সংবিধান সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকার

নির্বাচনের আগে ও পরের বক্তব্য

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে জাতীয় সংসদে যে বিতর্ক চলছে সে বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদারের বক্তব্য উদ্ধৃত করে আজকের আলোচনা শেষ করব। তিনি বলেছেন, ‘সংবিধানে থাকুক আর না থাকুক, ... জনগণ হলো (রাষ্ট্রের) মালিক; মালিক যখন সম্মতি দেন সেটিই শেষ কথা। মালিক সম্মতি দিয়েছেন ওটিই শেষ কথা এবং তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে

ড. মিয়া মুহাম্মদ আইয়ুব
ড. মিয়া মুহাম্মদ আইয়ুব |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা যে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর করেন, তাতে তারা নিম্নোক্ত অঙ্গীকার ঘোষণা করেন : ‘‘জনগণের অধিকার ফিরে পাওয়া এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে হাজারো মানুষের জীবন ও রক্তদান এবং অগণিত মানুষের সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতি ও ত্যাগতিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত সুযোগ এবং তৎপ্রেক্ষিতে জন-আকাক্সক্ষা প্রতিফলন হিসেবে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রণীত ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত নতুন রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করব।”

এত দৃঢ় অঙ্গীকার সত্ত্বেও আমরা দেখতি পাচ্ছি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ শুরু হওয়ার পর থেকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়ন বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে বলতে গেলে প্রতিদিন বিতর্ক চলছে। ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন (সংবিধান সংস্কার) আদেশ ২০২৫’ বাস্তবায়নের বিষয়টি নতুন সংসদ গঠিত হওয়ার দিন থেকে বিতর্কের মুখে পড়ে। বেশ কিছু বিতর্কের পর সংসদে সিদ্ধান্ত হয়, একটি সংসদীয় কমিটি গঠিত হবে; ওই কমিটি এ বিষয়ে সুপারিশ করবে। এর পরও বিষয়টিতে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান সংসদে বলেছেন, ‘গণভোটের ডিরেকশন অনুযায়ী সংস্কার পরিষদ গঠন করা দরকার। সংবিধান আইন মানুষের জন্য, আমরা স্বীকার করেছি সবাই, সবকিছু আইন মেনে আজকের এই জাতীয় সংসদ গঠিত হয়নি, এই পর্যায়ে আমরা এসে উপনীত হইনি। আমরা আইনের কম্প্রোমাইজ করেই এখানে এসেছি, কম্প্রোমাইজ করেছি দেশ ও জনগণের স্বার্থে। যদিও সময়সীমা চলে গেছে, আমাদের মাইন্ড যদি ওপেন থাকে, তাহলে এখনো রাস্তা বের করা সম্ভব এবং সেই রাস্তা বের করে আমরা এগিয়ে যাই। যতটুকু সংস্কার হওয়া দরকার, ততটুকু সংস্কার হবে; যতটুকু সংশোধন হওয়া দরকার ততটুকু সংশোধন হবে। আমরা সংশোধনের বিরোধী নই, আমি এটা স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছি।’

সাধারণত বিরোধীদলীয় নেতা বক্তব্য দেয়ার পরে সংসদ নেতা তথা প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য রেখে থাকেন। এটিই সংসদীয় রীতি; কিন্তু দেখা গেল সরকারি দলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে বক্তব্য দিচ্ছেন। তিনি বললেন, প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য রাখবেন কি না সেটি তার প্রেরোগেটিভ। পরে অবশ্য প্রধানমন্ত্রীকে বক্তব্য দিতে দেখা যায়নি। এর মানে হচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই সরকারের বক্তব্য পেশ করেছেন। জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে সরকারপ্রধানের অবশ্যই বিবৃতি দেয়া উচিত। তিনি এখন পর্যন্ত কিছুই না বলায়, নানা প্রশ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।

সালাহউদ্দিন আহমেদ বিস্তারিত যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক অংশটুকু হচ্ছে : ‘সংবিধান সংস্কার হয় না। সংবিধান রহিত হয়, স্থগিত হয়, সংশোধন হয়, বাতিল হয়- সংবিধান তো সংস্কার হয় না, সংশোধনকে সংস্কার মনে করে আমরা যদি একসাথে বসতে পারি ভালো। যাই হোক, মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে। সংবিধান পরিবর্তন তো সংশোধনের মাধ্যমে হতে পারে।’ মজার বিষয় হলো, বিরোধীদলীয় নেতা চাচ্ছেন, সংবিধানের পরিবর্তন। অপর দিকে সরকারি দল চাচ্ছে সংশোধন। কিন্তু এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য কতটুকু। সংশোধনীর মাধ্যমেই তো পরিবর্তন হয়।

এবারে দেখা যাক জাতীয় জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলো কী অঙ্গীকার করেছিল : ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এ বাংলাদেশের সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তথা সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশি ব্যবস্থা ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা সংস্কারের বিষয়ে যেসব সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ আছে, সেগুলো বাস্তবায়নে সংবিধান এবং বিদ্যমান আইনগুলোর প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জন বা নতুন আইন প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন বা বিদ্যমান বিধি ও প্রবিধির পরিবর্তন বা সংশোধন করব। লক্ষণীয় যে, উক্ত অঙ্গীকারনামায় সংস্কার ও সংশোধন উভয় শব্দই আছে। বস্তুত সংবিধান সংশোধন ও পরিবর্তনের মাধ্যমে সংস্কার হবে। সুতরাং এ ধরনের বিতর্ক অপ্রয়োজনীয় মনে হয়।

মূলত বিতর্কের শুরু সেদিনই যেদিন নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকার করেন। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি করে। ওই আদেশে উল্লেখ করা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। পরবর্তীতে গণভোট অধ্যাদেশও জারি করা হয়। উক্ত আদেশে আরো বলা হয়, জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় সংসদের পাশাপাশি একই সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। সংসদ সদস্যরা একই দিনে একই ব্যক্তির কাছে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়া থেকে বিরত থাকেন। তাদের মতে, এরূপ কোনো বিধান সংবিধানে নেই, জাতীয় সংসদই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। এখানে একটি সূক্ষ্ম প্রশ্ন বেশ প্রাসঙ্গিক। সেটি হচ্ছে, সংবিধান সংস্কার তো সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে করা যায়, তাহলে গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজন হবে কেন? এর উত্তর হচ্ছে, সংবিধানের মৌলিক কতগুলো অনুচ্ছেদ রয়েছে যা সংসদ সংশোধন করতে পারে না। এ জন্য রাষ্ট্রের মালিক জনগণের মতামত নিতে হয়। এ বিষয়টি সামনে রেখে গণভোটের আয়োজন করা হয় সংবিধান পরিবর্তনের বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে। আর সেগুলো হচ্ছে-

ক. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।

খ. আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। সংবিধান সংশোধনী করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।

গ. সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল হতে ডিপুটি স্পিকার ও কয়েকটি সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে- সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।

এসব প্রশ্নের বিষয়ে গণভোটে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ নাগরিক ‘হ্যাঁ’ সূচক সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন। এখন সংসদের দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জন করা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী যদি শুধু সংশোধনের কাজ করা হয় তাহলে সংসদ তার সবটুকু করতে পারবে না। কিন্তু সরকার পক্ষ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে গণভোটের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছে। এর ফলে তাদের পক্ষে এখন চাইলেও জুলাই সনদের আলোকে সংবিধানের ‘প্রয়োজনীয় সংশোধন’ সবটা করতে পারবে না। তার মানে সরকারি দল সংবিধানের প্রতিশ্রুত সংশোধনের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। এটা তাদের নির্বাচন-পূর্ব বক্তব্যের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। যেমন তখন সালাহউদ্দিন সাহেব বলেছিলেন, ‘নির্বাচনের দিনে একই দিনে আরেকটা ব্যালটের মাধ্যমে গণভোটের সেই রায়টা নেয়া যাবে- যে সংস্কারের মধ্যে ঐকমত্য কমিশনের কাছে আমরা যারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছি সব রাজনৈতিক দল- সেই প্রতিশ্রুতির পক্ষে জনগণ আছে কি না- সেই সনদের পক্ষে জনগণ আছে কি না ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলুন। যদি ‘হ্যাঁ’ বলে তাহলে সেই পার্লামেন্ট সেই নির্বাচিত সংসদের প্রত্যেকটি সদস্য আইনানুগভাবে ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হবে এই সনদ বাস্তবায়নের জন্য- তারা বাধ্য থাকবে সনদ বাস্তবায়নের জন্য। তিনি আরো বলেছিলেন, ইতোমধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে যার মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছে; এটি একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে। আমরা আশা করছি, বাংলাদেশের এই জাতীয় সংসদ স্বাধীনতার পরে সবচেয়ে বেশি আইন প্রণয়নকারী হবে। সালাহউদ্দিন আহমেদের সেদিনের বক্তব্য আর আজকের বক্তব্যের মধ্যে অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। তিনি অবশ্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ ব্যতীত কীভাবে ‘অক্ষরে অক্ষরে’ পালন করবেন তা ব্যাখ্যা করেননি। কারণ সংসদ তো গণভোট ছাড়া সংবিধানের সব কিছুর সংশোধনী আনতে পারবে না। সালাহউদ্দিন আহমেদের অসঙ্গতিপূর্ণ কথা শুনে এনসিপি নেত্রী মনিরা শারমীন বলেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ আজকে এসে তিন মাস আগে নিজের বলা কথা সব অস্বীকার করছেন। তিনি সম্ভবত ডিমেনশিয়া রোগে আক্রান্ত। রোগ-শোক নিয়ে জীবন। প্রয়োজনে চিকিৎসা করান; কিন্তু জনগণের রায় নিয়ে তামাশা করার অধিকার আপনাদের নেই। সালাহউদ্দিন আহমেদ যা বলার চেষ্টা করেছেন তা হলো, বিদ্যমান সংবিধান মানতে হবে এবং সেখানে গণভোট বা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কোনো কথা নেই। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন (সংবিধান সংষ্কার) আদেশ ২০২৫ জারি করে অন্তহীন প্রতারণার পরিচয় দিয়েছে। তিনি বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদে সমঝোতা হয়নি। এটি একটি জবরদস্তিুমূলক আরোপিত আইন।

কিন্তু বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিদ্যমান সংবিধান সম্পর্কে বিস্ময়ের সাথে বলেছেন, ‘কোন সংবিধান? এটা তো আওয়ামী লীগের তৈরি করা সংবিধান। তারা নিজের স্বার্থে-দলের জন্য এই সংবিধান কেটে এক-তৃতীয়াংশ করেছিল এক ব্যক্তির জন্য। যেখানে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। নো কোশ্চেন এবং এটা কোনো দিন নাকি পরিবর্তন করা যাবে না। সংবিধান তো মানুষের জন্য। সংবিধান তো কোনো ব্যক্তির জন্য নয়। সেই মানুষের সংবিধান তারা নষ্ট করে ফেলেছে।’ মির্জা ফখরুলের সেদিনের কথার সাথে তার সরকারের বর্তমান অবস্থানের কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না। আরো লক্ষণীয় বিষয় হলো- তাকে এ প্রসঙ্গে সংসদে কোনো কথা বলতে দেখা যাচ্ছে না। এক দিকে দলটির চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রী সংবিধান প্রসঙ্গে সংসদে কোনো কথা বলছেন না; অন্য দিকে দলটির মহাসচিবও কোনো কথা বলছেন না, যা রহস্যজনক মনে হয়। বিএনপি চেয়ারম্যান একবার ১৯৭২ সালের সংবিধান সম্পর্কে বলেছিলেন, যে সংবিধান ছিল সেটিতে কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষা প্রতিফলিত হয়নি। তার মানে তিনিও উপলব্ধি করেন, বিদ্যমান সংবিধানের পরিবর্তন দরকার এবং সেটি জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে করার ব্যাপারে তিনি জনগণের ম্যান্ডেট চেয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিতে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দিয়েছিলেন। আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রত্যাখান করে বলেছিলেন, ‘... এই সংবিধান হলো আওয়ামী লীগের ইশতেহার। ... যেদিন জনগণের সরকার আসবে, সেদিন এই সংবিধান ছুড়ে ফেলে দেয়া হবে। এই সংবিধান কোনো সংবিধান নয়।’ মজার বিষয় হলো- সালাহউদ্দিন আহমেদ এখন সংসদে দাঁড়িয়ে বেগম জিয়ার সেই ঐতিহাসিক বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করে বলছেন, তিনি নাকি পঞ্চম সংশোধনী বাতিল প্রসঙ্গে ওই কথা বলেছেন।

আমরা লক্ষ করছি, শুধু বিএনপি নয়, দলটির জোটসঙ্গী কয়েকজন নেতার মুখেও সংবিধান নিয়ে পরস্পরবিরোধী কথা শোনা যাচ্ছে। যেমন আন্দালিব রহমান পার্থ নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, এই সংবিধানকে ব্যবহার করে বারবার মানুষকে অত্যাচার করা হয়েছে। সুতরাং এই সংবিধান, যে সংবিধান মানুষের কথা বলে না, মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন দেয় না, মানুষের ভবিষ্যৎ দেয় না, মানুষকে প্রোটেকশন দেয় না, সেই সংবিধানকে মানুষ ছুড়ে ফেলে দেবে। সেদিন তিনি বেগম জিয়ার সুরের প্রতিধ্বনি করেছিলেন; কিন্তু এখন তিনি সংসদে বললেন, এই যে একটি প্রক্রিয়া সংবিধান ছুড়ে ফেলে দাও। আমি সংবিধান কেন ছুড়ে ফেলে দেবো? এই সংবিধান কি মনে করিয়ে দেয়, এটি ১৯৭১ সালে পরাজয়ের দলিল? আমি কেন সংবিধান ছুড়ে ফেলে দেবো? সংবিধান নিয়ে কেন এত গাত্রদাহ হবে? এত গায়ে লাগবে কেন? ইফ আই ডোন্ট লাইক ইট, দেয়ার ইজ ... প্রভিশন- যে আমি তো সংবিধান পরিবর্তন করতে পারি।’

অন্য দিকে বিএনপির জোটসঙ্গী নাগরিক অধিকার পরিষদের সংসদ সদস্য নুরুল হক আওয়ামী লীগকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, আপনারা বারবার বলছেন, সংবিধানের বাইরে যাওয়া যাবে না- এই সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করে আপনারা আজকে গণবিরোধী সংবিধানে পরিণত করেছেন। এই গণবিরোধী সংবিধান দিয়ে বাংলাদেশ আর চলবে না। আজকে জাতির প্রয়োজনে নতুন সংবিধান রচনা করতে হবে। সেই নূরুল হক এখন সরকারি দলের হয়ে সুর পাল্টে ফেলেছেন। আগের বক্তব্য বেমালুম ভুলে গেছেন। এ ছাড়া গণসংহতি আন্দোলনের নেতা জোনায়েদ সাকী একসময়ে বলেছিলেন, ‘১৯৭২ সালের সংবিধান ছিল ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের কাঠামো। ওই সংবিধান ব্যবহার করে জনগণকে বারবার অত্যাচার করা হয়েছে।’ এখন সেই জোনায়েদ সাকীও বিএনপির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধন কিভাবে হবে। তার সাথে জুলাই সনদের সম্পর্ক কতটুকু থাকবে তা নিয়ে এখন রীতিমতো ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেছেন, ‘‘সংবিধান সংশোধনের মধ্য দিয়ে আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করব। এখানে কোনো ‘ইফস অ্যান্ড বাটস’ নেই। সুতরাং যারা বলছেন গণভোট বাতিল হলে জুলাই সনদ বাতিল হবে, তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন।’’ কিন্তু আইনমন্ত্রী কি কৌশলে জুলাই সনদের কিছু বিষয় পাশ কাটানোর চেষ্টা করে জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন না? কারণ জুলাই সনদে উল্লিখিত সব সংস্কার গণভোট ছাড়া জাতীয় সংসদ করতে পারবে না।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, সরকারি দলের খুব কম সদস্য সংসদে সংবিধান সংস্কার নিয়ে কথা বলছেন। মনে হচ্ছে বিএনপির সব নেতাকর্মী বা সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের সাথে একাত্ম নন। যেমন সাবেক মন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর বলেছেন, আমরা কেউ যেন জুলাইয়ের বিপ্লবীদের সাথে বেঈমানি না করি। তারা জালিমের সাথে লড়াই করে আমাদের মুক্ত করেছেন। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলছেন, ২০২৪ সালে বিপ্লব সংঘটিত হয়নি; হয়েছে ‘গণ-অভ্যুত্থান’। অথচ বাবর বলছেন ‘বিপ্লব’।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে জাতীয় সংসদে যে বিতর্ক চলছে সে বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদারের বক্তব্য উদ্ধৃত করে আজকের আলোচনা শেষ করব। তিনি বলেছেন, ‘সংবিধানে থাকুক আর না থাকুক, ... জনগণ হলো (রাষ্ট্রের) মালিক; মালিক যখন সম্মতি দেন সেটিই শেষ কথা। মালিক সম্মতি দিয়েছেন ওটিই শেষ কথা এবং তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে।

লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব
[email protected]