বাংলাদেশের ইতিহাসে বায়ান্নর ভাষা সংগ্রাম এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। এই সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল আলেম সমাজের। ওই সময় আলেমদের রাজনৈতিক সংগঠন জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের দাবি ছিল, ‘বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হোক।’ উত্তাল সেই সময় বক্তৃতা-বিবৃতিতে মাতৃভাষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য বোঝানোর চেষ্টা করতেন আলেমরা।
ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত কবে, কিভাবে, কাদের মাধ্যমে বা কোন নেতৃত্বে হয়েছিল, সেটি আজ অনেকেরই অজানা। অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে ভাষা আন্দোলনের জনক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিস’ ও এর মুখপত্র ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’-এর কথা। হারিয়ে গেছেন মওলানা আকরম খাঁ, মওলানা ভাসানী, মাওলানা তর্কবাগীশ, মাওলানা আতহার আলী, মাওলানা পাঁচবাগী ও মাওলানা ফরিদপুরীর মতো সংগ্রামীরা।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই বাংলার মুসলমানদের মাতৃভাষা বাংলা হবে কি উর্দু হবে, এ তর্ক খুব জোরালো হয়েছিল। নবাব আবদুর রহমান, স্যার আবদুর রহিম, মৌলভি ফজলুল হক, ডা: আবদুল্লাহ, সোহরাওয়ার্দী, মৌলভি আবুল কাসেমের মতো প্রভাবশালী নেতারা উর্দুকে বাঙালি মুসলমানের ‘মাতৃভাষা’ করার প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু এই চেষ্টায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল আলেম সমাজ। অন্যতম রাহবার মওলানা মুহাম্মদ আকরম খাঁ, মাওলানা আবদুল্লাহেল বাকী, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীরা উর্দু-বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এসব মনীষীর প্রয়াসে শক্তি জুগিয়েছিলেন ধনবাড়ীর জমিদার নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী।
মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের অনেকে আরবি হরফে বাংলা প্রচলনের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তবে বুদ্ধিজীবীদের বড় একটি অংশই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার জন্য ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ এবং ‘তমদ্দুন মজলিস’-এর ব্যানারে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিলেন।
প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ড. এ এস এম নুরুল হক ভূঁইয়া, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কাজী গোলাম মাহবুব, ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক সম্পাদক অধ্যাপক শাহেদ আলী, অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল গফুর, বিশিষ্ট দার্শনিক দেওয়ান মুহাম্মদ আজরফ, নেজামে ইসলাম পার্টির নেতা মৌলভি ফরিদ আহমদদের মতো ইসলামী ব্যক্তিত্বরা। এই আন্দোলন ছিল গণ-আন্দোলন। এতে ইসলামপন্থীরা ছাড়াও সাধারণের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক।
ভাষা আন্দোলনের শুরুর সময় থেকে চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি পর্বেই দেশের মূলধারার বেশির ভাগ আলেম-উলামা ও ইসলামী চিন্তাবিদ সোচ্চার ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখ করার মতো একজন হলেন মওলানা আকরম খাঁ (রহ:)। একজন সম্পাদক ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার মাধ্যমে বাংলা ভাষার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন তিনি। সরাসরি আন্দোলনের নেতৃত্বে না থাকলেও তার সংবাদপত্র ছিল আন্দোলনের অন্যতম মুখপত্র। তিনি ‘দৈনিক আজাদ’ ও ‘মাসিক মোহম্মদী’র প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক ছিলেন।
ভাষা আন্দোলনে প্রেরণার বাতিঘর ছিলেন মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (রহ:)। প্রতিবাদী কণ্ঠ ছিল মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ (রহ:)-এর। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদই ছিলেন না, ছিলেন সুবক্তা ও সুলেখক। মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ (রহ:) পাকিস্তান পার্লামেন্টে প্রথম বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দেন। বক্তৃতা শুরু করার পর গণপরিষদের অনেক সদস্য উপহাস করেন তাকে; কিন্তু তিনি বক্তৃতা থামাননি।
ভাষা আন্দোলনে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠস্বর মুজাহিদে আজম আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ:), মুফতি দ্বীন মুহাম্মদ খান রেহ:)। অবিভক্ত পাকিস্তানের উভয় অংশে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি উত্থাপনকারী প্রথম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মাওলানা আতহার আলী (রহ:)। ইতিহাসের দলিলে আছে, ১৯৫২ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ কিশোরগঞ্জের হয়বত নগরে পূর্ব পাকিস্তান জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের ঐতিহাসিক সম্মেলন হয়। এতে সব মহলের আলেম-ওলামা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। ১৮ মার্চ কাউন্সিল হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন মাওলানা আতহার আলী (রহ:)। এই কাউন্সিলের প্রথম অধিবেশনে গৃহীত চতুর্থ প্রস্তাবটি ছিল– ‘পূর্ব পাকিস্তান জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের এই সম্মেলন পাকিস্তান গণপরিষদের কাছে দৃঢ়তার সহিত দাবি জানাইতেছে যে, বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করা হউক।’
ভাষা আন্দোলনের অকুণ্ঠ সমর্থক খতিবে আজম মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ (রহ:)। তিনি নেজামে ইসলাম পার্টির নেতা হিসেবে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরোধিতা করেন। বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও মিছিলে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন।
ভাষা আন্দোলনের সমর্থক মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম (রহ:)। ইসলামী সাহিত্য ও পরিভাষা বিকাশের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তিনি।
আন্দোলনের অগ্রনায়ক ছিলেন মৌলভি ফরিদ আহমদ (রহ:)। ভাষার জন্য টানা দেড় মাস কারাবরণ করেছিলেন মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ:)। আন্দোলনের উত্তাল দিনে আলিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থীদের একটি মিছিলে আক্রমণ করে পুলিশ। সেখান থেকে গ্রেফতার হন মুহিউদ্দীন খান। তার বিষয়ে অধ্যাপক আব্দুল গফুর লিখেছেন, ‘তিনি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। এ লক্ষ্যেই তিনি ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংস্থা তমদ্দুন মজলিসের সাথে কাজ করেছেন। এককালে মজলিসের নিয়মিত আলোচনা সভা মাসিক মদীনার বাংলাবাজার অফিসে এবং পুরানা পল্টনে তার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হতো। তা ছাড়া তিনি দীর্ঘ দিন ধরে তমদ্দুন মজলিসের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা দান করেন।’
ভাষা আন্দোলনে অবদান ছিল মাওলানা ফজলুল হক নূরনগরী (রহ:), মাওলানা আবদুস সোবহান (রহ:)-এর। ছাত্রজীবন থেকে শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখতেন মাওলানা আহমেদুর রহমান আজমী
রহ.। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গঠনে এই ভাষাসংগ্রামী কাজ করে গেছেন।
ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল মাওলানা লোকমান আহমদ আমীমীর। তিনি মোহাম্মদপুর ঈদগাহ মাঠ জামে মসজিদের খতিব ছিলেন। তার অবদানের কথা ১৯৯০ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত অমর একুশে স্মারক গ্রন্থে উল্লেখ আছে।
ভাষার জন্য কাজ করেছেন মাওলানা ফয়জুর রহমান (রহ:), মাওলানা মুসা (রহ:), মাওলানা হাসান শরীফ (রহ:), মাওলানা মুস্তাফিজুর রহমান ৯রহ:০-এর মতো আলেমরা। উর্দুভিত্তিক রাষ্ট্রভাষা-নীতির বিরোধী ছিলেন মুফতি দ্বীন মোহাম্মদ খান। তিনি আরবি হরফে বাংলা প্রচলনের আন্দোলন ‘আঞ্জুমান হুরুফুল কুরআন, পূর্ব পাকিস্তান’-এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এতে তাকে নিয়ে কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়। পরে তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
ভাষা আন্দোলনে মাওলানা আবদুল্লাহেল বাকী (রহ)-এর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বগুড়ায় ‘আঞ্জুমান-এ-উলামা-এ-বাংলা’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ‘তমদ্দুন মজলিস’-এর সাথে যুক্ত থেকে ভাষা আন্দোলনের সূচনা ও সাংগঠনিক ভিত্তি গঠনে অবদান ছিল মাওলানা ফজলুল হক নূরনগরী (রহ:)-এর। তিনি ড. নূরুল হক ভূঁইয়া নামে পরিচিত। ১৯৪৭ সালের ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর আহ্বায়ক ছিলেন এবং ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জনমত তৈরিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি।
আলেম সমাজকে সংগঠিত করে ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলেন মাওলানা শামসুল হুদা পাঁচবাগী। ১৯৫২ সালে বিভিন্ন ইশতেহার প্রকাশ করেন তিনি। এগুলোতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুলে ধরেন।
ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আবদুস সোবহান (রহ:)-এর। ১৯৫১ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদানের পর এবং ১৯৫২ সালের ছাত্র আন্দোলনে তিনি পাবনা জেলায় ছাত্র-জনতাকে সংগঠিত করেন। তিনি ‘পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে তালাবা আরাবিয়া’-এর পাবনা জেলা সেক্রেটারি হিসেবে ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন ও আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
আন্দোলনে মাওলানা ফয়জুর রহমান (রহ:)-এর সরাসরি ও সক্রিয় ভূমিকা থাকলেও অন্যদের মতো তিনি ব্যাপকভাবে আলোচিত নন। তিনি নেজামে ইসলাম পার্টির সহসভাপতি ছিলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের হয়ে নির্বাচিত হন। ভাষা আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি।
আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনে কাজ করেন মাওলানা হাসান শরীফ (রহ:)। ভাষসৈনিকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন মাওলানা মুস্তাফিজুর রহমান (রহ:)। ভাষা সংগ্রামকে সমর্থন ও প্রচারে সক্রিয় ছিলেন তিনি।
রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার আন্দোলনে জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টিকে সক্রিয় করে তোলার পেছনে সিলেটের কৃতিসন্তান মাওলানা সৈয়দ মুছলেহ উদ্দীন (রহ:)-এর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। অন্যান্য প্রগতিশীল আলেম যেমন– মাওলানা আতহার আলী (রহ:)-এর সাথে তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন। আলেমরা যাতে উর্দুপন্থী না হন; বরং বাংলার পক্ষে দাঁড়ান, সে জন্য মাওলানা সৈয়দ মুসলেহ উদ্দিন (রহ:) গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
আলেম-ওলামা ছাড়াও ভাষা আন্দোলনে ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে যারা ভূমিকা রেখেছেন তাদের মধ্যে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ভূমিকা ছিল অগ্রণী। আন্দোলনের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। প্রতিবাদী কণ্ঠ ছিলেন মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ, রাজনীতিবিদ ও ইসলামী চিন্তাবিদ অধ্যাপক গোলাম আযম (রহ:), অধ্যাপক শাহেদ আলী (রহ:), দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক ও ইসলামী চিন্তাবিদ প্রিন্সিপাল আশরাফ ফারুকী (রহ:), ইসলামী চিন্তাবিদ শামসুল হক (রহ:), চিন্তাবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল গফুর প্রমুখ।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক,
শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ



