সাধারণ মানুষের দৃষ্টি যখন স্থলের গুদামগুলোর ওপর নিবদ্ধ, তখন আমাদের জলরাশিতে অত্যন্ত সুকৌশলী এবং ক্ষতিকারক উপায়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের এক খেলা চলছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বন্দর, ট্যাংক টার্মিনাল এবং জাহাজে পণ্য খালাসে ‘ইচ্ছাকৃত বিলম্ব’ বাংলাদেশে কৃত্রিম পণ্য সঙ্কটের প্রধান কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন অর্থনীতি সংস্কারের চেষ্টা করছে, তখন এই ‘ভাসমান মজুদদারি’ সম্পর্কে জানা অত্যন্ত জরুরি। এই চক্র ভাঙতে হলে আমাদের জাহাজের বাইরে ক্ষমতার সেই করিডোরগুলোতে তাকাতে হবে যেখানে ‘হিতৈষী ব্যবসায়ীর মিথ’ বা গল্প তৈরি হয়েছিল।
প্রাতিষ্ঠানিক মজুদদারির কৌশল
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, মজুদদারি এবং চোরাচালান হলো অর্থনৈতিক নাশকতা। যখন একজন ব্যবসায়ী চাল, গম, ভোজ্যতেল বা খেজুরের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করেন এবং তা অভ্যন্তরীণ গুদামে নিয়ে যান, তখন আইনত তিনি সেগুলো ৩০ দিনের মধ্যে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে বাধ্য। ৩০ দিনের বেশি পণ্য ধরে রাখা দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ আমদানিকারকদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ‘বন্দর এবং সমুদ্র’কে একটি আইনি ফাঁক হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে পণ্য খালাস করতে অস্বীকার করে সেগুলো বন্দরের ইয়ার্ডে, ট্যাংক টার্মিনালে বা চার্টার্ড জাহাজে রেখে দেয়। এই উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত কাস্টমস বন্ডেড এলাকাগুলো এমন নিরাপত্তা এবং বিমা সুবিধা দেয় যা ব্যক্তিগত গুদামে পাওয়া অসম্ভব। বন্দরের এই মজুদদারি তাদের জন্য একটি পরিকল্পিত কৌশল। কারণ এটি ব্যক্তিগত গুদামের তুলনায় নামমাত্র খরচে করা যায়, পুলিশের অভিযান থেকে আইনি সুরক্ষা দেয় এবং পণ্যের যেকোনো ক্ষতির ঝুঁকি বন্দর কর্তৃপক্ষ বা বীমা কোম্পানির ওপর চাপিয়ে দেয়া যায়।
শোষণের একটি বাস্তব চিত্র : ৫ গুণ পর্যন্ত মুনাফার কারসাজি
বাজারের এই কারসাজি বোঝার জন্য খেজুরের অর্থনীতির দিকে তাকালে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। বাংলাদেশে বছরে প্রায় এর লাখ মেট্রিক টন খেজুরের চাহিদা রয়েছে যার প্রায় ৭০ শতাংশই কেবল রমজান মাসে ব্যবহৃত হয়। খেজুরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে আমদানি মূল্য এবং খুচরা মূল্যের মধ্যে বিশাল ব্যবধান দেখা যায়। বস্তায় আসা খোলা খেজুরের মোট আমদানি খরচ কেজিপ্রতি মাত্র ৮৪ টাকা। অন্য দিকে কার্টনে আসা খেজুরের আমদানি খরচ কেজিপ্রতি প্রায় ১৪৬ টাকা। যখন একজন ব্যবসায়ী রমজানের চাহিদাকে পুঁজি করে আনুমানিক ২৭-৩০ টন পণ্যবাহী একটি কনটেইনার বন্দরে এক মাস আটকে রাখেন, তখন বিলম্ব ফি এবং ভাড়া বাবদ কেজিপ্রতি বাড়তি খরচ হয় মাত্র প্রায় ৬ টাকা।
এই বিলম্বের পরেও বস্তাবন্দী খেজুরের মোট বিনিয়োগ দাঁড়ায় কেজিপ্রতি প্রায় ৯০ টাকা এবং কার্টনজাত খেজুরের খরচ হয় প্রায় ১৫০ টাকা। অথচ কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে সিন্ডিকেট সাধারণ বস্তার খেজুর ২০০ থেকে ৩০০ টাকা এবং কার্টনজাত খেজুর ৪০০ টাকা থেকে শুরু করে ১,০০০ টাকারও বেশি দামে খুচরা বিক্রি করে। এটি প্রায় তিন থেকে পাঁচ গুণ মুনাফার একটি চিত্র। আজওয়া বা মেজজুলের মতো প্রিমিয়াম জাতের খেজুরের দাম কেজিপ্রতি ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায় যার আমদানিকৃত মূল্যের সাথে খুচরা দামের কোনো যৌক্তিক মিল নেই। যখন সরকার শুল্ক কমিয়ে দেয়, তখন এই সিন্ডিকেট বন্দরে পণ্য আটকে রেখে সেই শুল্ক ছাড়ের সুবিধাটিও নিজেরা ভোগ করে যা তাদের ‘দ্বিগুণ মুনাফা’ নিশ্চিত করে। ভোজ্যতেল, চিনি এবং ডালসহ অতিপ্রয়োজনীয় অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও তারা একই খেলা খেলে। অনেক সময় তিন মাস পর্যন্ত পণ্য আটকে রেখে তারা প্রায় তিন থেকে সাত গুণ মুনাফা লুটে নেয় এবং এই পুরো প্রক্রিয়াটি কাস্টমস ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে সম্পন্ন হয়। এলপিজিসহ বেশ কিছু নিত্যপণ্যের সাম্প্রতিক অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এই সিন্ডিকেটেরই কারসাজি।
সিন্ডিকেট : বিশ্বাসের চেয়ে মুনাফা বড়
যে দেশে ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলিম, সেখানে রমজান মাসে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সহমর্মিতা আশা করা স্বাভাবিক। অথচ ৮ থেকে ১০ জন বড় ব্যবসায়ীর একটি সিন্ডিকেট এই পবিত্র মাসটিকে তাদের একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে। এদের কাছে লালসার কাছে ধর্ম প্রায়ই গৌণ হয়ে পড়ে। তাদের কাছে মুনাফাই হলো ধর্ম এবং অর্থই হলো ঈশ্বর। তারা ছোট প্রতিযোগীদের তেল, চিনি, ডাল ও পেঁয়াজের মতো পণ্য আমদানিতে বাধা দেয় যাতে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম এই বাজারটির ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে। এমনকি এই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনেকে সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হিসেবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন। ক্ষমতায় থেকে তারা নিজেদের সুবিধার জন্য আইন তৈরি করেন, যার ফলে সরকার অনেক সময় তার নিজের ভেতর বসে থাকা ব্যক্তিদের শাস্তি দিতে অসহায় বোধ করে। ইসলামে মজুদদারি মহাপাপ। মহানবী সা: সতর্ক করে বলেছেন, ‘পাপী ছাড়া কেউ মজুদদারি করে না’ এবং ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের কাছ থেকে খাদ্য মজুদ করে রাখে, আল্লাহ তাকে দারিদ্র্য ও কুষ্ঠব্যাধিতে আক্রান্ত করবেন।’
‘হিতৈষী’ ব্যবসায়ীর গল্প : একটি ব্যক্তিগত অনুশোচনা
বিশ বছর আগে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থায় (এনএসআই) কর্মরত থাকাকালীন আমি এই প্রতারণা প্রত্যক্ষ করেছি যা আজও আমাকে ব্যথিত করে। একদল ‘মার্জিত এবং দেশপ্রেমিক সাজা’ ব্যবসায়ী আমার কাছে একটি প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন যা সাধারণ মানুষের জন্য আশীর্বাদ মনে হয়েছিল। তারা অনুরোধ করেছিলেন, রমজান উপলক্ষে সাময়িকভাবে আমদানি শুল্ক কমিয়ে দিতে যাতে তারা গরিব মানুষের জন্য পণ্যের দাম কমাতে পারেন। তাদের আন্তরিকতায় বিশ্বাস করে আমি এনবিআরের যৌক্তিক আপত্তি সত্তে¡ও সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছিলাম। শুল্ক কমানো হলো, রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাল। কিন্তু ফলাফল ছিল এক নির্মম বিশ্বাসঘাতকতা। খুচরা বাজারে পণ্যের দাম এক পয়সাও কমেনি।
সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম, আমার ‘সরলতা’ এবং ভালো করার ইচ্ছাকে সেই সিন্ডিকেট অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। বিবেকহীনদের বিশ্বাস করে আমি দেশের অপূরণীয় ক্ষতি করেছিলাম। আজকের প্রশাসন ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের প্রতি আমার অনুরোধ : এই ব্যবসায়ীদের জাঁকজমকপূর্ণ উপস্থাপনায় বিভ্রান্ত হবেন না। যখন এই প্রভাবশালীরা জনহিতকর সমাধানের কথা বলেন, তারা প্রায়ই সাধারণ মানুষের ক্ষুধার বিনিময়ে তাদের পরবর্তী বিলিয়ন ডলার লাভের সেতু তৈরি করেন।
‘ইন-হাউজ’ একচেটিয়া আধিপত্য : দুর্নীতির স্থপতি
পণ্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য প্রায়ই বন্দর কর্তৃপক্ষকে অন্যায্যভাবে দোষারোপ করা হয়। কিন্তু এর আসল কারিগর হলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, যারা মুষ্টিমেয় কিছু শক্তিশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর, (সম্ভবত ১০টির বেশি নয়) অনুরোধে বা স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে। এই গ্রæপগুলো ‘ইন-হাউজ’ পদ্ধতিতে কাজ করে। অর্থাৎ জাহাজ, শিপিং এজেন্ট এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সবকিছুর মালিক তারাই। এই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাদের জন্য সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ করে দেয়। ২-৩ কোটি টাকার ঘুষ তাদের কাছে সামান্য বিষয় হতে পারে, কিন্তু এর চূড়ান্ত মূল্য দিতে হয় গ্রামের সাধারণ মানুষকে। তাদের বাড়তি দামে তেল আর ডাল কিনতে হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা এবং কোস্টগার্ডের কৌশলগত সাফল্য
আমাদের এই লড়াইয়ের মূলে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জন্মলগ্ন থেকেই রাজনৈতিক প্রভাবে পঙ্গু হয়ে আছে। আইন অনুযায়ী ঘুষদাতা এবং গ্রহীতা সমান অপরাধী হলেও এই শক্তিশালী শিল্পপতিরা প্রায় কখনোই বিচারের মুখোমুখি হন না। তবে এই স্থবিরতার মধ্যে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড উদ্ভাবনী পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি নতুন পথ দেখিয়েছে। অসাধু সিন্ডিকেটগুলো যখন জলযানগুলোকে ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে ব্যবহার করে চাল, তেল এবং চিনি লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল, তখন কোস্টগার্ড একটি বিশাল অভিযান শুরু করে। অভ্যন্তরীণ নৌপথ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে অসংখ্য জলযান ও লাইটার জাহাজে তল্লাশি চালিয়ে তারা সিন্ডিকেটের গোপন সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে দেয়।
এই বলিষ্ঠ অভিযানের ফলে গত রমজান এবং ঈদুল আজহার সময় বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল এবং কৃত্রিম মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল। কোস্টগার্ডকে এই কাজে সহায়তা করা এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার এজেন্ডার একটি অন্যতম অংশ। এটি কেবল আইন প্রয়োগই নয়, বরং অর্থনৈতিক কষ্টে থাকা লাখ লাখ মানুষকে সরাসরি স্বস্তি দেয়ার একটি উপায় যা সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক।
কলম এবং প্রার্থনা
আমি এই কলম ধরেছি কারণ দুই দশক আগে আমি ভেতর থেকে এই লোভের চেহারা দেখেছি; আজ দুই দশক পরেও রমজানের আগে ঠিক একই কায়দায় পণ্যমূল্য বৃদ্ধির সেই পুরনো খেলা আবারো দেখতে পাচ্ছি। মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে এই লড়াই কেবল অর্থনৈতিক বিতর্ক নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদার বিষয়। রমজানের প্রতিটি সন্ধ্যায় যখন কোটি কোটি মুসলমান ইফতার করতে বসেন, তারা তাদের পাতের দিকে তাকিয়ে এই অন্যায়ের বেদনা অনুভব করেন। মুনাফাখোর সিন্ডিকেটের সদস্যদের স্রষ্টার কাছে পাপী হিসেবে গণ্য হতে হবে। ক্ষুধার্ত পরিবারের কাছ থেকে জোর করে কেড়ে নেয়া প্রতিটি অতিরিক্ত টাকার সাথে অভিশাপ জড়িয়ে থাকে।
সরকারকে অবশ্যই কোস্টগার্ডকে এমন ক্ষমতা দিতে হবে যাতে তারা ৩০ দিনের বেশি আটকে রাখা যেকোনো পণ্য অবৈধ মজুদদারি হিসেবে গণ্য করতে পারে। এই লড়াইয়ে এক দিকে যেমন ঢাকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দফতরে বসে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সততার পরিচয় দিতে হবে, তেমনি উত্তাল সমুদ্র আর নদ-নদীর প্রতিকূল পরিবেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা কোস্টগার্ড সদস্যদের সাহসিকতাকে রাষ্ট্রের সম্মান জানাতে হবে। উপকূলীয় জনপদ আর নদীপথ নিরাপদ রাখতে যারা দিনরাত অতন্দ্র প্রহরী হয়ে কাজ করছেন, এ দেশের মানুষ তাদের এই ত্যাগ স্মরণ রাখবে।
লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য বিইউপি



