বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তি : শৃঙ্খল নাকি সম্ভাবনা

বাণিজ্য কৌশল আরো ভারসাম্যপূর্ণ করতে হবে। একটি মাত্র বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার অন্যান্য বাজারে প্রবেশ বাড়াতে হবে। একই সাথে ভবিষ্যতে চুক্তির শর্ত উন্নত করার জন্য কৌশলগতভাবে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে, যাতে জাতীয় স্বার্থ আরো ভালোভাবে সংরক্ষিত হয়। সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, এই চুক্তি না নিখুঁত সাফল্য, না সম্পূর্ণ ব্যর্থতা। এটি এক বাস্তববাদী সমঝোতা, যা স্বল্পমেয়াদে স্থিতি এনে দিয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। শেষ পর্যন্ত সত্যটি খুব সরল। চুক্তি আমাদের বেঁধে দেয় না, আমাদের সিদ্ধান্তই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। কেউ বলছেন এটি দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত করেছে; আবার কেউ দেখছেন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হিসেবে। বাস্তবতা এই দুইয়ের মাঝামাঝি। এ চুক্তি জয়ের জন্য নয়, মূলত করা হয় ক্ষতি ঠেকানোর জন্য। সেই আত্মরক্ষামূলক সিদ্ধান্তের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এমন সুযোগ, যা কাজে লাগাতে পারলে অর্থনীতির গতিপথ বদলে যাবে।

চুক্তিটি ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দ্রুত স্বাক্ষর হওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষ করে যখন ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন আসন্ন। কিন্তু এই তাড়াহুড়োর পেছনে ছিল তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি— যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক অনিশ্চয়তা, ক্রেতাদের অর্ডার স্থগিতের ইঙ্গিত এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের চাপ। নির্বাচন-পূর্ব অনিশ্চয়তায় রফতানি খাতে আস্থা নষ্ট হলে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্ডার সরে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। তাই সরকার সময়ক্ষেপণ না করে বাজার স্থিতি ধরে রাখতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়, যা রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হলেও অর্থনৈতিকভাবে তাৎক্ষণিক ক্ষতি এড়ানোর জন্য জরুরি ছিল।

একই সাথে আরেকটি বাস্তবতা বিবেচনায় ছিল; নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার চুক্তির কিছু দিক পুনর্বিবেচনা করতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের পূর্ণ রাজনৈতিক ম্যান্ডেট না থাকলেও তাদের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ ছিল অর্থনৈতিক স্থিতি বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা ধরে রাখা। তাই চুক্তিটি অংশত একটি নীতিগত ধারাবাহিকতার বার্তা হিসেবেও কাজ করেছে, যাতে বোঝানো যায়, বাংলাদেশের বাণিজ্য নীতি হঠাৎ পরিবর্তনের ঝুঁকিতে নেই এবং রফতানিপ্রবাহ অব্যাহত থাকবে।

প্রেক্ষাপটটি পরিষ্কার করা দরকার। বাংলাদেশ প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১০-১২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করে, যার ৮০ শতাংশের বেশি তৈরী পোশাক (আরএমজি)। এই খাত সরাসরি প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে এবং আরো বহু মানুষের জীবিকা এর সাথে জড়িত। যদি হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের শর্ত কঠোর হয়ে যেত বা শুল্ক ৫-১০ শতাংশ বেড়ে যেত, তাহলে বছরে ৫০০ মিলিয়ন থেকে এক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রফতানি হ্রাসের ঝুঁকি ছিল। অর্ডার চলে যেত প্রতিযোগী দেশে, অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেত।

কোভিড মহামারীর সময় আমরা ৩০০ কোটি ডলারের বেশি অর্ডার বাতিল হতে দেখেছি। তখন প্রায় সহস্রাধিক কারখানা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয় এবং কয়েক লাখ শ্রমিককে সাময়িক ছাঁটাই অথবা বেতনহীন ছুটিতে পাঠানো হয়। বিশ্বব্যাপী পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের মোট রফতানি আয় একপর্যায়ে ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়, যা দেখিয়েছে এই খাত কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

এ বাস্তবতায় বাণিজ্যচুক্তিটির প্রয়োজন ছিল। এটি তাৎক্ষণিক ধাক্কা ঠেকিয়েছে এবং রফতানিপ্রবাহে স্থিতি এনেছে। কিন্তু এই স্থিতি বিনামূল্যে আসেনি। শুল্ক এখনো প্রায় ১৯ শতাংশ এবং নতুন নিয়মে উৎপাদন খরচ ৩-৫ শতাংশ বেড়েছে। ফলে স্পষ্ট, এই চুক্তি সরাসরি সুবিধা না দিলেও বড় ক্ষতি এড়াতে সাহায্য করেছে। বাস্তবে, চুক্তির আগে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অর্ডার পুনর্মূল্যায়ন শুরু করেছিল এবং কিছু বড় ব্র্যান্ড সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্যকরণের ইঙ্গিত দেয়। একই সময়ে ডলার সঙ্কট, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিরতা রফতানি খাতকে আরো দুর্বল করছিল। এই প্রেক্ষাপটে দেরি হলে আস্থাহীনতা বাড়ত এবং নতুন অর্ডার ঝুঁকিতে পড়ত। তাই দ্রুত চুক্তিতে পৌঁছানো ছিল বাজার ধরে রাখা ও আস্থা বজায় রাখার জরুরি কৌশল।

তবে এই চুক্তি শুধু আত্মরক্ষামূলক দৃষ্টিতে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এর ভেতরে এমন কিছু সম্ভাবনা রয়েছে, যা এখনো আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। বিশেষ করে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাত, যেখানে বাংলাদেশ একটি বড় সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এই সুযোগটিই এই চুক্তির সবচেয়ে অবহেলিত দিক। চুক্তি স্বাক্ষরের সময়ই নীতিনির্ধারকরা এই খাতকে ভবিষ্যতের শক্তি হিসেবে দেখেছেন, বিশেষত আঞ্চলিক খাদ্যচাহিদা, কাঁচামাল প্রাপ্যতা এবং প্রক্রিয়াজাত পণ্য রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক আয় বহুগুণ বাড়ানোর সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখে।

এখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে। উন্নত কৃষিপ্রযুক্তি, মানসম্মত কাঁচামালের স্থিতিশীল সরবরাহ এবং বৈশ্বিক মানদণ্ডে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশকে দ্রুত সক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের সংযোগ বাংলাদেশকে একটি কার্যকর আঞ্চলিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে রূপান্তরের পথে এগিয়ে নিতে পারে।

আমরা এখনো এ চুক্তির গুরুত্ব পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। আমাদের অর্থনৈতিক চিন্তা এখনো মূলত গার্মেন্টকেন্দ্রিক। ফলে যেসব খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলো প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

এই চুক্তির মাধ্যমে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে একটি নতুন মডেল তৈরি হয়েছে— আমদানি-প্রক্রিয়াকরণ-পুনরায় রফতানি। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, ভুট্টা বা সয়াবিনের মতো কাঁচামাল আমদানি করে দেশে তা প্রক্রিয়াকরণ করতে পারে এবং পরে তা উচ্চমূল্যের বাজারে রফতানি করতে পারে। এই বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, মালয়েশিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং তাইওয়ান, যেখানে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

এই দেশগুলোর অধিকাংশই খাদ্য আমদানিনির্ভর এবং স্থানীয় উৎপাদন দিয়ে চাহিদা পূরণ করতে পারে না। নগরায়ন, মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের চাহিদা বছরে ৫-১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। অন্য দিকে উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় তারা কম খরচে প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম দেশের ওপর নির্ভর করে। আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে কাঁচা গম এনে বিস্কুট বা নুডলস তৈরি করে বেশি দামে বিক্রি করতে পারি। এতে কারখানা বাড়বে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং একই পণ্য থেকে বেশি মূল্য সংযোজন সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয় এবং শিল্প সম্প্রসারণের সম্ভাবনা এই মডেল বাস্তবায়নের জন্য অনুকূল। সঠিক পরিকল্পনা ও অবকাঠামো থাকলে বাংলাদেশ একটি কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, যা নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রার উৎস তৈরি করবে। বঙ্গোপসাগর ঘেঁষা অবস্থানের কারণে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে সহজে পণ্য পাঠানো সম্ভব। ফলে বাংলাদেশ ভারত, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে একটি সম্ভাবনাময় আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

এই সুযোগের গুরুত্ব আরো বড় একটি জায়গায়। বাংলাদেশ দীর্ঘ দিন ধরে একটি শ্রমনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে পরিচিত; কিন্তু এ ধরনের প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠলে দেশ ধীরে ধীরে মূল্য সংযোজনভিত্তিক অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে পারবে— যেখানে কেবল উৎপাদন নয়, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে বেশি আয় করা সম্ভব। এর ফলে একই কাঁচামাল থেকে বহুগুণ বেশি আয় করা যাবে।

প্রশ্ন হলো— এই সুযোগটি এখনো আলোচনায় কেন আসেনি? কারণ এটি তাৎক্ষণিক ফল দেয় না। এটি সময়সাপেক্ষ এবং পরিকল্পনানির্ভর। অন্য দিকে ক্ষতি বা ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা সহজ এবং দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এর সাথে আরেকটি বাস্তবতা জড়িত। আমাদের নীতি ও বিনিয়োগ পরিকল্পনায় অনেকসময় স্বল্পমেয়াদি ফলের ওপর বেশি জোর দেয়া হয়, ফলে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন ও সক্ষমতা গঠনের সুযোগগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। পর্যাপ্ত অবকাঠামো, সমন্বিত নীতি এবং দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাবও এই সম্ভাবনাকে সামনে আনতে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে আমরা এই সুযোগের পূর্ণ মূল্যায়ন করতে পারছি না।

চুক্তির আরেকটি দিক হলো শিল্প ও বাণিজ্যের নতুন সুযোগ। তুলা আমদানি করে দেশে টেক্সটাইল উৎপাদন বাড়ানো, উন্নত সমুদ্রপথ ও বিমানপথ পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে লজিস্টিক খরচ কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এসব মিলিয়ে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে একটি উৎপাদন ও বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হতে পারে। এই ব্যবস্থার ফলে পণ্যের দ্বিমুখী (two-way) যাতায়াত সহজ হবে— একই পথে কাঁচামাল আসবে এবং প্রক্রিয়াজাত পণ্য রফতানি হবে, ফলে খালি জাহাজ বা বিমানের সংখ্যা কমে গিয়ে পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। দ্রুত লজিস্টিক ব্যবস্থার কারণে সময় সাশ্রয় হবে, ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়বে এবং অর্ডার সম্পাদনে ঝুঁকি কমবে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশকে একটি নির্ভরযোগ্য ও সুবিধাজনক সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে দেখতে শুরু করবে, যা আরো উন্নত ব্যবসায়িক সুবিধা ও নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়তা করবে।

তবুও ঝুঁকিগুলো অস্বীকার করা যায় না। কৃষি খাত বিদেশী পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় পড়বে, ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলো চাপের মুখে পড়তে পারে এবং ডিজিটাল খাতে নীতিগত স্বাধীনতা কিছুটা সীমিত হতে পারে। তাই এই চুক্তিকে এক দিকে সুযোগ হিসেবে দেখলেও, সতর্ক থাকার দরকার আছে। বিশেষ করে ভর্তুকিপ্রাপ্ত ও উচ্চ উৎপাদনশীল বিদেশী কৃষিপণ্যের কারণে স্থানীয় কৃষকরা ন্যায্য দাম পেতে সমস্যায় পড়তে পারেন। ছোট ও মাঝারি শিল্পে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতার চাপ বাড়লে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে না পেরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সাথে প্রযুক্তিনির্ভর খাতে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বাড়লে দেশীয় উদ্যোগ পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে এবং দীর্ঘমেয়াদে নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতা সঙ্কুচিত হতে পারে।

ঝুঁকি মোকাবেলার উপায়
ইতিহাস বলে, সঠিক নীতি, পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঝুঁকিকে সুযোগে পরিণত করা সম্ভব। তাই এই চুক্তির সফলতা নির্ভর করবে আমরা কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে প্রয়োজনীয় করণীয়গুলো গ্রহণ করতে পারি তার ওপর।

প্রথমত, কৃষি খাতকে সুরক্ষা দেয়া এবং একই সাথে আধুনিকায়ন অত্যন্ত জরুরি। বিদেশী ভর্তুকিপ্রাপ্ত পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হলে স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। এর জন্য দরকার উন্নত বীজ, আধুনিক যন্ত্রপাতি, সেচব্যবস্থা এবং সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো। পাশাপাশি ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে। কৃষিকে শুধু উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনের দিকে নিয়ে যেতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে শক্তিশালী করা অপরিহার্য। এই খাতই দেশের কর্মসংস্থানের বড় অংশ বহন করে; কিন্তু প্রতিযোগিতার চাপে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তাই সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং বাজার সম্প্রসারণে সহায়তা দিতে হবে।

তৃতীয়ত, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত খাতে যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, সেটিকে বাস্তবে রূপ দেয়া এখন সময়ের দাবি। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, কর সুবিধা এবং স্পষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে আমদানি-প্রক্রিয়াজাতকরণ-পুনরায় রফতানি মডেল কার্যকর করতে হবে।

চতুর্থত, লজিস্টিক ও অবকাঠামো উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন্দর, সড়ক, রেল এবং বিমান পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া দ্রুত ও সাশ্রয়ী বাণিজ্য সম্ভব নয়। একই সাথে কাস্টম ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করতে হবে।

পঞ্চমত, ডিজিটাল খাতে সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। বিদেশী প্রযুক্তি কোম্পানির প্রভাব বাড়ার সাথে সাথে দেশীয় উদ্যোক্তাদের শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

ষষ্ঠত, বাণিজ্য কৌশল আরো ভারসাম্যপূর্ণ করতে হবে। একটি মাত্র বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার অন্যান্য বাজারে প্রবেশ বাড়াতে হবে। একই সাথে ভবিষ্যতে চুক্তির শর্ত উন্নত করার জন্য কৌশলগতভাবে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে, যাতে জাতীয় স্বার্থ আরো ভালোভাবে সংরক্ষিত হয়।

সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, এই চুক্তি না নিখুঁত সাফল্য, না সম্পূর্ণ ব্যর্থতা। এটি এক বাস্তববাদী সমঝোতা, যা স্বল্পমেয়াদে স্থিতি এনে দিয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাবনার দরজা খুলেছে।

শেষ পর্যন্ত সত্যটি খুব সরল। চুক্তি আমাদের বেঁধে দেয় না, আমাদের সিদ্ধান্তই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

[email protected]