ভারতীয় জ্যোতিষীদের দৃষ্টিতে ধূমকেতু হচ্ছে অসুরের প্রতীক। আল-বিরুনীর ‘ভারততত্ত¡’ বইয়ে বরাহমিহিয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘ধূমকেতুর আবির্ভাবকালে মানুষ অমঙ্গলের আশঙ্কায় এত ভীত হয়ে পড়ে যে, তারা বাড়িঘর ছেড়ে ছোটাছুটি করতে থাকে। সাধারণভাবে ধারণা করা হতো, আসলে তা হচ্ছে পূর্বজন্মের কর্মফল।’
কাজী নজরুল ইসলাম ধূমকেতুকে দেখেছেন প্রচণ্ড শক্তিশালী, কিন্তু খেয়ালি অনাসৃষ্টি হিসেবে। ধূমকেতু নামে একটি অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকাও প্রকাশ করেন তিনি। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে ধূমকেতুকে ধ্বংসের প্রতীক ও দুনিয়ায় দুর্যোগ আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী বলে মনে করা হয়।
উপর্যুক্ত কারণে শেখ মুজিবুর রহমানকে ধূমকেতুসম মনে হয়। কারণ, তিনি একদিন প্রচণ্ড প্রতাপে এ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আত্মপ্রকাশ করেন। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে তার সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে দেশবাসীর ওপর দুঃশাসন চাপিয়ে দেন। এর পর হঠাৎ একদিন ঊর্ধ্বগগন থেকে ভূপাতিত হয়ে ইতিহাসের কৃষ্ণপক্ষে অবস্থান নেন। শেখ মুজিব নামক ধূমকেতুর পতন-মুহূর্তে আমার কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে আজকের এ লেখা।
১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সাল। দিনটি ছিল আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ দিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৪ সালে এমএ পরীক্ষার্থী ছিলাম। সেশনজটে পরীক্ষা গড়ায় ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। ১৩ কি ১৪ আগস্ট ছিল শেষ পরীক্ষা। স্বাভাবিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার। যেহেতু ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল, তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের দৃশ্যটি দেখার জন্য মনে আকাঙ্ক্ষা জাগে।
১৪ আগস্ট থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস নানা রঙের ফেস্টুন ব্যানারে ঠাসা ছিল। এর সাথে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো শেখ মুজিবের নানা অ্যাঙ্গেলের বিশাল বিশাল ছবিসংবলিত অনেক বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছিল। ছাত্রলীগের নেতাকর্মী এবং রক্ষীবাহিনীর জওয়ানরা দিনব্যাপী গ্রুপে গ্রুপে ক্যাম্পাসে সশস্ত্র মহড়া দিচ্ছিল।
ওই দিন শেখ মুজিবের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন চ্যান্সেলর হিসেবে কোনো সমাবর্তনে যোগদান, কিংবা বিশেষ কোনো একাডেমিক প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের উদ্দশ্যে ছিল না। ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। শেখ মুজিবের অদম্য আকাঙ্ক্ষা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যেন বাকশালে যোগদান করেন। তাই তিনি দেখতে চেয়েছিলেন শিক্ষকদের মধ্যে কারা কারা বাকশালের সদস্যভুক্ত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ভিসি, রেজিস্ট্রার, ট্রেজারার, ডিন ও প্রভোস্টরা তো বটেই, সিনিয়র প্রফেসরদের বেশির ভাগ সে দিন আনুষ্ঠানিকভাবে বাকশালে যোগদানে মুখিয়ে ছিলেন।
শেখ মুজিবের আগমন উপলক্ষে কেন্দ্রীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে মহাভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। আলোকসজ্জার তীব্রতা দেখে মনে হচ্ছিল; সে দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাত আসেনি। তবে আমরা যারা সাধারণ ছাত্র ছিলাম তারা এসব আড়ম্বর দেখে বরং বিরক্ত হচ্ছিলাম। তাই যথারীতি রাতে ঘুমিয়ে পড়ি।
আমি ছিলাম হাজী মহসিন হলের আবাসিক ছাত্র। শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে এক কক্ষে থাকতাম। ১৫ আগস্ট সকাল আনুমানিক সাড়ে ৪টা। চারদিকে মসজিদে মসজিদে মুয়াজ্জিন ফজরের আজান দিচ্ছিলেন। হঠাৎ অস্বাভাবিক জোরে জোরে কে যেন আমার দরজায় কষাঘাত করছেন। চার বছরের হল জীবনে কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি। হন্তদন্ত হয়ে উঠে দরজা খুলে দেখি পাশের রুমের বন্ধু চিৎকার দিয়ে আমাকে উদ্দেশ করে বলছেন, ‘শেখ মুজিব নিহত হয়েছেন’। অপ্রত্যাশিতভাবে তার মুখে শোনা বাক্যটি যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। হলের ছয় তলার বারান্দা থেকে দেখি চারদিকে মানুষ ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে মিছিল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন।
সে দিন দেশবাসীর অনুভূতি- যা প্রত্যক্ষ করেছি তা ছিল নিম্নরূপ :
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট দেশের আপামর মানুষের মধ্যে যে আনন্দঘন অনুভূতি লক্ষ করা গিয়েছিল; তা ভাষায় প্রকাশ করার নয়। দেশের মানুষ কোনো দিন কল্পনাও করেননি, তারা মুজিবের ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে অদূর ভবিষ্যতে মুক্তি পাবেন। শেখ মুজিব ক্ষমতার ঊর্ধ্বগগনে অবস্থান করছিলেন। তাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনো দল বা বিরোধী শক্তি দেশে বিদ্যমান ছিল না। এমতাবস্থায় একদিন সকালে দেশবাসী দেখতে পেলেন, দেশে থেকে ফ্যাসিবাদের জগদ্দলপাথর অপসারিত হয়েছে। মানুষজন এত আপ্লুত হয়েছিলেন, ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের শহরাঞ্চলে সব মিষ্টির দোকানের মিষ্টি দু-এক ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি হয়ে যায়। শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠজনসহ মানুষের মনে মুজিব হত্যার প্রভাব এত বেশি ছিল যে, ঘটনাটি সাধারণ মানুষ আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে সম্পাদিত হয়ে নিগৃহীত নিষ্পেষিত ও হতাশাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মুক্তি দানের অলৌকিক এক ঘটনা হিসেবে দেখেছিলেন। শেখ মুজিবের বাকশালী সংসদের স্পিকারের মন্তব্য থেকে আঁচ করা যায়, মানুষের মনে মুজিব হত্যার প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল। তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘আল্লাহ আমাদের ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছেন’।
১৫ আগস্ট শেখ মুজিবের নিহত হওয়ার সংবাদ শুনে মানুষের মনে যে আনন্দের উদ্রেক হয়েছিল; তা চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পলায়নে দেশবাসীর মুক্তির সাথে মৌলিক একটি পার্থক্য রয়েছে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে কিছু যৌক্তিক দাবি নিয়ে আন্দোলনরত, নিরস্ত্র, অসহায় শিক্ষার্থীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে সশস্ত্র হামলা থেকে এ আন্দোলন ধীরে ধীরে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে দাবানলের মতো দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ মুক্তির ক্ষীণ আশা নিয়ে আন্দোলনকারীদের সমর্থনে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। শেষে প্লাবনের মতো গণজোয়ারে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ৫ আগস্ট হাসিনা ভারতে পালিয়ে গিয়ে জীবন বাঁচান।
চব্বিশে শেখ হাসিনার জয়-পরাজয়ের উভয় সম্ভাবনা ছিল। তবে আল্লাহর বিশেষ ইচ্ছায় লাখো কোটি মানুষের আশা বাস্তবে রূপ নেয়। পক্ষান্তরে শেখ মুজিবের পতনে মানুষের মনে কোনো আশাবাদ ছিল না। তাই দেখা যায়, ১৫ আগস্ট ঘটনাকে মানুষ অপ্রত্যাশিত, অকল্পনীয়, অসম্ভব কিছু সংঘটিত হওয়ার ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করেছেন। আমাদের দৃষ্টিতে এটি ধূমকেতুর আবির্ভাব ও পতনের সাথে তুলনীয়।
নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করলে দেখা যাবে, শেখ মুজিব ব্যতিক্রমী কোনো ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। যারা তাকে কাছে থেকে দেখে যথার্থ মূল্যায়ন করেছেন; তাদের একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এনায়েত উল্লাহ খান। তার একটি প্রবন্ধে যা তিনি মুজিব হত্যার অব্যবহিত পরে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ‘শেখ মুজিবের উত্থান-পতন’ শিরোনামে প্রকাশ করেন। ওই প্রবন্ধে তিনি লিখেন, ‘১৫ আগস্ট হঠাৎ দ্রিম দ্রিম শব্দে বিদীর্ণ হলো নিস্তব্ধ প্রভাত, এক ঝলক আগ্নেয় সিসা লাখো কোটি মানুষের সীমাহীন রোষের আকস্মিক বিস্ফোরণের মতো নিপাত করল পুতুলের রাজত্ব। এই পুতুল নাচের ইতিকথা রাজনীতি বা ইতিহাস বিযুক্ত নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে গোত্রীয় ক্ষমতার অভিলাষ এবং সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনার ইতিবৃত্ত।
সাড়ে সাত কোটি মানুষ যখন একাত্তরের চরমতম জাতিগত নিপীড়ন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল তখন পর্দার আড়ালে চলছিল আপসের জুয়াখেলা। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের ও একাত্তরের গণ-প্রতিরোধকে নিবৃত করার জন্য শুরু হয়েছিল প্রতিক্রিয়াশীল ষড়যন্ত্র ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত।
পক্ষান্তরে সেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ক্ষমতার রাজনীতির যূপকাষ্ঠে লাখো আবালবৃদ্ধবনিতাকে বলি দিয়ে পলাতক রাজনীতির প্রচ্ছায়ায় গণবিপ্লব ও গণ-প্রতিরোধকে ঠেকাতে চেয়েছে।
আপসকামী নেতৃত্ব জনগণের বিরোচিত রক্তদানকে অস্বীকার করে গোল টেবিলে দেশ বিভাজনের স্বপ্ন দেখছিল।
আমার বেদনা বোধ হয় এই জন্য যে, শেখ মুজিবের প্রতি পুরো দেশবাসীর সমর্থন সত্তে¡¡ও তার সঙ্কীর্ণ শ্রেণী চেতনা বিদেশী প্রভুর দায়বদ্ধ রাজনীতির শৃঙ্খল মোচন করতে পারেনি; বরং পুতুলের মতো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তার দ্বৈত ভূমিকা পালন করে গেছেন।
বারবার ষড়যন্ত্রের ঋণ শোধ করতে গিয়ে বাংলার মুক্তিকামী মানুষের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। সেখানেই তার ট্র্যাজেডি। মুজিববাদ ও মুজিববাহিনীর কাহিনী আজো ইতিহাসে অনুল্লিখিত। জনৈক ভারতীয় সেনাপতির প্রত্যক্ষ পরিচালনায় সংঘটিত তথাকথিত মুজিববাহিনীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, সাংগঠনিক কাঠামো ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত এ কথাই নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে, জাতির মুক্তি আন্দোলনের সাথে এই বাহিনীর মৌলিক বিরোধ ছিল।
তিনি ছিলেন ভাগ্যের বরপুত্র। কিন্তু এচিলিসের গোড়ালির তার অজেয় ভাগ্য ১৫ আগস্ট মুহূর্তের যন্ত্রণায় নিঃশেষিত হয়ে যায়।
বিগত সাড়ে তিন বছর (১৯৭২ থেকে ১৯৭৫) এই পরাক্সমুখতার মূল স্তম্ভ ছিল সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের সমর্থনপুষ্ট ভারতীয় স¤প্রসারণবাদ, তার অসহায়ত্ব আমি স্বচক্ষে দেখেছি, দেখেছি দায়বদ্ধ মানুষের নিষ্ফল ইচ্ছের বিলাপ।
তার রাজনীতির প্রক্রিয়া, দ্বিচারণে অতুল্য, নিপুণ ক্রীড়াশৈলী তাকে গরিমা দিয়েছিল কিন্তু প্রাণ দেয়নি। পোশাক বৈভবে বিভূষিত করেছিল কিন্তু স্বাধীনতা দেয়নি। এক নেতা একদল এই পেন্টমাইম প্রদর্শনীর সর্বশেষ পর্ব। বাঙালি বুর্জুয়ার হীনতম অংশ প্রশাসন যন্ত্রের প্রধান ছিল, আর ছিল বাঙালি ব্যুরোক্রেসির সবচেয়ে দুর্নীতিপরায়ণ ও তাঁবেদার অংশ এবং অর্থনীতিতে ক্ষমতাবান ছিল পরদেশী লুটেরা, পুঁজির দেশীয় সেবাদাস।
লেখক : আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের সাবেক ভিসি ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের শরিয়াহ সুপারভাইজরি কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান



