নির্বাচন, সহিংসতা ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রশ্ন

ভয় ও সহিংসতা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। পক্ষপাতদুষ্ট মিডিয়া সেই ভয়কে আরো বাড়িয়ে দেয়। মিডিয়া যদি ক্ষমতার পালাবদলের খেলায় নামে, তাহলে তারা আর পাহারাদার থাকে না। খেলোয়াড় হয়ে যায়। গণতন্ত্রে এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা। এ সময়ে মিডিয়ার দরকার ছিল সংযম। দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক মিডিয়া আগুনে ঘি ঢালছে। পক্ষপাতদুষ্ট মিডিয়া গণতন্ত্রের পথ দেখায় না; বরং পথ হারিয়ে ফেলে। গণতান্ত্রিক উত্তরণ কেবল নির্বাচন দিয়ে হয় না। এটি হয় দায়িত্বশীল রাজনীতি ও দায়িত্বশীল মিডিয়ার মাধ্যমে। মিডিয়া যদি নিজের আয়নায় নিজেকে না দেখে, তাহলে প্রশ্ন থেকে যাবে– এ উত্তরণ কি আদৌ সম্ভব

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়েছে। শুরুটা হয়েছে প্রতীকীভাবে। কিন্তু বাস্তবতা বেশ জটিল। মূলত ২১ জানুয়ারি রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার শুরু। ২২ জানুয়ারি সিলেট থেকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ থেকে প্রচারে নামেন একই দিন। জাতীয় নাগরিক পার্টি তিন নেতার মাজার ও জুলাই বিপ্লবের শহীদ শরিফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে প্রচার শুরু করে।

উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ভোটের প্রচার শুরু হয়েছে। বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির প্রধানরা জনসভায় বক্তব্য রেখেছেন। দোষারোপ না করার কথা বললেও পাল্টাপাল্টি ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রচার শুরু করেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। প্রথম দিনের প্রচারণায় দুই দলের শীর্ষ নেতারা পরোক্ষভাবে অন্যপক্ষের দিকে ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা বলেন। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বিএনপির সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছেন। তারেক রহমান জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা এনে সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, একাত্তরে মানুষ তাদের চিনেছে। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, চাঁদা আমরা নেবো না এবং কাউকে নিতে দেবো না।’ ‘বেসরকারি ট্যাক্সের’ নামে চাঁদাবাজি চলবে না’। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, এ আক্রমণের মাত্রা আরো বাড়বে। শেষ পর্যায়ে ব্যক্তিগত আক্রমণও চলে আসতে পারে।

এ দৃশ্যগুলো স্বাভাবিক। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এগুলো প্রত্যাশিত। কিন্তু একই সাথে আরেকটি বাস্তবতা সামনে আসছে। সহিংসতার খবর। সংঘর্ষ। মারধর। ভয়ভীতি। গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এমন খবর পাওয়া যাচ্ছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় র‌্যাব কর্মকর্তাকে মেরে ফেলা হলো। কারা এটি করেছে তা কারো অজানা নয়। মিডিয়া সেই দলের নাম বলতে ভয় পেয়েছে। অথবা ইচ্ছে করে এড়িয়ে গেছে। ভোলাতে এক রাজনৈতিক দলের উচ্ছৃঙ্খল কর্মীরা প্রতিপক্ষের প্রচারকদের ওপর হামলা চালিয়েছে। মহিলা প্রচারকদের বোরকা ধরে টান দিয়েছে। রাজধানী মিরপুরে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধমক দেয়া হচ্ছে। সংখ্যালঘুদের বলছে, একটি নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট না দিলে সমস্যায় পড়তে হবে। এগুলো কারা করছে? সবাই জানে। সবাই তাদের চিনে।

কথার আক্রমণ চলুক। নির্বাচনের আগে এরকমটি হবে, তা স্বাভাবিক। কিন্তু মাঠে যদি সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে তাহলে তো বিপদ। বিভিন্ন জেলায় নির্বাচনী পরিবেশ ক্রমে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কোথাও স্বতন্ত্র ও জামায়াতে ইসলামের প্রার্থীর ওপর হামলা এবং ব্যানার-ফেস্টুন ভাঙচুর করে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষে আহত হয়েছেন দুই দলের নেতাকর্মী। আবার কোথাও হুমকি দিয়ে ভোটারদের ভয় দেখানো হচ্ছে। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা– এ যুক্তি এখন আর খাটে না। আশঙ্কার বিষয় হলো– আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে খুব একটা সক্রিয় লক্ষ করা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। ভয় আবার ফিরে আসছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল ভয় ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছে।

একটি গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রথম আকাঙ্ক্ষা থাকে গণতান্ত্রিক উত্তরণ। এই উত্তরণের একমাত্র পথ হলো সুষ্ঠু নির্বাচন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে একমত। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে শুরু হয় না। কিন্তু নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র টেকে না। নির্বাচন যদি ভয় তৈরি করে, নির্বাচন যদি অনিশ্চয়তা বাড়ায়, নির্বাচন যদি সহিংসতার স্মৃতি ফিরিয়ে আনে– তাহলে সেটি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না; বরং দুর্বল করে।

বাংলাদেশের ভোটাররা এটি হাড়ে হাড়ে জানেন। কেন্দ্রে গেলে ঝামেলা হবে– এ ভয় নতুন নয়। বহু পুরনো। এখন আবার সেই ভয় ফিরে আসছে। কোনো কোনো দল ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। কে কোন দলকে ভোট দেবেন, তা বলতেও মানুষ দ্বিধায় পড়ছেন। ভয় পাচ্ছেন। এই ভয় দূর করার দায়িত্ব কার? শুধু সরকারের? নাকি রাজনৈতিক দলেরও? সরকারের দায়িত্ব অবশ্যই আছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আইন প্রয়োগ করা। ভোটকেন্দ্র রক্ষা করা। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো কি দায় এড়াতে পারে? দলগুলোর কর্মীরা যদি সহিংসতায় জড়ায়, তাদের সমর্থকরা যদি প্রতিপক্ষের প্রচারে বাধা দেয়, তাহলে দায় কার? বিশেষ করে বড় দলগুলোর দায় আরো বেশি। কারণ তারা রাজনীতির সুর নির্ধারণ করে। তাদের আচরণ ছোট দলগুলোর জন্য উদাহরণ হয়। যে দল সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি তোলে, তাদের কর্মীদের আচরণও সেই দাবির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অন্যথায় দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রশ্নটি তাই কেবল একটি দলের নয়। সব রাজনৈতিক দলের জন্য প্রযোজ্য। কারণ পেশিশক্তির প্রদর্শন ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। মিছিল বড় হচ্ছে। স্লোগান তীক্ষ্ণ হচ্ছে। ভাষা আক্রমণাত্মক হচ্ছে। এগুলো রাজনীতির স্বাভাবিক উত্তাপ– এ যুক্তি আর চলে না। এই উত্তাপই একসময় আগুন হয়।

৫ আগস্টের পর সহিংসতা করে ভোটে জেতা কি সম্ভব? প্রশ্নটি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, যে দল হেরে যাওয়ার আশঙ্কা করে, তারা প্রথম সহিংসতার পথে যায়। তারা প্রতিপক্ষের প্রচারে বাধা দেয়। ভোটারদের ভয় দেখায়। ভোট দিতে বাধা দেয়। কেন্দ্র দখলের অপচেষ্টা করে। এ আচরণ নতুন নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো– এটি কি এখনো টিকে থাকতে পারে? সমাজ বদলেছে। তরুণরা বদলেছে। রাজনীতির ভাষা বদলানোর চাপ তৈরি হয়েছে। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী প্রজন্ম ভয় দিয়ে নিয়ন্ত্রণ মানতে রাজি নয়। তারা প্রশ্ন করে। তারা প্রত্যাখ্যান করে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণের সময় নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হলে সমাজে দ্রুত মেরুকরণ হবে। আস্থা ভেঙে পড়ে। রাজনীতি চরমপন্থার দিকে যায়। বাংলাদেশ কি সেই ঝুঁকির দিকে হাঁটছে?

এখানে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে– নির্বাচন কি কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার উপায়? নাকি এটি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি প্রক্রিয়া? যদি নির্বাচন সহিংস হয়, যদি ভোটার ভয় পান, যদি প্রতিদ্বন্দ্বীকে শত্রু হিসেবে দেখা হয়– তাহলে যে সরকার আসুক, তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।

এটি শুধু রাজনৈতিক সঙ্কট নয়। এটি রাষ্ট্রীয় সঙ্কট। একটি গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষ বদল চায়। ভাষায় বদল। আচরণে বদল। রাজনীতিতে বদল। পুরনো কৌশল দিয়ে নতুন সময় মোকাবেলা করা যায় না। পেশিশক্তি দিয়ে তরুণদের থামানো যায় না। ভয় দেখিয়ে ভোট আদায় করলে ক্ষমতা আসতে পারে; কিন্তু গ্রহণযোগ্যতা আসে না। এ সময় ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতায় গিয়ে টিকে থাকা কঠিন।

এই নির্বাচন তাই শুধু একটি নির্বাচন নয়। এটি একটি পরীক্ষা। রাজনৈতিক দলের জন্য পরীক্ষা। রাষ্ট্রের জন্য পরীক্ষা। সমাজের জন্য পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সহিংসতা মানে ব্যর্থতা। ভয় মানে পরাজয়। আর সুষ্ঠু নির্বাচন মানে গণতান্ত্রিক উত্তরণের একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য পথ। এ পথ বন্ধ হলে তার পরিণতি কখনো ভালো হয় না। ইতিহাস তাই বলে। প্রশ্ন হলো– আমরা কী ইতিহাস থেকে শিখব? নাকি আবারো একই ভুল করব? এই উত্তর নির্ধারণ করবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশকে কোন পথে নিয়ে যাবে।

গণতান্ত্রিক উত্তরণে মিডিয়া : দায় ও বিচ্যুতি

গণতান্ত্রিক উত্তরণে মিডিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, নির্বাচন যেমন গণতন্ত্রের ভিত্তি, মিডিয়া তেমনি তার রক্ষাকবচ। কিন্তু প্রশ্ন হলো– আমাদের মিডিয়া কি সেই ভূমিকা পালন করছে? বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে।

সম্প্রতি বিশিষ্ট সাংবাদিক শফিক রেহমান মন্তব্য করেছেন, ‘যেসব মিডিয়া একসময় আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিল, তারা এখন বিএনপি হয়ে গেছে।’ এই বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত মত নয়। এটি একটি গভীর বাস্তবতার প্রতিফলন।

যেসব মূলধারার মিডিয়ায় একসময় ফ্যাসিস্টের পক্ষে বয়ান তৈরি হতো, তারা এখন একটি দলের পক্ষে উঠেপড়ে লেগেছে। ক্ষমতার পালাবদলের সম্ভাবনা বদলেছে। বয়ানও বদলেছে। কিন্তু যে জিনিসটি বদলায়নি, তা হলো পক্ষপাত। এখানে প্রশ্ন দল বদলের নয়। প্রশ্ন নৈতিকতার। নিরপেক্ষতা, সততা ও পেশাদারিত্ব– এ তিনটি ছিল সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি। আজ এই ভিত্তিই নড়বড়ে। অনেক সম্পাদক এখন আর সম্পাদক নন। তারা আচরণ করছেন রাজনৈতিক নেতার মতো। তাদের ভাষা, বক্তব্য ও অবস্থান সরাসরি দলীয় লাইনে চলে গেছে। খবরে মতামত ঢুকে পড়ছে। মতামতে স্লোগান ঢুকে পড়ছে। বিশ্লেষণ পরিণত হচ্ছে প্রচারণায়।

এটি শুধু সাংবাদিকতার সঙ্কট নয়। এটি গণতন্ত্রের সঙ্কট। কারণ ভীত ভোটার যখন সিদ্ধান্ত নিতে চান, তিনি তাকান মিডিয়ার দিকে। মিডিয়া যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তাহলে ভোটার বিভ্রান্ত হন। আস্থা হারান। গণতান্ত্রিক উত্তরণে সবচেয়ে বড় শর্ত হলো আস্থা। নির্বাচনের ওপর আস্থা। প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা। মিডিয়ার ওপর আস্থা। এ আস্থা ভেঙে গেলে সহিংসতা বাড়ে। গুজব ছড়ায়। চরমপন্থা শক্তিশালী হয়। দলীয় মাস্তানরা সাহস পায়।

ভয় ও সহিংসতা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। পক্ষপাতদুষ্ট মিডিয়া সেই ভয়কে আরো বাড়িয়ে দেয়। মিডিয়া যদি ক্ষমতার পালাবদলের খেলায় নামে, তাহলে তারা আর পাহারাদার থাকে না। খেলোয়াড় হয়ে যায়। গণতন্ত্রে এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা।

এ সময়ে মিডিয়ার দরকার ছিল সংযম। দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক মিডিয়া আগুনে ঘি ঢালছে। পক্ষপাতদুষ্ট মিডিয়া গণতন্ত্রের পথ দেখায় না; বরং পথ হারিয়ে ফেলে। গণতান্ত্রিক উত্তরণ কেবল নির্বাচন দিয়ে হয় না। এটি হয় দায়িত্বশীল রাজনীতি ও দায়িত্বশীল মিডিয়ার মাধ্যমে। মিডিয়া যদি নিজের আয়নায় নিজেকে না দেখে, তাহলে প্রশ্ন থেকে যাবে– এ উত্তরণ কি আদৌ সম্ভব?

লেখক : অ্যাংকর, টকশো ‘আগামীর বাংলাদেশ’ বিটিভি