে সফলতার জন্য।
জামায়াতের জন্য সুযোগ : জামায়াতের জন্য সত্যিকারার্থে একটি সুযোগের দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। বিরোধী দলের আসনে বসে তারা এই সুযোগকে শতভাগ কাজে লাগাতে পারে। এ মুহূর্তে জামায়াত রাষ্ট্র পরিচালনায় গেলে ভেতরে-বাইরে ভয়াবহ প্রতিরোধের মুখোমুখি হওয়া ছিল অনিবার্য। এখন তাদের বিরোধীদলীয় অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে নাগরিকদের সাথে ব্যাপক-বিস্তৃত যোগাযোগ গড়ে তোলা সম্ভব। যাতে করে যেসব মৌলিক বিষয়ে নেতিবাচক ‘পাবলিক পারসেপশন’ রয়েছে সেগুলোর সমাধান হতে পারে। সেই সাথে সরকার ও সরকারের অলিগার্কদের দুর্নীতি ও তৃণমূল নাগরিকদের কাছে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জনমত গঠন করার জন্য সংসদের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। কারণ গত ১৬ বছরে ফ্যাসিস্টদের চাঁদাবাজি এবং দুর্নীতিতে মানুষ অতিষ্ঠ।
সংসদে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতকে অবশ্যই ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। সেই সাথে তাদেরকে কথায় ও কাজে সংযত এবং সতর্ক থাকতে হবে। স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার স্বাক্ষর রাখতে হবে। মিডিয়ার সাথে দূরত্ব কমাতে হবে। প্রতিটি আসনে বিজয়ী এমপিদের জননেতা হয়ে ওঠার সুযোগ হয়েছে। যার প্রভাব দেশব্যাপী বিস্তৃত হতে পারে। পরাজিত জামায়াত নেতাদেরও ঘরে ঘরে পৌঁছাতে হবে। ভূমি এখন যথেষ্ট উর্বর। এখানে বীজ ফেললেই ফসল ফলবে।
বিএনপির সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো : বিএনপি বিশাল বিজয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে। সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে তাদেরকে। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে বিজয়ের আনন্দ দ্রুতই বিষাদে পরিণত হতে পারে। অভ্যন্তরীণ দলীয়, রাষ্ট্রীয় এবং কূটনৈতিক এই ত্রিমাত্রিক সমস্যা বিচক্ষণতার সাথে সামলাতে ব্যর্থ হলে দেশও বিপর্যয়ে পড়তে পারে।
শেখ হাসিনার বিষাক্ত করে তোলা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পরিশুদ্ধ করা হবে বর্তমান সরকারের প্রধান দায়িত্ব। ভারত, চীন ও পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সমতা, ন্যায্যতা এবং সার্বভৌমত্ব ও সম্মানের বিষয়ে ভারতের কাছে কোনো ধরনের ছাড় গ্রহণযোগ্য হবে না। ভারতের হস্তক্ষেপ, সীমান্ত হত্যা এবং হাসিনার অসম চুক্তিগুলোর বিষয়ে নতজানু অবস্থান জনগণ মানবে না।
বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে তৃণমূলে দলের নিয়ন্ত্রণ। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ জিরো টলারেন্স না দেখালে ‘পাবলিক পারসেপশন’ সত্য প্রমাণিত হবে। তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না হলে এখান থেকে বের হওয়া ‘বিএনপির’ জন্য দুরূহ হবে।
বিরোধী মত ও পথকে কোণঠাসা করার কূটকৌশল, বিভিন্ন নিয়োগ-বাণিজ্য বা শুধু দলীয় লোকদের পুনর্বাসন প্রবণতা মানুষকে হতাশ করতে পারে। অলিগার্ক সাংবাদিক, শিল্পপতি এবং আমলাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শেখ হাসিনাকে ধ্বংস করেছিলেন অলিগার্ক সাংবাদিকরাই।
বিএনপি সরকার ভেতর-বাইরের এই সমস্যাগুলো যথাযথভাবে মোকাবেলা করতে পারলে এবং বিরোধী দলকে সাথে নিয়ে কাজ করলে বাংলাদেশের বিজয় হবে।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
Email : [email protected]



