ইসরাইল-আমেরিকা সম্পর্কের গোপন কাঠামো

নতুন প্রজন্মের মধ্যে নতুন চেতনা গড়ে উঠছে, যা কেবল রাজনৈতিক অবস্থান নয়। বরং এক নৈতিক অবস্থান, যেখানে মানবাধিকার, উপনিবেশবাদ-বিরোধিতা এবং বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নগুলো এক সাথে সক্রিয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিকল্প মিডিয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক আন্দোলন ঘিরে এই চেতনা দ্রুত ছড়িয়েছে। ফলে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। যেখানে ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারক, ভোটার এবং মতামত-নির্মাতারা ভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উঠে আসবে

ইসরাইলের যুদ্ধে আমেরিকা হামলে পড়ছে। কিন্তু কেন? ব্যাপারটা বোঝার জন্য প্রক্সি-রাষ্ট্র তত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণী কাঠামো। এই তত্ত্বের মূল প্রশ্ন খুব সরল, কিন্তু গভীর। প্রশ্নটি হলো, আসলে কে কাকে ব্যবহার করছে?

প্রচলিত ধারণায় যুক্তরাষ্ট্র একটি পরাশক্তি, আর ইসরাইল তার ঘনিষ্ঠ মিত্র। এই সম্পর্কের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে কূটনৈতিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক সমর্থন দেয়Ñ এটাই সাধারণ বর্ণনা। কিন্তু প্রক্সি-রাষ্ট্র তত্ত্ব এই সরল সম্পর্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এখানে বলা হয়, বিষয়টি শুধু মিত্রতা বা সহযোগিতা নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণের স্তরে গভীর নির্ভরতা ও প্রভাবের সম্পর্ক কাজ করে।

এই দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রশ্ন ওঠে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কি পুরোপুরি স্বাধীন? নাকি তার ভেতরে এমন কিছু সংগঠিত লবি কাঠামো কাজ করছে, যা নীতিকে নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত করে? যদি দেখা যায়, ইসরাইল প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত তার সাধারণ জনগণের ইচ্ছার সাথে বারবার সাংঘর্ষিক, তাহলে মিত্রতা শব্দটি আর যথেষ্ট থাকে না। তখন সম্পর্কটি এক ধরনের কাঠামোগত নির্ভরতার রূপ নেয়, যেখানে নীতির দিক নির্ধারণে বাহ্যিক প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই জায়গাতেই প্রক্সি ধারণাটি নতুন অর্থ গ্রহণ করে। সাধারণভাবে আমরা প্রক্সি বলতে বুঝি, একটি দুর্বল শক্তি, যা একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের হয়ে যুদ্ধ বা নীতি বাস্তবায়ন করে। কিন্তু এখানে চিত্রটি উল্টোভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। যুক্তি দেয়া হয়, একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত সংগঠিত রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক-লবিগত কাঠামো একটি বৃহৎ পরাশক্তির নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে। ফলে সেই বৃহৎ রাষ্ট্র (আমেরিকা) নিজের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করলেও, তার লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট কৌশলগত কাঠামোর প্রভাব কাজ করে।

এই প্রভাব যখন কার্যকরভাবে কাজ করতে শুরু করে, তখন যুদ্ধ আর কেবল বাহ্যিক সঙ্ঘাতে সীমিত থাকে না। এখান থেকেই আসে দ্বিমুখী যুদ্ধের ধারণা। একদিকে রয়েছে দৃশ্যমান ফ্রন্ট। ইরানের মতো একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক বা ভূরাজনৈতিক সঙ্ঘাত। এ সঙ্ঘাত সহজে দেখা যায়, বোঝা যায় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রচলিত ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায়।

কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি ফ্রন্ট সক্রিয় থাকে, যা অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও জটিলÑ বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে। এই অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টে যুদ্ধ চলে ভাষ্য, তথ্য, মিডিয়া এবং নৈতিকতার স্তরে। এখানে নির্ধারণ করা হয় কে বৈধ? কে অবিশ্বস্ত হিসেবে বিবেচিত হবে এবং কোন বক্তব্যকে মূলধারায় রাখা হবে?

যারা ইসরাইল প্রযোজিত যুদ্ধের বিরোধিতা করে, তাদের কণ্ঠস্বর প্রান্তিক করে দেয়া হয়, তাদের অবস্থান সন্দেহের চোখে দেখা হয় অথবা তাদের বক্তব্য মূল ইস্যু থেকে সরিয়ে অন্য খাতে নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে যুদ্ধটি শুধু বাইরের কোনো দেশের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি একই সাথে অভ্যন্তরীণ মতপ্রকাশ ও ভিন্নমতের ওপরও প্রভাব ফেলে। এই কারণে এটিকে বলা হয়, সাইমালটেনিয়াস যুদ্ধ। মানে, একসাথে একাধিক স্তরে চলমান যুদ্ধ; বাইরে অস্ত্র, ভেতরে বয়ান।

এই অবস্থার পরিণতিতে প্রকাশ পায় গণতান্ত্রিক বিচ্ছিন্নতা। গণতন্ত্রের মৌলিক ধারণা হলো, জনগণের ইচ্ছা ও রাষ্ট্রের নীতির মধ্যে ন্যূনতম সামঞ্জস্য থাকবে। কিন্তু যখন দেখা যায়, জনগণের একটি বড় অংশ কোনো যুদ্ধ বা নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে অথচ রাষ্ট্রযন্ত্র সেই নীতিতেই অটল, তখন এই সামঞ্জস্য ভেঙে পড়ে।

এখানে একটি প্রতিনিধিত্বের সঙ্কট তৈরি হয়। রাষ্ট্র আসলে কার প্রতিনিধিত্ব করছে? জনগণের, নাকি নীতিনির্ধারণের ভেতরের একটি সীমিত কাঠামোর? এই প্রশ্নের উত্তর আমেরিকায় অস্পষ্ট।

এর সাথে যুক্ত থাকে জ্ঞানতাত্ত্বিক সঙ্কটও। কারণ জনগণ যে বাস্তবতা অনুভব করছে, তা রাষ্ট্রীয় ভাষ্যে অনেক সময় প্রতিফলিত হয় না। যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ, নৈতিক দ্বন্দ্ব বা আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া রাষ্ট্র উপেক্ষা করছে। ফলে দুই ধরনের বাস্তবতা তৈরি হয়। একটি সরকারি, আরেকটি সামাজিক বাস্তবতা। এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই আমেরিকা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে সামনে আসে প্রোপাগান্ডা ও দায় পুনর্বিন্যাসের রাজনীতি। আধুনিক যুদ্ধ এখন শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে পরিচালিত হয় না। যুদ্ধ সমানভাবে আবর্তিত হয় একটি প্রশ্নের চার পাশে। প্রশ্নটি হলো যুদ্ধের দায় কার?

যদি জনমনে একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পক্ষকে দায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে যুদ্ধের প্রকৃত কৌশলগত কেন্দ্র আড়ালে চলে যায়। এই প্রেক্ষাপটে যুদ্ধের মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে দেখা যায় নেতানিয়াহুকে। তার দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা-নীতির দৃষ্টিভঙ্গি এবং আঞ্চলিক কৌশল সঙ্ঘাতের ধারাবাহিকতা তৈরি করেছে। ইরান যুদ্ধ জায়নবাদী সম্প্রসারণবাদের পরিকল্পনা।

কিন্তু গণমাধ্যমের একটি অংশ এই জটিল কাঠামোকে সরাসরি সেই কেন্দ্রে না এনে বরং তুলনামূলকভাবে সহজ ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্বের দিকে মনোযোগ ঘুরিয়ে দেয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়ে ওঠেন আসল দোষী। এর ফলে জনমতের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক স্থানান্তর ঘটে। জনগণের ক্ষোভ একটি প্রতীকী লক্ষ্যবস্তুর দিকে কেন্দ্রীভূত হয়। কিন্তু প্রকৃত কাঠামোগত কারণগুলো আড়ালে থেকে যায়।

এই প্রক্রিয়াটি সরাসরি মিথ্যা বলে না। বরং সে সত্যের অগ্রাধিকার পাল্টে দেয়। কোন তথ্যটি সামনে আসবে, আর কোনটি পেছনে থাকবেÑ তা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই জনমতের দিক নির্ধারিত হয়। ফলে ধীরে ধীরে মানুষ একটি আংশিক ব্যাখ্যাকে পূর্ণ বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে। এভাবেই প্রোপাগান্ডা কেবল তথ্য বিকৃত করে না। সে একই সাথে মানুষের দৃষ্টির দিক, মনোযোগের কেন্দ্র এবং প্রশ্ন করার কাঠামোকেই পুনর্গঠন করে।

এই দৃষ্টির পুনর্নির্দেশ আমাদের নিয়ে যায় ইহুদিবাদের সেটলার-কলোনিয়াল স্ট্র্যাটেজির দিকে। এখানে যুদ্ধকে বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ। গ্রেটার ইসরাইল ধারণাটি এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রতীকী ও কৌশলগত কাঠামো। যেখানে নিরাপত্তা, ভূখণ্ড এবং পরিচয়ের প্রশ্ন একসূত্রে গাঁথা। গাজা, পশ্চিম তীর, গোলান বা লেবাননের মতো অঞ্চলগুলো আলাদা আলাদা সঙ্ঘাতক্ষেত্র নয়; বরং ইসরাইলের একটি পরিকল্পিত মানচিত্রের ভিন্ন ভিন্ন অংশ। যেখানে প্রতিটি সামরিক অভিযান সমন্বিত কৌশলের অংশ। এই কৌশলে ইসরাইলের প্রধান যুক্তি হলো নিরাপত্তা। আমেরিকা-ইউরোপীয় ভাষ্য অসংখ্যবার বলেছে, ইসরাইলের যুদ্ধ জায়েজ। কারণ তার নিরাপত্তার অধিকার আছে। কিন্তু এসব যুদ্ধে নিরাপত্তা কথাটা কেবল আত্মরক্ষামূলক অর্থে ব্যবহৃত হয় না। বরং এটি সীমানা বিস্তারের নৈতিক বৈধতা তৈরি করে। অর্থাৎ, যখন কোনো সামরিক পদক্ষেপকে নিরাপত্তার প্রয়োজন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তখন সেটি একই সাথে একটি ভূখণ্ডগত দখলদারির পথও খুলে দেয়। এখানে যুদ্ধ কেবল সামরিক নয়; আদর্শিকও। এটি নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক কল্পনার (গ্রেটার ইসরাইল) বাস্তব রূপ দেয়ার প্রয়াস। ফলে গাজা, পশ্চিম তীর বা লেবাননসহ যুদ্ধের প্রতিটি ফ্রন্ট একটি বৃহত্তর আখ্যানের অংশ হয়ে ওঠে। যেখানে লক্ষ্য কেবল তাৎক্ষণিক বিজয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি মানচিত্রগত পরিবর্তন।

এই দীর্ঘমেয়াদি কৌশল টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন বিভ্রান্তিকর সঙ্কট উৎপাদন। কোনো একটি সঙ্ঘাত যখন আন্তর্জাতিকভাবে অতিরিক্ত মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং নৈতিক বা রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে, তখন তা প্রশমিত করার কার্যকর উপায় হলো নতুন আরেকটি সঙ্কট তৈরি করা। ইরানের সাথে সঙ্ঘাতকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হলে বোঝা যায়, এটি পৃথক কোনো যুদ্ধ নয়; বরং অ্যাটেনশন শিফটিং মেকানিজম।

যখন গাজায় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন এবং জনমতের কেন্দ্রে চলে আসে, তখন একটি নতুন ও বৃহত্তর সঙ্ঘাত সেই মনোযোগ অন্যদিকে ছড়িয়ে দেয়। মানুষের দৃষ্টি সীমিত। এক সাথে সব কিছুর ওপর সমানভাবে মনোযোগ দেয়া অসম্ভব। এই মনস্তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতাকেই কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা হয়।

এই ধারায় ক্রাইসিস ম্যানুফ্যাকচারিং শুধু একটি প্রতিক্রিয়া নয়, সক্রিয় কৌশল। এটি এমন বাস্তবতা তৈরি করে, যেখানে প্রতিটি নতুন সঙ্ঘাত আগের সঙ্ঘাতের ওপর ছায়া ফেলে। ফলে ঘটনাগুলো ইতিহাসের ধারাবাহিকতা হিসেবে সামনে আসে না; বরং বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি হিসেবে প্রতীয়মান হয়। আর এই বিচ্ছিন্নতার মধ্যেই দায়, ন্যায় এবং জবাবদিহির প্রশ্নগুলো ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে। ইসরাইলের এই খেলা এতদিন ভালোভাবেই কাজ দিয়েছে। এখন তা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি অলিখিত ঐকমত্য ছিল। বিশেষ করে ইসরাইলকে সমর্থন করা অবধারিত মনে করা হতো। সম্প্রতি এই ঐকমত্য ভেঙে গেছে। এই বিরোধ কোনো একক মতের শিবিরে সীমাবদ্ধ নেই। বরং বাম, ডান, মধ্যপন্থী সব ধারাতেই বিস্তৃত হয়েছে।

একদিকে আছেন আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও কর্তেজ। প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের ভাষায় এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেন। অন্য দিকে আছেন টাকার কার্লসনের মতো রক্ষণশীল ভাষ্যকার, যিনি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও বিদেশী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়া নিয়ে তিরস্কার করেন। একইভাবে প্রভাবশালী বিশ্লেষক ক্যান্ডেস ওয়েন্সের মতো ব্যক্তিত্বও এই প্রশ্নে সমালোচনামূলক অবস্থান নিয়েছেন। এখানে মতাদর্শের ভিন্নতা সত্ত্বেও একটি অভিন্ন অবস্থান তৈরি হয়েছে, তা হলো যুদ্ধের বিরোধিতা এবং রাষ্ট্রীয় নীতিকে প্রশ্ন করা।

এ ধরনের প্রতিরোধ কেবল রাজনৈতিক অবস্থান নয়; এটি এক সাংস্কৃতিক সঙ্কেত। যখন ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শিক ধারার মানুষ নির্দিষ্ট ইস্যুতে একমত হয়, তখন সেটি গভীরতর সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এতে প্রমাণ হয়, আমেরিকায় ডান বামের প্রচলিত বিভাজন রেখা কিছু ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। নতুন রাজনৈতিক সংহতি তৈরি হচ্ছে, যা রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান।

এই অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের ধারাবাহিকতায় আসে প্রজন্মগত রূপান্তরের প্রসঙ্গ। ইতিহাসে প্রায়ই দেখা যায়, বড় ধরনের রাজনৈতিক ও নৈতিক পরিবর্তন ঘটে প্রজন্মের হাত ধরে। যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে তরুণ ভোটার, শিক্ষার্থী এবং সামাজিক আন্দোলনের অংশীদাররা ইসরাইলের প্রতি সমর্থনকে আর স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে নিচ্ছে না। তারা প্রশ্ন করছে। পুনর্মূল্যায়ন করছে। বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজছে।

নতুন প্রজন্মের মধ্যে নতুন চেতনা গড়ে উঠছে, যা কেবল রাজনৈতিক অবস্থান নয়। বরং এক নৈতিক অবস্থান, যেখানে মানবাধিকার, উপনিবেশবাদ-বিরোধিতা এবং বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নগুলো এক সাথে সক্রিয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিকল্প মিডিয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক আন্দোলন ঘিরে এই চেতনা দ্রুত ছড়িয়েছে। ফলে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। যেখানে ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারক, ভোটার এবং মতামত-নির্মাতারা ভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উঠে আসবে।

এই প্রজন্মগত পরিবর্তন সরাসরি প্রভাব ফেলে ক্ষমতার কাঠামোর ওপর। কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনমতই শেষ পর্যন্ত নীতিকে প্রভাবিত করে, যদিও তা সময়সাপেক্ষ। যখন একটি প্রজন্ম ধারাবাহিকভাবে নির্দিষ্ট নীতির বিরোধিতা করে, তখন সেই নীতির টিকে থাকা কঠিন হয়। ফলে আজকের প্রান্তিক অবস্থান আগামী দিনের মূলধারায় পরিণত হতে পারে।

এই দুই স্তরের যৌথ ফলাফল হিসেবে যা ঘটবে, তা হলো হেজিমনিক পতন। কোনো শক্তি কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারে না; এ জন্য প্রয়োজন নৈতিক বৈধতা এবং গ্রহণযোগ্যতার। যদি কোনো রাষ্ট্র বা প্রকল্প সামরিকভাবে সফলও হয়, কিন্তু তার কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে তার হেজিমনি দুর্বল হতে বাধ্য।

এই প্রেক্ষাপটে বলা হয়, সামরিক সাফল্য এবং ন্যারেটিভের ক্ষেত্রে পরাজয় সহাবস্থান করতে পারে। ইসরাইল যুদ্ধক্ষেত্রে জয়লাভ করলেও, যদি বিশ্বজনমত তার বিরুদ্ধে চলে যায়, যদি মিত্র রাষ্ট্রের জনগণ তার নীতির বিরোধিতা করে এবং যদি নতুন প্রজন্ম তার বৈধতা প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে সেই জয় দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সেটি এমন বিজয়, যেখানে অর্জনের চেয়ে ক্ষতি বেশি।

এই পতন দু’টি ফ্রন্টে ঘটে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। যেখানে ইসরাইল ক্রমে সমালোচনার মুখে পড়ছে। তার নৈতিক অবস্থান দুর্বল। তার কর্মকাণ্ড বৈশ্বিক আলোচনায় প্রশ্নবিদ্ধ। দ্বিতীয়ত, আমেরিকার অভ্যন্তরে। সেখানে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন কমছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। সমাজ ক্রমবর্ধমান মাত্রায় ইসরাইলের গণহত্যা ও সম্প্রসারণবাদকে না বলছে। রাজনীতিতেও তার প্রতিধ্বনি উঠছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই পরিবর্তন হঠাৎ ঘটেনি। এটি এক ধীর, কিন্তু গভীর রূপান্তর। যেখানে প্রান্তিক কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে কেন্দ্রে আসছে এবং দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ন্যারেটিভগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। এর ফলে ভবিষ্যতের রাজনীতি, কূটনীতি এবং নৈতিকতার মানদণ্ড পুনর্গঠিত হতে বাধ্য।

লেখক : কবি, গবেষক