নির্বাচন এলে ঝড় ওঠে। ফেসবুকে ঝড়। চায়ের কাপে ঝড়। একসময় সন্ধ্যা নামলে চায়ের দোকানে ‘সংসদ’ জমত। এখন সেই সংসদ বসে ফেসবুকে। ভোট এলে দেশ ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষ কথা বলে, তর্ক করে। ভোট হয়ে গেলে আবার সেই আলোচনায় ভাটা পড়ে। নির্বাচিতরা ভুলে যান প্রতিশ্রুতি। আর ভোটাররাও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চাইতে খুব একটা সামনে আসেন না। ১০ টাকায় চাল খাওয়ানোর কথা ছিল, এখন কেন খাওয়াচ্ছেন নাÑ এমন প্রশ্ন তোলার অভ্যাসও আমাদের নেই।
এই প্রশ্ন না করার সংস্কৃতিই অনেক রাজনীতিবিদের অভ্যাস খারাপ করে দিয়েছে, সাদামাটা বিবেচনা অন্তত সেটাই বলে। রাজনীতিবিদরা ধরে নিয়েছেন, ভোটের আগে যেমন খুশি তেমন প্রতিশ্রুতি দেয়া যায়। হোক সেগুলো বাস্তবসম্মত বা অবাস্তব। তবে এবারের নির্বাচনে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন মনে হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো যেসব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, সেগুলো অনেকটা ‘লিখে-পড়ে’ রাখছেন ভোটাররা। চব্বিশের পরিবর্তনের পর মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। রাজনীতি নিয়ে যে হতাশা ছিল, সেটিও কেটে যেতে শুরু করেছে। ভোটাররা মনে করছেন, পুরনো ও স্থবির ব্যবস্থাগুলো বদলানোর একটা সুযোগ এসেছে। এ উপলব্ধি রাজনীতিতে নতুন এক চাপ তৈরি করছে– পুরনো কাঠামো ভাঙার চাপ।
পুরনো ভাঙলে নতুন আসবে, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ‘নতুন’কে টেনে আনার দায়িত্ব কার হাতে যাবে? বিএনপি, না কি জামায়াত-বলয়? বিএনপি দিচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড, বেকার ভাতা, কর্মসংস্থানভিত্তিক সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের প্রতিশ্রুতি। অন্য দিকে, জামায়াতে ইসলামী বলছে পরিকল্পনাভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার কথা। তারা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। হাজির করছে সরকার গঠনের প্রথম ১০০ দিনের পরিকল্পনা। বছরভিত্তিক ও পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মসূচির রূপরেখাও দিচ্ছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা সামনে রেখে জাতীয় নাগরিক পার্টি ৩৬ দফার ইশতেহার দিয়েছে। রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক সংস্কার, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং ব্যবসায় ও শ্রমবান্ধব অর্থনীতির রূপরেখা তুলে ধরেছে তারা। দলটির ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’-এ কর্মসংস্থান, ন্যূনতম মজুরি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংস্কার, এনআইডিভিত্তিক নাগরিক সেবা এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।
প্রতিশ্রুতিগুলো নিয়ে লাভ-ক্ষতির হিসাবে বসে গেছেন অনেকে। আলোচনার শীর্ষে আছে বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ড’। এটি দলটির সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি। কার্ডের নমুনা তৈরি করে সভা-সমাবেশে দেখাচ্ছে তারা। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ক্ষমতায় গেলে চার কোটি পরিবারকে মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা বা সমমূল্যের খাদ্য দেয়া হবে। কার্ডটি পাবেন পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা। এতে নারীদের আর্থিক ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা বাড়বে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য একটি অর্থায়ন পরিকল্পনাও প্রণয়ন করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ভর্তুকি ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানোর মাধ্যমে এ কর্মসূচির খরচ মেটানো হবে।
নীতিগত দিক থেকে ‘কার্ড’-এর ধারণা নতুন নয়। ভূমিহীন ও আয়হীন পরিবারের নারীদের জন্য ‘ভিজিডি’ কার্ড, দুর্যোগ ও উৎসবের সময় খাদ্যসহায়তা কার্ড ‘ভিজিএফ’ প্রচলিত আছে। ডিজিটাল এনআইডি ডাটাবেস থাকায় সঠিক পরিবারের কাছে কার্ড-সুবিধা পৌঁছে দেয়াও অসম্ভব কিছু না। সে হিসেবে বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রতিশ্রুতিকে বাইরে থেকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে। মাত্র দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা দিয়ে একটি পরিবারের পরিবর্তন কতটা সম্ভব? এই অর্থ কি নির্দিষ্ট পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুফল দিতে পারবে, নাকি এটি কেবল সাময়িক স্বস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? দরিদ্র পরিবারগুলো কি এ সহায়তার মাধ্যমে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারবে? এ বিষয়টি আলাদা করে উল্লেখ করেছে এনসিপি। দলটির ইশতেহারে দারিদ্র্যচক্র ভাঙার কথা বলা হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডের বিষয়টি যদি একটু গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করি, তখন কিছু বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে চার কোটি পরিবারকে মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা করে দিতে গেলে বছরে খরচ হবে ৯৬ হাজার কোটি থেকে এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় বাজেট সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বার্ষিক বরাদ্দ প্রায় এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফসহ ১৩০টির বেশি কর্মসূচির মাধ্যমে বিতরণ হচ্ছে।
সামাজিক সুরক্ষা খাতে এখন যে বরাদ্দ আছে, ফ্যামিলি কার্ড চালু করলে কেবল এই কার্ডের জন্য বরাদ্দের পুরো টাকা খরচ করতে হবে। তা ছাড়া ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করতে গেলে এর পেছনে প্রশাসনিক ও আনুষঙ্গিক কিছু খরচ দরকার পড়বে। এত বড় খরচের জোগান দেয়া কি ভর্তুকি ব্যবস্থা নতুন করে সাজিয়ে, আর রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে সম্ভব? রাজস্ব বাড়ালেও কতটা বাড়ানো সম্ভব হবে?
এই বিপুল অর্থ যদি নগদ সহায়তার একটি মাত্র কর্মসূচিতে চলে যায়, তা হলে চলমান সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কী হবে? ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী এতে কতটুকু উপকার পাবে? নগদ সহায়তা যদি দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা উৎপাদনমুখী কার্যক্রমের সাথে যুক্ত না হয়, তা হলে তা দারিদ্র্য কমানোর পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে দেবে না তো? তা ছাড়া বাজেটে ব্যয় বাড়ানোর পর বাংলাদেশে এক ধরনের সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ সিন্ডিকেট কৃত্রিমভাবে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়।
বড় একটি সমস্যা হলো– সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন। বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা বা সহায়তা প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের মাধ্যমে সুবিধা বিতরণের অভিজ্ঞতা আছে। এই অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। অতীতে দেখা গেছে, অসচ্ছল মানুষের জন্য বরাদ্দ অর্থ বা সুবিধার বড় অংশ রাজনীতিবিদদের পরিবার বা ঘনিষ্ঠদের হাতে চলে গেছে। এ বাস্তবতায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রতিশ্রুতি কতটা দাগ কাটবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে প্রকল্পটি কতটা টেকসই হবে, তা নিয়েও সন্দেহ-সংশয় রয়েছে। এক বছরের জন্য কোনো কর্মসূচি চালু করা তুলনামূলকভাবে সহজ। তবে বছরের পর বছর ধরে কার্যকরভাবে চালিয়ে যাওয়া কঠিন। দীর্ঘমেয়াদে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলে বাজেটের ওপর চাপ পড়বে। অর্থনীতিবিদদের অনেকে বলছেন, ফ্যামিলি কার্ড নীতিগতভাবে সম্ভব, রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয়। কিন্তু বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং।
ফ্যামিলি কার্ড ছাড়াও বিএনপি ১৮ মাসে এক কোটি চাকরি সৃষ্টি, শিক্ষিত বেকারদের জন্য বেকার ভাতা, কৃষি কার্ডের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে সার ও বীজ, স্বাস্থ্য খাতে শক্তিশালী প্রাইমারি কেয়ার নেটওয়ার্ক গড়া এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। ক্রীড়াকে শিক্ষার অংশ করা, নবায়নযোগ্য শক্তি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আইসিটি ও ব্লু-ইকোনমিতে কর্মসংস্থান বাড়ানোর কথাও আছে। ধর্মীয় নেতাদের মাসিক সম্মানীর প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছে।
অন্য দিকে জামায়াতে ইসলামীর পরিকল্পনাগুলো কেবল স্বল্পমেয়াদি নগদ সহায়তার নয়, দলটি দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে পরিকল্পনা হাজির করেছে। তাদের পরিকল্পনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তাকে উৎপাদনমুখী কাঠামোর সাথে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হলে সেটি পরিবারগুলোকে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে।
পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে দক্ষ করতে প্রশিক্ষণ দেয়া এবং ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথা বলছে জামায়াত। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে জামায়াত যুগোপযোগী, কর্মমুখী ব্যবস্থার কথা বলছে। এর লক্ষ্য শিক্ষিত বেকারত্ব দূর করা। তারা দুর্নীতি দমনকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রধান শর্ত হিসেবে দেখছে। অঙ্গীকার করছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের। অর্থনীতিতে ব্যাংক ব্যবস্থার সংস্কার, রেমিট্যান্স বাড়ানো ও জাকাতভিত্তিক কাঠামোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি।
এসব প্রতিশ্রুতি আকর্ষণীয়। তবে পরিকল্পনাগুলো ঠিক কোন কাঠামো ও প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন হবে, সে বিষয়ে ভোটারদের সামনে এখনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা হাজির করা হয়নি। বিএনপির তুলনায় জামায়াতের প্রতিশ্রুতিগুলো তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল বলে মনে হয়। তবু আদর্শিক পরিবর্তনের সাথে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা ও বিশ্বের বাজারে সামঞ্জস্য রাখা হবে তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সংখ্যালঘু ও নারী ইস্যুতে জামায়াত উভয়ের যথাযথ অধিকার নিশ্চিত করা, নিরাপত্তা ও ন্যায্যতার বার্তা দিচ্ছে। সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ, নারীদের সম্মান ও কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা বলছে। চব্বিশের পরিবর্তনের পর হিন্দুদের মন্দির পাহারা দেয়াসহ জামায়াতের বেশ কিছু পদক্ষেপ ইতোমধ্যে প্রশংসা পেয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী মতবিনিময় করেছে ব্যবসায়ীদের সাথে। এতে ব্যবসায়-বাণিজ্যের বড় বাধা হিসেবে লাল ফিতার দৌরাত্ম্যের কথা তুলে ধরেছেন ব্যবসায়ীরা। ঘুষ ও অর্থপাচারের কারণে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহে বাধা পড়ার কথাও বলেছেন। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে ব্যবসায়বান্ধব পরিবেশ হবে– এমন প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।
ইশতেহার প্রণয়নে জামায়াতে ইসলামী যে নতুন পদ্ধতি বেছে নিয়েছে, সেটার নামই বলে দিচ্ছে এর উদ্দেশ্য– ‘জনতার ইশতেহার’। ওয়েবসাইটে জনগণের মতামত নেয়া, জাতীয় ও আসনভিত্তিক প্রস্তাবের সুযোগ রাখা, পেশা, শ্রেণী, অঞ্চল, শহর ও জেলা অনুযায়ী মতামত সংগ্রহ করছে তারা। এসব মতামতের বিশ্লেষণ প্রতিশ্রুতিতে যুক্ত করার ঘোষণাও এসেছে। জামায়াতের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার, লাইভ ট্র্যাকার চালুর মতো উদ্যোগ রাজনীতিতে এক ধরনের নতুন ভাষা এনেছে। এ ভাষা ইতিবাচক।
জামায়াত কথা বলছে কাঠামোগত সংস্কারের। বিএনপির প্রচারে প্রাধান্য পাচ্ছে তাৎক্ষণিক স্বস্তির প্রতিশ্রুতি। ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কোনটা চায়, সেই সিদ্ধান্ত তারা নেবে। এবার মানুষ আর প্রতিশ্রুতিতে মুগ্ধ হতে চায় না। মানুষ জানতে চায়, প্রতিশ্রুতিগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, কখন হবে। আর ব্যর্থ হলে জবাবদিহি করবে কে? এ প্রশ্নগুলো যত দিন থাকবে, তত দিন রাজনীতির ওপর চাপ থাকবে। সেই চাপ হয়তো আগামীর রাজনীতিকে বদলে দেবে।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



