এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান
মাটির সাথে তাদের সম্পর্ক নিবিড়। দেশের মাঠের আসল নায়ক মানেই কৃষক। অর্থনীতির প্রাণভোমরাদের জীবনচক্রে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে পহেলা বৈশাখ। এই উৎসবের সাথে কৃষক যেন বাঁধা এক সুতোয়। অনেক আগে থেকেই নতুন কৃষি বছরের সূচনাও মনে করা হয় পহেলা বৈশাখকে। সারাবছর রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হাড়ভাঙা উদয়াস্ত পরিশ্রম করে ফসল ফলানো কৃষকের জীবনের আনন্দময় এই মুহূর্তটিতে এবার আরো রাঙিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধান দেশের অর্থনীতির খুঁটি হিসেবে বিবেচিত কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তনের লক্ষ্যে একটি মৌলিক ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিয়েছেন। কৃষককেন্দ্রিক কৃষিব্যবস্থায় স্বনির্ভর করতে চান তাদের। আরো মজবুত করতে চান দেশের অর্থনীতির ভিত্তি। ইতোমধ্যেই তার সরকার নতুন বাংলা বছর ১৪৩৩-কে দেশের কৃষক সমাজ ও কৃষি অর্থনীতিকে উৎসর্গ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় রয়েছে কৃষকবান্ধব নানা উদ্যোগ। ক্ষমতায় এসেই প্রথমেই দেশের ১২ লাখ কৃষকের সুদসহ ১০ হাজার টাকা কৃষি ঋণ মওকুফ করেছিলেন। যার মাধ্যমে মোটা দাগে কৃষকের পাশে থাকার অঙ্গীকারকে করেছিলেন সুদৃঢ়। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শিরোনামে নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি কৃষি খাতের মৌলিক রূপান্তরের জন্য অঙ্গীকার করেছিল। নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে ‘কৃষক কার্ড’ ঘোষণা দিয়েছিলেন তারেক রহমান। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের পর এবার নির্বাচনী ইশতেহারে অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ‘কৃষক কার্ড’ কৃষকের হাতে সরাসরি তুলে দিয়ে স্বীকৃতি নিশ্চয়তার পাশাপাশি সম্মানিত ও গর্বিতও করলেন প্রধানমন্ত্রী।
এই কার্ডেই প্রান্তিক চাষিদের সহজে কৃষি প্রণোদনা, ঋণ ও ভর্তুকি দেবে সরকার। হাসি-কান্নার হিসাব চুকিয়ে এ যেন কৃষি অর্থনীতির নতুন দিনের সূচনা। প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিনের মতে- ‘কৃষিখাতকে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যেই এই কৃষক কার্ড। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো কৃষকদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা।’
বাঙালির সর্বজনীন উৎসব পহেলা বৈশাখে মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) দুপুরে টাঙ্গাইলে শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে প্রধান অতিথি হিসেবে কৃষক কার্ড বিতরণ ও প্রি-পাইলটিং কার্যক্রমের উদ্বোধনের পর ১৫ জন কৃষকের হাতে কৃষক কার্ড ও গাছের চারা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কৃষক, জেলে, প্রাণিসম্পদ খামারি ও দুধ উৎপাদকদের জন্য এই সমন্বিত ডিজিটাল স্মার্ট কার্ড ব্যবস্থার আওতায় ধাপে ধাপে আসবেন ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষক। এজন্য চার বছরে খরচ হবে প্রায় ৬৮১ কোটি টাকা। এদিন অনুষ্ঠান মঞ্চে সরকারপ্রধান ল্যাপটপে বাটন প্রেস করা মাত্রই টাঙ্গাইল সদরসহ দেশের ১১ উপজেলার ২২ হাজার ৬৫ জন প্রান্তিক কৃষকের মোবাইলে আড়াই হাজার টাকা করে পৌঁছে যায়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘কৃষকরা যদি বেঁচে থাকে, দেশের মানুষ ভালো থাকতে পারবে। বর্তমান সরকারের লক্ষ্যই হচ্ছে কৃষককে আত্মনির্ভরশীল ও সচ্ছল হিসেবে গড়ে তোলা। সেজন্য আমরা কৃষক কার্ড দিয়েছি। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে আমরা কৃষকদের সরাসরি ১০ সুবিধা পৌঁছে দিতে পারবো।’ ভোটের চিহ্ন মুছে যাওয়ার আগেই কৃষককে দেয়া ওয়াদা রক্ষার মাধ্যমে সরকারের প্রশ্নাতীত আন্তরিকতারও জানান দিলেন। গাছের চারা বিতরণের সময় রসিকতা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আর যারা আম গাছ পেয়েছে, জাম গাছ পেয়েছে তাদেরকে আমি বলেছি, আম যখন ধরবে, জাম যখন ধরবে, আমি খাবো, আমাকে পাঠাবেন, আপনারাও খেয়াল রাখবেন।’
কৃষাণ-কৃষাণীরা নানা রঙের পোশাক পরে এসেছিলেন স্থানীয় শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে। নববর্ষের দিনে প্রধানমন্ত্রীর সান্নিধ্যে আসার পাশাপাশি তার হাত থেকেই পেয়েছেন নিজেদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রতীক উপহার ‘কৃষক কার্ড’। আবহমান বাংলার কৃষকের ঐতিহ্য মাথায় ‘মাথাল’ ও গলায় ‘গামছা’ জড়িয়ে তারা অতিথি সারিতে সামনের আসনে বসেছিলেন। কৃষি কাজে কৃষকের অপরিহার্য এসব পোশাকেই মঞ্চে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে কার্ডও নিয়ে এসেছেন। টাঙ্গাইলের প্রথম কৃষক হিসেবে ‘কৃষক কার্ড’ পেয়ে উচ্ছ্বসিত সদর উপজেলার বড়রিয়া গ্রামের মোহাম্মদ আবু কায়সার। তিনি বলেছেন, ‘শহীদ জিয়া খাল কেটে মানুষের মন জয় করেছিলেন। তার সন্তান তারেক রহমান কৃষক কার্ড দিয়ে কৃষকের মন জয় করেছেন।এখন আমরা এদেশের একজন গর্বিত কৃষক হিসেবে পরিচয় পেয়েছি।’
কৃষির সাথে দীর্ঘ সময় যুক্ত থেকেও কোনো স্বীকৃতি ছিল না টাঙ্গাইল সদরের ঘারিন্দা ইউনিয়নের সুরুজ গ্রামের কৃষাণী নাসিমা খানম সুমনার। কৃষক কার্ড পেয়ে খুশি এই কৃষাণী বলেন, ‘বিএনপির সরকার আমাদের স্বার্থে কাজ করবে, এটা শুরুতেই ধারনা ছিলো। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে কৃষক কার্ড পাবো তা কখনো কল্পনাও করিনি। আজ অসম্ভব সম্ভব হয়েছে।’
সরকার মনে করে, দেশের ১৮ কোটি মানুষের মুখে যারা খাবার তুলে দেয় সেই কৃষকের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ সরকারের একটি স্মার্ট কৌশল। এর মাধ্যমে সনাতনী কৃষি পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক, যুগোপযোগী ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি বিপ্লব ঘটাতে চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ‘কৃষক কার্ড’ মূলত তার ‘ব্রেইন চাইল্ড।’ কৃষকের ন্যায্যঅধিকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে আত্মনির্ভর এই রূপান্তরে গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় এই কর্মসূচি মডেল হয়ে উঠবে বলে মনে করেন অনেকেই।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) টাঙ্গাইলে শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘এই কার্ডের মূল চিন্তা ছিল তারেক রহমানের, যা কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করবে এবং আগামী দিনে কৃষিকে একটি সম্মানের পেশায় রূপান্তর করবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খাল খনন ও সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে কৃষি বিপ্লব এনেছিলেন। খালেদা জিয়া প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কৃষি ঋণ মওকুফ ও সারে ভর্তুকি দিয়েছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের এই ‘কৃষি কার্ড’ উদ্যোগ কৃষকদের সার, বীজ ও ঋণের ঝামেলা থেকে মুক্তি দেবে। এই কার্ডে জমির পরিমাণ ও ধরন সংরক্ষিত থাকায় ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ নেয়া সহজ হবে এবং ভুয়া ঋণের জালিয়াতি বন্ধ হবে।’
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনও এক বিশেষ বার্তায় কৃষিপ্রধান অর্থনীতির ওপর বর্তমান সরকারের বিশেষ গুরুত্বারোপের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। কৃষকদের অনন্য অবদান ও আত্মত্যাগের প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের অংশ হিসেবেই এবারের নববর্ষটি তাদের জন্য নিবেদিত উল্লেখ করে মন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, ‘কৃষকদের সম্মান ও অবদানকে স্বীকৃতি দিতে সরকার নতুন বাংলা বছর ১৪৩৩-কে দেশের কৃষক সমাজ ও কৃষি অর্থনীতিকে উৎসর্গ করছে।’
কৃষক কার্ডকে কৃষকের অধিকারের দলিল ও সমৃদ্ধির সোপান বলে মনে করে সরকার। কৃষক কার্ডের আওতায় প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকরা অন্তত ১০ ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাবেন। ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রাপ্তি, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, মোবাইল ফোনে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও বাজার তথ্য, কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ, ফসলের রোগ-বালাই দমনের পরামর্শ, কৃষি বিমা সুবিধা এবং ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের সুবিধা পাবেন কৃষকরা। এটি তাদের জীবন ও জীবিকার উন্নয়নেও রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কৃষক কার্ড কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকদের একটি ডাটাবেজ তৈরি এবং সরাসরি সরকারি প্রণোদনা ও সহায়তা পৌঁছানো সহজ হবে বলে আশা করছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘কৃষক কার্ড বিতরণ তিন ধাপে বাস্তবায়িত হবে। এগুলো হলো- প্রাক পাইলটিং, পাইলটিং এবং দেশব্যাপী কার্যক্রম। প্রাক পাইলটিং পর্যায়ে ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি ব্লকে ফসল উৎপাদনকারী কৃষকের পাশাপাশি মৎস্যচাষি বা আহরণকারী, প্রাণিসম্পদ খাতে নিয়োজিত খামারি ও দগ্ধ খামারিসহ ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় শ্রেণির কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে লবণচাষিও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।’
লেখক : পেশাদার গণমাধ্যমকর্মী, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]



