রাজনীতি সংসদের ভেতরে বাইরে

ওয়াকআউটের আগ মুহূর্তে স্পিকারের অনুমতিতে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য... বিরোধী দলের যৌক্তিক বাধা সত্ত্বেও যে কয়েকটি গণবিরোধী বিল আজকে পাস হয়েছে, তারা এর দায় নিতে চান না’।

রিন্টু আনোয়ার
রিন্টু আনোয়ার |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

রাস্তায় নামার হুমকি দিতে দিতে সরকারের বিরুদ্ধে নেমে পড়েছে বিরোধী দল। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে ১১ দলের ঘোষিত পাঁচ দিনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। ঢাকার কর্মসূচিতে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেছেন, বিএনপি জনগণের রায় নিয়ে দ্বিচারিতা করে চলছে। গণভোট নিয়ে সংসদে যে সঙ্কট তৈরি করা হয়েছে তা নিরসনে রাজপথে শক্ত আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

রাজধানীর শাহবাগে বৃহস্পতিবার লিফলেট বিতরণের মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। সেখানে গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে তাদের রাজপথে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছেন। গণভোটের ব্যালটে কোনো নোট অব ডিসেন্ট ছিল না, তারা ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে নোট অব ডিসেন্ট খারিজ করে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলেছেন। এতে ভোট দিয়েছেন। এর মাধ্যমে সব সংস্কারের পক্ষে আপনি ‘হ্যাঁ’ বলেছেন। তার প্রশ্ন- এখন কি সেই ভোটের ফল অস্বীকার করবেন?

তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে আরো বলেন, আপনার সৃষ্টি করা এ সঙ্কট আপনাকে সমাধান করতে হবে। বৃহস্পতিবার বগুড়া ও শেরপুরে উপনির্বাচনে কেন্দ্র দখল, এজেন্টদের বের করে দেয়া, আগেই এজেন্টদের স্বাক্ষর নেয়া, মারধর, রক্তাক্ত পরিবেশ সৃষ্টির তীব্র নিন্দাও জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, এসব ঘটনায় বিএনপি সরকার প্রমাণ করেছে, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না। এতে আরেকটি মাগুরা নির্বাচনের প্রমাণ হলো।

বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমানের বক্তব্য আরো কঠোর। তার ভাষায়- বিএনপি প্রমাণ করল, হাসিনা খারাপ; কিন্তু হাসিনার নীতি ভালো। বৃহস্পতিবার রাতে সংসদ অধিবেশন শেষে বিরোধী দলের জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি। এর আগে সন্ধ্যায় জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন সংসদের বিরোধী দল। সন্ধ্যা ৬টায় ‘গণবিরোধী’ বিল পাসের অভিযোগ এনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন তারা। ওয়াকআউটের আগ মুহূর্তে স্পিকারের অনুমতিতে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য... বিরোধী দলের যৌক্তিক বাধা সত্ত্বেও যে কয়েকটি গণবিরোধী বিল আজকে পাস হয়েছে, তারা এর দায় নিতে চান না’।

সংসদে উত্থাপিত নতুন বিলের তীব্র সমালোচনা করেছেন এনসিপির সংসদ সদস্য হান্নান মাসুদ। তার অভিযোগ- এ বিলের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রশাসনের ‘পিঠে ছুরিকাঘাত’ করা হচ্ছে। একই সাথে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিএনপি ‘আরেকটি আওয়ামী লীগ’ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে কি না?

বিলের ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ এবং ‘জনস্বার্থে অপসারণ’সংক্রান্ত বিধানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বিশেষ পরিস্থিতি বলতে কী বোঝানো হচ্ছে? শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ভোট চোরদের সরাতে যে অধ্যাদেশ হয়েছিল, সেটিকে এখন আইনে রূপান্তর করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গলার কাঁটা বানানো হচ্ছে। বিশেষ পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে যেকোনো মেয়র বা কাউন্সিলরকে সরিয়ে দিয়ে দলীয় লাঠিয়াল বা মন্ত্রী-এমপির সন্তানদের প্রশাসক হিসেবে বসানোর পাঁয়তারা চলছে।’ সনদ নিয়ে মসনদের সাথে দূরত্ব স্পষ্ট। ‘গণভোট’ ও ‘জুলাই সনদ’ তো রাজনীতির কেন্দ্রীয় ইস্যুতে চলে এসেছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ ও মেরুকরণ সংসদ থেকে রাজপথে চলে এসেছে।

এর প্রথম কারণটি আইনি ও পদ্ধতিগত। বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদের মতে, রাষ্ট্রপতির আদেশে যেভাবে ‘গণভোট’ আয়োজন করা হয়েছে, তা অনেকটা ‘কলার ভেতরে তিতো ওষুধ’ খাওয়ানোর মতো। জবাবে সংসদে এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রথাগত রাজনীতিকদের ‘সুযোগ-সন্ধানী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার যুক্তি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ- যদি বাহাত্তরের সংবিধানকে ‘বাইবেল’ মানতে হয়, তবে ৫ আগস্টের পর বেগম খালেদা জিয়া কোন সংবিধানে মুক্তি পেলেন? তিনি মনে করিয়ে দেন, সেই মুক্তি সম্ভব হয়েছিল ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’র প্রয়োজনে। তার প্রশ্ন- এখন যখন সংবিধান সংস্কারের কথা আসছে কেন? কেন পুরনো সংবিধানের দোহাই দেয়া হচ্ছে? একে তিনি ছাত্র-জনতার রক্তের সাথে প্রতারণা হিসেবে দেখছেন। এ বিতর্কে ফায়ার করতে গিয়ে ব্যাক ফায়ার করে বসেছেন আন্দালিব রহমান পার্থ।

তিনি জামায়াত ও এনসিপির যুক্তির বিপরীতে বলেন, বিএনপি ও অন্যান্য দল গত ১৫ বছর ধরে রাজপথে রক্ত দিয়ে আন্দোলনের ‘৩০০ রান’ করে রেখেছে, আর ছাত্ররা এসে শেষ ‘১২ রান’ করে জয় নিশ্চিত করেছে। পার্থের মূল আপত্তি সংবিধান বাতিলে। তিনি মনে করিয়ে দেন, এটি কোনো ‘বিপ্লবী সরকার’ নয়; বরং সংবিধানের অধীনে শপথ নেয়া ‘অন্তর্বর্তী সরকার’। তাই পূর্ণ সংবিধান বাতিল করার আইনগত সুযোগ নেই। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা এখন ‘পারস্পরিক অবিশ্বাস’। বিএনপি যেখানে আইনি ধারাবাহিকতা রক্ষা করে এগোতে চায়, জামায়াত ও এনসিপি সেখানে আমূল পরিবর্তনের পক্ষে। বিতর্কে জিততে সেরের ওপর সোয়া সের দিতে গিয়ে তারা সরকারকে অবৈধ বলার সূচনা করে দিয়েছেন। আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই বলে, আন্দোলনে নেমে পড়েছে।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের লক্ষ্যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা চারটি অধ্যাদেশ বাতিল ও ১৬টি সংশোধনে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির সুপারিশে ক্ষুব্ধ আরো কেউ কেউ। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন থেকে বলা হয়েছে- গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো বাতিলের উদ্যোগ ক্ষমতাসীন বিএনপির অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট বরখেলাপ। তাদের যুক্তি, যে চারটি অধ্যাদেশ বাতিল ও ১৬টি অনুমোদনের বিষয়টি সংসদের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে, সেগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ-সংক্রান্ত একটি, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়-সংক্রান্ত দু’টি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত তিনটি, গুম প্রতিরোধ-সংক্রান্ত দু’টি ও দুর্নীতি দমন কমিশন-সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ। এর মাধ্যমে চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘাড় মটকে দেয়া হচ্ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে ঐকমত্য হয়নি সংসদে। যে যার অবস্থানে অনড়।

বিএনপি বলেছে, নোট অব ডিসেন্টসহ (ভিন্নমত) যেভাবে জুলাই জাতীয় সনদ সই হয়েছে, সেটি তারা অক্ষরে অক্ষরে মানবে। তারা সে অনুযায়ী, সংসদে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধনের কথা বলেছে। অন্য দিকে বিরোধী দল বিদ্যমান সংবিধানের সংস্কার চায়। সংবিধানের ওই জায়গাগুলো পরিবর্তন চায়, যেগুলো গত ৫৪ বছরে বারবার ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে। যুক্তিতে উভয়ই কড়া। এখন বাস্তবতা কেবল বিতর্ক নয়, আরো বেশি কিছুতে গড়াচ্ছে। কথায় কথায় খুঁত ধরা, খোঁচা দেয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তা করতে গিয়ে কেউ কারো ইজ্জত রাখছেন না। নানা তিতা কথা নিয়ে আসা হচ্ছে সামনে। নতুন নতুন তত্ত্ব, নিজেকে জাহিরসহ জ্ঞান বিতরণের ধুম পড়েছে। সংবিধান সংস্কার করা যায় না, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিনের এমন দাবি নিয়ে ট্রলের হিড়িক। এক দিকে সংসদে সরকারকে কড়া ভাষায় আক্রমণ, আরেক দিকে রাজপথে কর্মসূচি। সরকারেরও শক্তপোক্ত অবস্থান। বলার চেষ্টা করছে- তারা সনদবিরোধী নয়, গণভোট-বিরোধীও নয়। আবার জুলাই সনদ ও গণভোট অধ্যাদেশকে আখ্যা দেয়া হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণা হিসেবে। সরকার পক্ষের এ ধরনের অন্যায্য বয়ানের সুযোগ নিচ্ছে বিরোধী দল।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]