কাজী সালাহ উদ্দীন
সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ ১৯১১ সালের ১১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। জন্মদিনে তার স্মৃতি ও রূহের প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ও সালাম। তার মা আফজাল নেসা বেগম ছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের বোন। পিতা সৈয়দ আবদুস সালেক ছিলেন একজন সম্মানিত ব্যক্তি। ১৯৩৯ সালের পয়লা অক্টোবর কলকাতার মেয়র এ কে এম জাকারিয়ার কন্যা লায়লা আরজুমান্দ বানুর সাথে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ।
প্রগাঢ় মানবতা বোধসম্পন্ন একজন আলোকিত মানুষ ছিলেন সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ। অসুন্দর-অকল্যাণ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মজলুমের পক্ষে আমৃত্যু ছিল তার অবস্থান। তার ব্যক্তিত্বের প্রভা বিচারালয়ের চার দেয়ালের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল। শিক্ষা জীবনের শুরু থেকে সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ প্রতিটি শ্রেণীতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৯২৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় বগুড়া স্কুল থেকে সর্বোচ নম্বর পেয়ে প্রথম হয়েছিলেন। প্রবেশিকা পরীক্ষার পর কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৩১ সালে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এর পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ এবং প্রথম শ্রেণীতে এলএলবি ডিগ্রি নেন (১৯৩২-১৯৩৩)।
প্রেসিডেন্সি কলেজের ম্যাগাজিন সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন একবার। এ সময় একজস তুখোড় বক্তা হিসেবেও তার নাম ছড়িয়ে পড়ে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্ক দলের নেতৃত্বও দিয়েছেন। কলেজ জীবনে ক্রীড়া ক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করেন। ত্রিশের দশকে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সংগঠনের দায়িত্বও পালন করেন। সেকালে মুসলমান তরুণদের মধ্যে খেলাধুলায় অংশগ্রহণ এক ধরনের অনীহা ও অবহেলা ছিল, তখন আর তরুণ মোরশেদ এই দৃষ্টিভঙ্গি দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন ১৯৩৪ সালে। এ ক্ষেত্রে তিনি মামা এ কে ফজলুল হকের সহকারী না হয়ে সুভাষচন্দ্রের অগ্রজ শরৎচন্দ্র বসুর (১৮৮৯-১৯৫০) এবং খ্যাতনামা আইনজীবী কে বি খাইতানের জুনিয়র হয়ে কাজ করার দুর্লভ সুযোগ লাভ করেন। কিছুদিন পর আইনে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনে যুক্তরাজ্য যান। ১৯৩৮ সালে তিনি লন্ডনের বিখ্যাত লিংকন’স ইন থেকে বার অ্যাট ল (ব্যারিস্টার) ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৫১ সালে ঢাকা হাইকোর্ট বারে যোগ দেন । ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বারে প্র্যাকটিস করেন। ১৯৫৫ সালে যখন মোহাম্মদ আলী (বগুড়া) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী তখন সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে নিযুক্ত হন।
১৯৫৮ সালের অক্টোবরে জেনারেল আইয়ুব খান রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। হরণ করা হয় সব মৌলিক অধিকার। তখন বিচারপতির আসনে থেকে সৈয়দ মাহবুব মোরশেদকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা নিষ্পত্তি করতে হয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ মামলা ছিল তৎকালীন প্রভাবশালী সরকারের বিরুদ্ধে। মরহুম বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরীর মতে, বিচারপতি মোরশেদের রায় ছিল ইতিহাসের মাইলফলক, দেশের সাংবিধানিক আইনের ম্যাগনাকার্টা স্বরূপ। এর পর (১৯৬৪) পশ্চিমবঙ্গের দাঙ্গা পূর্ব পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়ে। বিচারপতি মোরশেদ হাইকোর্ট থেকে সুয়োমোটো (স্বপ্রণোদিত রূপ) জারি করেন।
নির্ভেজাল গণতন্ত্রের পক্ষে তিনি ছিলেন একজন অবিচল দৃঢ়চেতা নির্ভীক ব্যক্তিত্ব। কর্মক্ষেত্রে যেমন ছিলেন ন্যায়নিষ্ঠ, তেমনি সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ছিলেন এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে তার কর্মক্ষেত্র ছিল বিস্তৃত ও প্রসারিত। তাই একপর্যায়ে ১৯৬৭ সালের ১৫ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি থেকে ইস্তফা দিয়ে জনতার কাতারে শামিল হয়েছিলেন তিনি। বিচারপতি জীবনে অনেক জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ মামলার ঐতিহাসিক সময়োপযোগী রায় দিয়ে স্বৈরশাসনের মধ্যেও আইনের শাসন তিনি সমুন্নত রাখেন। শাসনচক্রের রক্তচক্ষুকে তিনি কখনো ভয় পাননি। যে কারণে তার নামের সাথে যুক্ত হয়েছে ‘নির্ভীক বিচারপতি’ এই শব্দ দু’টি। প্রজ্ঞায়, পাণ্ডিত্যে-দর্শনে সাহিত্যে সর্ব ক্ষেত্রে ছিল অবাধ বিচরণ। বাংলা-ইংরেজি ছাড়াও বেশ কয়েকটি ভাষায় তার দখল ছিল। পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করতেন।
এই অসামান্য গুণসম্পন্ন মানুষ ১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। কিন্তু রেখে গেছেন অনুকরণীয় অসংখ্য দৃষ্টান্ত, যা আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে আমাদের জন্য প্রতিনিয়ত সহায়ক হবে।
লেখক : মহাসচিব : মোরশেদ স্মৃতি সংসদ।



