এ কে এম রেজাউল করিম খন্দকার
সমাজে শৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার রক্ষার প্রধান হাতিয়ার হলো আইন। রাষ্ট্র তার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বাস্তবতার আলোকে দণ্ডবিধি প্রণয়ন করে। বাংলাদেশে প্রচলিত দণ্ডবিধি মূলত ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত আইন। অন্যদিকে, ইসলামী দণ্ডবিধি কুরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াসের উপর ভিত্তি করে গঠিত। এই লেখায় বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ও ইসলামী দণ্ডবিধির ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। দুই বিধির মিল-অমিল, কল্যাণকর দিক ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও আলোচনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি কী?
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি বলতে মূলত ‘দণ্ডবিধি-১৮৬০’ (Penal Code-1860)-কে বোঝানো হয়। ব্রিটিশ শাসনের সময় এই বিধি করা হয়। সেটি এখনো বাংলাদেশে কার্যকর আছে। এতে অপরাধের সংজ্ঞা, অপরাধের উপাদান ও অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান নির্ধারিত। এখানে শাস্তির ধরন হিসেবে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডসহ আরো কিছু দণ্ড রয়েছে।
ইসলামী দণ্ডবিধি কী?
কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের আলোকে ইসলামী দণ্ডবিধি গঠিত। এই আইনব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, অপরাধ প্রতিরোধ এবং মানুষের জান, মাল ও ইজ্জতের হিফাজত করা। ইসলামী দণ্ডবিধিতে শাস্তিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়- হুদুদ, কিসাস ও দিয়াত এবং তাজির।
পার্থক্য কী কী?
বাংলাদেশ দণ্ডবিধির উৎস মানুষের তৈরি আইন। আর ইসলামী দণ্ডবিধির উৎস ঐশী বিধান। বাংলাদেশ দণ্ডবিধিতে শাস্তিমূলত দমনমূলক ও সংশোধনমূলক। অন্যদিকে, ইসলামী দণ্ডবিধিতে শাস্তি হলো ন্যায়বিচার, প্রতিরোধ ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যম।
ইসলামী বিধিতে কিসাসের ক্ষেত্রে ক্ষমা ও দিয়াতের সুযোগ আছে। বাংলাদেশ বিধিতে সেটি সীমিত। ইসলামী বিধিতে নৈতিকতা ও আখিরাতের জবাবদিহিতা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ দণ্ডবিধিতে সেটি অনুপস্থিত।
কোথায় কোথায় মিল?
হত্যা, চুরি, ডাকাতি, প্রতারণার মতো অপরাধ উভয় দণ্ডবিধিতেই অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত। সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমন, উভয়ের মূল লক্ষ্য। নিরপরাধ ব্যক্তিকে শাস্তি না দেয়ার নীতি দুই ব্যবস্থাতেই আছে।
কোন বিধিতে কল্যাণ বেশি?
মানুষের জন্য বেশি কল্যাণকর হলো ইসলামী দণ্ডবিধি। কারণ, এই বিধি একই সাথে ন্যায়বিচার ও মানবিকতার ভারসাম্য রক্ষা করে। অপরাধের শাস্তির পাশাপাশি ক্ষমা ও পুনর্বাসনের সুযোগ দেয়। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ- সব স্তরে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে।
তবে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই বিধির সময়োপযোগী ব্যাখ্যা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি প্রয়োজন।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধিকে ইসলামী দণ্ডবিধিতে রূপান্তরে যা যা করা যেতে পারে
আইন প্রণয়নে কুরআন ও সুন্নাহর নীতিকে অন্তর্ভুক্ত করা। কিসাস ও দিয়াতের বিধান যোগ করা। বিচারব্যবস্থায় নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা জোরদার করা। বিচারকদের জন্য ইসলামী আইন বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা। সেই সাথে ধাপে ধাপে ও গণসম্মতির মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়ন করা।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ও ইসলামী দণ্ডবিধি- উভয়ের লক্ষ্য সমাজে ন্যায়বিচার ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। তবে ইসলামী দণ্ডবিধি নৈতিকতা, মানবিকতা ও আধ্যাত্মিক কল্যাণের সমন্বয়ে একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা উপস্থাপন করে।
বাংলাদেশের আইনব্যবস্থা আরো ন্যায়সঙ্গত ও কল্যাণমুখী করতে সময়োপযোগী গবেষণা ও গণ-আলোচনা করা যেতে পারে। এসবের মাধ্যমে সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে থেকেই সংস্কার আনা সম্ভব।
লেখক : ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল



