রোবটিক যুদ্ধকৌশলে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জার্মানি এখন আর কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর তারা নিজেদের সামরিক শক্তি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশাল বিনিয়োগ করছে। জার্মানি তার কয়েক দশকের শান্তিবাদী নীতি পরিবর্তন করে নিজেদের ইউরোপের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তিতে রূপান্তর করার চেষ্টা করছে। অন্য দিকে, কানাডা এবং জাপানের মতো দেশগুলোও তাদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়ে দিচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই চীন দেশীয় ও পড়শিদের নিরাপত্তার জন্য এবং এসব জোটের হুমকি মোকাবেলায় নিজেকে প্রস্তুত রাখছে

রোবটিক যুদ্ধকৌশলে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এআই যুদ্ধের সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে। আধুনিক রণক্ষেত্রে, বিশেষ করে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, এআই এখন সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এআই-চালিত ড্রোন এবং রোবটগুলো নিজেই লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে, যা আগে কেবল মানুষের পক্ষেই সম্ভব ছিল। যেমন- ইউক্রেনে ব্যবহৃত কিছু ড্রোন এখন নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু ‘লক’ করার পর শেষ কয়েক শ’ মিটার পর্যন্ত কোনো মানুষের নির্দেশনা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে উড়ে গিয়ে আঘাত হানতে পারে। এটি এমন এক প্রযুক্তি যা ইলেকট্রনিক জ্যামিং বা সিগন্যাল বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো পরিস্থিতিতেও ড্রোনকে কার্যকর রাখে, কারণ জ্যামিং সিস্টেমগুলো ড্রোন ও অপারেটরের মধ্যকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করলেও ড্রোনের ভেতরের ‘অনবোর্ড এআই’ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে এআইয়ের সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে তথ্যের দ্রুত বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতিতে। এআই সিস্টেমগুলো স্যাটেলাইট ইমেজ, ড্রোন ফুটেজ এবং অন্যান্য সেন্সর থেকে আসা হাজার হাজার তথ্য মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিশ্লেষণ করে শত্রুর অবস্থান ও গতিবিধি খুঁজে বের করতে পারে। এই সক্ষমতার কারণে একটি ছোট সেনাদলও এখন বিশাল এক বাহিনীর সমপরিমাণ কার্যকর হতে পারে। ড্রোন হামলার নির্ভুলতা যেখানে আগে ছিল ৩০-৫০ শতাংশ, এআই ব্যবহারের ফলে তা এখন প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে।

এআইয়ের ব্যাপক ব্যবহার বিশ্বজুড়ে নতুন এক নৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ‘কিলার রোবট’ বা সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত মারণাস্ত্র এখন যুদ্ধের বাস্তবতা। যখন একটি যন্ত্র নিজের থেকে সিদ্ধান্ত নেয় কাকে হত্যা করা হবে, তখন সেখানে কোনো ভুল হলে তার দায়ভার কে নেবে, প্রোগ্রামার, সেনাপতি নাকি খোদ রোবটটি! অনেক বিশেষজ্ঞ সতর্ক করছেন, এআইয়ের মাধ্যমে যুদ্ধের গতি এত বেশি বেড়ে যেতে পারে যে মানুষ হয়তো একসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ হারাবে।

আলবার্ট আইনেস্টাইন বলেছেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে কি অস্ত্র দিয়ে লড়াই হবে তা আমি জানি না। তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ লড়তে হবে লাঠি আর পাথর দিয়ে।

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি হলো রোবটিক যুদ্ধ। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক সামরিক পরিস্থিতি ও বিশেষজ্ঞ মতামতের আলোকে রোবটিক যুদ্ধের দু’টি দিক রয়েছে এবং উভয় দিকে রয়েছে অত্যন্ত জোরালো মতামত। একপক্ষের মতে, রোবট ব্যবহারের ফলে যুদ্ধক্ষেত্র নিরাপদ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ এতে মানুষের জীবন বাঁচবে। রোবট ক্লান্তি, রাগ বা প্রতিশোধের মতো মানবিক আবেগ দিয়ে চালিত হয় না, তাই যুদ্ধের উত্তেজনায় সাধারণ মানুষের ওপর প্রতিহিংসামূলক হামলা বা যুদ্ধাপরাধ ঘটার ঝুঁকি কম। এ ছাড়া তাত্ত্বিকভাবে ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’ বা অনিচ্ছাকৃত বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে সাহায্য করে।

অন্য দিকে, অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা মনে করে, এই প্রযুক্তি বিশ্বের জন্য চরম ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে। যুদ্ধে নিজের দেশের সেনাদের মরার ভয় থাকে না, তখন রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের কাছে যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত অনেক সহজ হয়ে যায়, যা বিশ্বে যুদ্ধের সংখ্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, এআইয়ের ‘ব্ল্যাক বক্স’ সমস্যার কারণে কোনো রোবট যদি ভুলবশত সাধারণ মানুষকে হত্যা করে, তবে তার দায়ভার কে নেবে। এ নিয়ে একটি বড় আইনি ও নৈতিক শূন্যতা বা ‘অ্যাকাউন্টিবিলিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়। এরপর আসে, সিস্টেম হ্যাকিং বা সাইবার হামলার শিকার। যার ফলে এক শক্তিশালী রোবট বাহিনী উল্টো নিজের দেশের ওপরই আক্রমণ চালিয়ে বসতে পারে।

সবচেয়ে ভয়ের কারণ হলো একটি সম্ভাব্য অস্ত্র প্রতিযোগিতা। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশ একে অপরকে টেক্কা দিতে গিয়ে এমন সব ‘কিলার রোবট’ তৈরি করছে যেগুলো মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই প্রাণঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। জাতিসঙ্ঘ এবং ‘স্টপ কিলার রোবটস’-এর মতো সংস্থাগুলো তাই ২০২৬ সালের মধ্যে এ ধরনের সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র নিষিদ্ধ করার জন্য বিশ্বজুড়ে প্রচারণা চালাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত, রোবটিক যুদ্ধ বিশ্বকে নিরাপদ করবে কি-না, তা নির্ভর করবে মানুষ এই প্রযুক্তিকে কতটা নিয়ন্ত্রিত এবং কঠোর আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ব্যবহার করতে পারবে তার ওপর।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে অনেকের সংশয় অত্যন্ত যৌক্তিক, কারণ ইতিহাস ও বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায় যে শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আইন বা বিধিনিষেধের তোয়াক্কা করে না। এর পেছনে মূলত তিনটি বড় কারণ রয়েছে যা শক্তিশালী দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক সংস্থার নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখে। যেমন- ভেটো ক্ষমতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতা একটি বড় বাধা।

শক্তিশালী দেশগুলোর অনেকে বিশ্বাস করেন, আন্তর্জাতিক আইন নয়; বরং ‘শক্তির ভারসাম্যই’ শান্তি বজায় রাখে। তাদের মতে, যদি তারা রোবটিক মারণাস্ত্র তৈরি না করে, তবে তাদের প্রতিপক্ষ দেশগুলো তা তৈরি করে ফেলবে এবং তারা পিছিয়ে পড়বে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস বা ভীতির কারণে কোনো দেশই আগে নিরস্ত্রীকরণে রাজি হয় না। তবে একটি আশার জায়গা হলো- বিশ্ব জনমত এবং অর্থনৈতিক চাপ। বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে চলতে পারে না। শক্তিশালী দেশগুলো সরাসরি সামরিক বাধা না মানলেও, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা বিশ্বজুড়ে তাদের ভাবমর্যাদা নষ্ট হওয়ার ভয়ে অনেক সময় কিছুটা সংযত হতে বাধ্য হয়। এটি পরোক্ষ চাপ হিসেবে কাজ করে।

কূটনীতিক ও সমর বিশারদরা বলছেন, বিশ্ব বিভিন্ন জোটে বিভক্ত হয়ে আরো রক্তক্ষয়ী হতে পারে এটি বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ২০২৬ সালের বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পৃথিবী এখন আর একক কোনো শক্তির অধীনে নেই; বরং এটি একটি ‘বহু-মেরু’ (multi-polar) বিশ্বে পরিণত হয়েছে যেখানে প্রতিটি দেশ বা জোট নিজের স্বার্থ রক্ষায় নিজস্ব ‘চাল’ চালু করতে বাধ্য হচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জার্মানি এখন আর কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর তারা নিজেদের সামরিক শক্তি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশাল বিনিয়োগ করছে। জার্মানি তার কয়েক দশকের শান্তিবাদী নীতি পরিবর্তন করে নিজেদের ইউরোপের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তিতে রূপান্তর করার চেষ্টা করছে। অন্য দিকে, কানাডা এবং জাপানের মতো দেশগুলোও তাদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়ে দিচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই চীন দেশীয় ও পড়শিদের নিরাপত্তার জন্য এবং এসব জোটের হুমকি মোকাবেলায় নিজেকে প্রস্তুত রাখছে।

দেখা যাচ্ছে, দেশগুলোর মধ্যে এখন আদর্শিক লড়াইয়ের চাইতে, সম্পদ ও প্রযুক্তির লড়াই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সেমিকন্ডাক্টর চিপ, লিথিয়াম এবং উন্নত ড্রোন প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, সে-ই ভবিষ্যৎ বিশ্বকে শাসন করবে। এই প্রতিযোগিতার কারণে ছোট এবং মাঝারি দেশগুলো বড় শক্তিগুলোর টানাপড়েনে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বড় শক্তিগুলোর স্বার্থের সঙ্ঘাত মেটাতে ব্যর্থ হলে প্রতিটি দেশ নিজের স্বার্থ ও সঙ্ঘাতের ঝুঁকি থেকে নিজেদের বাঁচাতে চাইবে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিরক্ষায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। ইরান এবং ইসরাইলের মধ্যে সাম্প্রতিক যে ড্রোন ও মিসাইল হামলা হয়েছে, সেখানে দেখা গেছে, একটি দেশ যদি নিজের প্রতিরক্ষায় স্বয়ংসম্পূর্ণ না হয়, তবে তাৎক্ষণিক আক্রমণ মোকাবেলা করা কত কঠিন হয়ে পড়ে। আকাশপথের নিরাপত্তায় নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যারা যত শক্তিশালী, সেই দেশ তত বেশি নিরাপদ। বর্তমানের রোবটিক ও ড্রোন যুদ্ধের যুগে বড় যুদ্ধবিমানের চেয়ে স্থানীয়ভাবে তৈরি সাশ্রয়ী ড্রোন এবং এন্টি-ড্রোন সিস্টেম অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। তুরস্ক বা ইরান দেশীয় প্রযুক্তির ড্রোন তৈরি করে বিশ্বকে দেখিয়েছে, বিশাল বাজেট ছাড়াই সামরিকভাবে প্রভাবশালী হওয়া সম্ভব।

ছোট ও মাঝারি দেশগুলোর স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রয়োজন উচ্চতর কারিগরি শিক্ষা, উন্নত চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এবং গবেষণায় বিশাল বিনিয়োগ। বিভিন্ন দেশ থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তরের (Technology Transfer) মাধ্যমে নিজেদের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলা হতে পারে একটি বাস্তবসম্মত পথ।

শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি এখন আর বিলাসিতা নয়; বরং প্রয়োজন। টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ক্রমবর্ধমান শিল্পায়নের জন্য নিজস্ব দক্ষ জনবল তৈরি এবং পারমাণবিক গবেষণায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া জরুরি। এটি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়; বরং চিকিৎসা, যেমন- ক্যান্সার নিরাময় এবং ফসলের জাত উন্নয়নে উন্নত কৃষি গবেষণা বিপ্লব আনতে পারে, যা অর্থনৈতিকভাবে যেকোনো দেশকে শক্তিশালী করতে পারে।

সামরিক গবেষণার ক্ষেত্রে পারমাণবিক সক্ষমতার প্রশ্নটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। আন্তর্জাতিক আইন এবং এনপিটি (NPT) চুক্তির কারণে সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে অনেক বাধা রয়েছে। তবে, পারমাণবিক প্রযুক্তি নিয়ে গভীর গবেষণা থাকলে একটি দেশের ‘প্রযুক্তিগত সক্ষমতা’ (Technical Capability) বাড়ে, যা আন্তর্জাতিক মহলে দেশটির গুরুত্ব যেমন বাড়িয়ে দেয়, তেমনি বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করে। একে সামরিক ভাষায় ‘ডিটারেন্স’ (Deterrence) বা প্রতিবন্ধকতা বলে।

বর্তমানের যুদ্ধ কেবল পারমাণবিক বোমা দিয়ে নয়; বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং রোবটিক্স দিয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। একটি দেশ যদি ক্ষুদ্র চিপ বা ড্রোন সফটওয়্যার তৈরিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে, তবে আধুনিক যুদ্ধের ময়দানে তারা অনেক বেশি অপরাজেয় হয়ে উঠতে পারে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার