মোস্তফা কামাল
বাংলাদেশ যে প্রশ্ন করতে শিখেছে, জবাব চাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে-তা চরম অসহ্য ভারতের। প্রভূত্ব, বড়ত্ব আর আধিপত্য রোগে ‘বন্ধু’ নামের প্রতিবেশীটি কেবল বাংলাদেশের কাছে জবাব চায়। নিজে জবাব দেয় না, তার ওপর গণ্ডগোল পাকায়। গুজবের পর গুজবের গজব আরোপ করে। আবার বাংলাদেশকেই অভিযুক্ত করে। এ ধারাবাহিকতায় দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে রোববার সন্ধ্যায় ফের বিক্ষোভ করেছে ভারতের উগ্রপন্থীরা। এর আগে শনিবার রাতেও ঘটিয়েছে একই কাণ্ড। বাংলাদেশ হাইকমিশনের অফিসের নিরাপত্তা বেস্টনি পেরিয়ে ঢুকে ‘অখণ্ড- হিন্দু রাষ্ট্র সেনার’ ব্যানারে উৎপাত করেছে বিনা বাধায়। ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে হুমকিও দিয়েছে। তারা বাংলা ও হিন্দি মিলিয়ে কথা বলছিল। এ সময় ‘হিন্দুদের নিরাপত্তা দিতে হবে’, ‘হাইকমিশনারকে ধর’ বলে স্লোগান দেয়া হয়। বাংলাদেশ এর জবাব চেয়েছে। যথাযথ জবাব না পাওয়ায় আনুষ্ঠানিক ঊষ্মা প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের বরাতে দাবি করা হয়েছে, ‘একদল যুবক বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে বাংলাদেশের ময়মনসিংহে দিপু চন্দ্র দাসের ঘটনার প্রতিবাদ করে স্লোগান দিয়েছে, কিন্তু বেস্টনি ভেদ করা বা নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরির কোনো চেষ্টা ছিল না। এ ধরনের একপেশে, খাময়োলি বক্তব্য নাকচ করে দিয়েছেন তৌহিদ হোসেন। ক্রমাগত খবরদারি ও আধিপত্য চালানোর জেরে বাংলাদেশে কিছুদিন ধরে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট মারাত্মক পর্যায়ে। এর অংশ হিসেবে ঢাকায় ভারতীয় দূাবাস অভিমুখে মিছিলও ছুটেছিল। বাংলাদেশ সরকার তাদের নিবৃত করে সেটা সামলে নেয়ার দক্ষতা দেখিয়েছে। ভারত সেটাকে ফলাও করেছে নেতিবাচক ও অসত্যভাবে। চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেটে ভারতের হাই কমিশন অফিসে হামলার গুজবও রটিয়েছে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে সেসব অফিসে বাড়তি নিরাপত্তা দিয়েছে বাংলাদেশ। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক মোতায়েন রেখেছে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর গত ১২ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ এবং তার সন্দেহভাজন হামলাকারীদের ভারতে চম্পট দেয়ার খবরে ঢাকাসহ বাংলাদেশে মূলত ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্টে নতুন করে টোকা পড়ে। সরকার দ্রুত বিষয়টি আমলে নেয়। কোথাও যেন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে সেই ব্যবস্থা করে। এর উল্টোটা করে ভারত। বাংলাদেশকে কেবল দোষারোপ নয়, নানা গুজবও রটায়। তারওপর দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মূল ফটকে ঢুকে হিন্দু চরমপন্থীরা বিক্ষোভ করে। উস্কানিমূলক স্লোগান, এমনকি হাইকমিশনারকে হুমকিও দেয়। কূটনৈতিক শিষ্টতায় এর প্রতিবাদ করে বাংলাদেশ। ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ হাইকমিশনের জন্য যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি বলে অভিযোগ করে। এটুকুই সহ্য হয়নি ভারতের। ভারতের মদদে বাংলাদেশের ক্ষমতায় চেপে বসা ফ্যাসিবাদের ৫ আগস্টে পতনের পর থেকে ভারত যে আদাজল খেয়ে নেমেছে এ থেকে একটুও পিছু হটেনি। বরং আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
দেশটির পত্রিকা-অনলাইন-টেলিভিশনগুলো হয়ে ওঠে বাংলাদেশবিরোধী প্রোপাগান্ডা মেশিন। প্রতিনিয়ত ছড়াতে থাকে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য। সচেতনরা এতে গা মাখতে চাচ্ছেন না। তাদের হিসাব পরিস্কার যে, স্বভাব-চরিত্র ও বেদনা অনুযায়ী ভারতের এসব করা খুবই স্বাভাবিক। তাই তাদের গুজবে কান দেয়া সময়ের অপচয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে বিস্তর ক্ষোভ। তাদের এ ক্ষোভকে আরো বাড়াতে চায় ভারত। চায় তারা ক্ষেপুক। উত্তেজিত হয়ে অঘটনে জড়াক। তা ভারতকে সুবিধা পাইয়ে দেবে। ভারতের চাণক্য কূটনীতির এটা বিশেষ কৌশল। এখানে বুঝের মারাত্মক তফাৎ। ঠিক এভাবে বুঝে অভ্যস্ত নয় সাধারণ মানুষ। সচেতনরা চান না ভারতে বা অন্য কোনো দেশে উগ্র সাম্প্রদায়িকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে কি করছে সেটাকে উপলক্ষ্য করে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু মানুষের ক্ষতি হোক। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আধিপত্যবাদী শক্তির অপতৎপরতা- অপপ্রচার নতুন নয়। তাই তাদের হাতে কোনো নতুন ইস্যু তুলে দেয়া থেকে যথেষ্ট সাবধান হওয়া জরুরি।
বিপ্লবকে ব্যর্থ করার অপচেষ্টা বিপ্লবের সমান্তরালে চলে। সেখানে ভারতের জড়িত না থাকলেই কি হতো না? ভারত কি পারতো না বাংলাদেশের মানুষের সেন্টিমেন্ট বুঝে তার আগামীর পথচেলা ঠিক করতে? –এ প্রশ্ন নিয়ে নানা মত আছে। বাস্তবতা হচ্ছে, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী, তাঁর দলের প্রায় সমগ্র নেতৃত্ব এবং সাবেক মন্ত্রী ও ভেঙে দেয়া দ্বাদশ জাতীয় সংসদের আওয়ামী লীগদলীয় প্রায় সব সদস্য, সাবেক সরকারের আমলে সুবিধাভোগীদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে ইন্ধন দিচ্ছে ভারত। শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটায় ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার, এমনকি ক্ষমতার বাইরে থাকা কংগ্রেস নিদারুণ মনঃকষ্টে আছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় শেখ হাসিনা ও ভারতে আশ্রিত তার মন্ত্রিসভার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ ভারতের জন্যও কষ্টের।
বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানালেও ভারত তাতে সাড়া না দেয়ায় ড. ইউনূসদের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে বিজেপি সরকারের টানাপোড়েন চলছে। তারপরও বাংলাদেশের আন্তঃসম্প্রদায় অবস্থা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় ভালো। বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক অফিস ও মিশনগুলোকে বাংলাদেশ সরকার বরাবরই সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় রাখে। আর কূটনীতিকরা নিরাপত্তার পাশাপাশি পান আদর-সমাদর-আথিতেয়তা। যা বিশ্বের কম দেশেই মেলে। সেখানে পাশের দেশে, তাও ’অকৃত্রিম বন্ধু‘ নামে প্রচারিত ভারতে সহিংস সাম্প্রদায়িক বিক্ষোভকারীরা বাংলাদেশ হাই কমিশনের ভেতরে ঢুকে পড়ে। তারা কিভাবে ঢুকলো সেখানে- এ প্রশ্ন করায় ভীষণ খারাপ লেগেছে দিল্লির। জবাব না দিয়ে শুনিয়েছে উল্টাপাল্টা, অবান্তর কথা। তার ওপর চালাচ্ছে বুলিং, গুজব, বিভ্রান্তিকর যত তথ্য।
আন্তর্জাতিক কতোগুলো স্বীকৃত নীতিমালা রয়েছে একদেশের সাথে আরেক দেশের সম্পর্কের। বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশন আছে, কনসুলেট আছে। ভারতের দিল্লীতেও বাংলাদেশের হাইকমিশন ছাড়াও কোলকাতা ও আগরতলায় কনসুলেট রয়েছে। কোন দেশের দূতাবাস, তাদের কূটনীতিবিদদের বাসস্থান সেই দেশের সার্বভৌম এলাকা। হাজার শত্রুতা থাকলেও এমনকি যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও কখনো দূতাবাস বা কূটনীতিকদের উপর হামলা করা যায় না। তাদের থাকে ডিপ্লোমেটিক ইমিউনিটি। এরশাদ আমলে সোভিয়েত রাশিয়ার ঢাকাস্থ কয়েকজন কূটনীতিককে বাংলাদেশ বহিষ্কার করেছিল গোয়েন্দা কার্যক্রম চালিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য। এটা স্বীকৃত রীতি। কিন্তু কোন দেশের দূতাবাস বা তাদের কূটনীতিকদের উপর হামলার অধিকার কারো নেই। পাকিস্তান, ভারতও একে অপরের বিরুদ্ধে কখনো তা করে না। কিন্তু বাংলাদেশকে যেন পেয়ে বসেছে ভারত। তারা খবরদারি কেবল জোরদারই নয়, সম্প্রতি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকে নিজেদের ওপর আঘাত ভাবছে। এর শোধ নিতে চায়। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় আরো বেপরোয়া। সেই ১৯৭০ থেকে শুরু করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সব নির্বাচনেই কমবেশি প্রভাব রেখেছে ভারত। সামরে প্রতিবেশী ভারতের কমবেশি প্রভাব ছিল। আগামী নির্বাচনে সেটা হাতছাড়া হওয়ার আতঙ্কে উতলা-বেসামাল হয়ে উঠেছে। মানতেই পারছে না, বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা কমন সেন্টিমেন্ট তৈরি হয়েছে। যা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী এবং বাংলাদেশপন্থী।
বাংলাদেশের মানুষের এই ভারত বিরোধিতা ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক কারণে নয়। পুরোটাই রাজনৈতিক কারণে। এর ভিত্তিমূলে আওয়ামী লীগ। নানা অপশাসনে-দুঃশাসনে তারা নিজেরা পতিত হয়েছে। ভারতকেও এর শরীক করতে পেরেছে। কূটনীতির বদলে ভারতও এখানে আওয়ামী লীগের পক্ষে মোড়লি রাজনীতি করেছে। নেপাল-শ্রীলঙ্কাসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ভিলেনের তালিকাভুক্ত হয়েছে। মাত্রাগতভাবে তা বেশি হয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশসহ আশপাশের এই বিক্ষুব্ধতা ভারতের নিজের হাতের কামাই। এখন তাদের তা ভুগতে হচ্ছে। ভোগাচ্ছে বাংলাদেশকেও। আওয়ামী লীগের ফ্যসিবাদী শাসনকে কদাকারভাবে প্যাট্রোনাইজ না করলে এমন নাও হতে পারতো। অনেকটা বাধ্য হয়েই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় পাকিস্তানপন্থা-ভারতপন্থা পরিত্যাজ্য হয়ে বাংলাদেশপন্থার রাজনীতির বিজয় অনিবার্য দেখে দেশের ও বিদেশের বাংলাদেশবিরোধীদের গাত্রদাহ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এই পরিস্থিতি উৎরাতে হলে ভারতকে প্রতিবেশীদের কষ্ট ও আকাঙ্ক্ষা বুঝতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ চায়- ভারত সীমান্ত হত্যা বন্ধ করবে, পানির হিস্যা দেবে, কোনো একক দল বা ব্যক্তির সাথে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পাতিয়ে অন্যদের ওপর নিপীড়ন চালাবে না। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করবে না। বিশেষ করে বিগত সময়ে ভারতের যে সকল লোকেরা হাসিনার গুম-খুনের ডিজাইনের সাথে জড়িত ছিল, তাদের বিচারের সম্মুখীন করা ভারতের নিজের জন্যও দরকার। তার আগে তারা যে এ ব্যাপারে আন্তরিক, সেই নমুনা দেখাতে হবে। আস্থা ফেরাতে কখনো কখনো ক্ষমা চাওয়া সম্ভব না হলেও তা কাজে বুঝাতে হয়। এসব না করে হুমকি-ধমকিতে রাখা, অবিরাম বিরক্ত করা, গুজব রটানো, বড়ত্বের জোর দেখানো ক্রমেই গোটা বিশ্বে অচল-অসার হয়ে যাচ্ছে। ছোটদের উদারতা-শিষ্টাচারকে দুর্বলতা ভাবার দিনও ফুরিয়ে আসছে। বাংলাদেশ ভারতসহ অনেককে সেই বার্তা তো ৫ আগস্টে চূড়ান্তভাবে জানিয়েই দিয়েছে।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন



