মেশকাত সাদিক
আজ মহান স্বাধীনতা দিবস। গতকাল ছিলো ২৫-এর কালো রাত। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর গণহত্যা। নিরীহ-নিরাপরাধ বাঙালির ওপর এদিন পাকিস্তানি বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ১৯৭১ সালের এই ভয়াবহ রাতে কতো মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল তা সঠিকভাবে কোনো ইতিহাসবিদ-ই লেখেননি। বস্তুত বাংলাদেশের বস্তুনিষ্ট ইতিহাস পাওয়া খুবই দুরূহ। শুধু বদরুদ্দীন ওমর-ই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ইতিহাস লিখেছেন। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, শুধু ২৫ মার্চ রাতেই ঢাকায় কয়েক হাজার মানুষ হত্যা করা হয়। কেউ কেউ মনে করেন, ২৫ মার্চ রাতেই নিহতের সংখ্যা ‘কয়েক হাজার থেকে প্রায় ১০ হাজার বা তার বেশি’- এমন অনুমান করা হয়, তবে সঠিক সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়। কিন্তু সবাইকে মনে রাখতে হবে একজন মানুষের জীবনের দামও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
যদিও বাংলাদেশ বা এই উপমহাদেশের মানুষের জীবনের দাম কম। আরো স্পষ্ট করে বললে, সারা পৃথিবীব্যাপী মুসলমানের জীবনের দাম নেই। যাক সে কথা। মূল কথা হলো, ব্রিটিশ আমল থেকে বার বার দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে উপমহদেশের মানুষ মরেছে লাখে লাখে। আমাদের বাংলাদেশও মানুষ হত্যার বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে বার বার।
রোগ-শোক, মহামারী, গণহত্যা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, ভূমিকম্প, অগ্নি-লঞ্চ দুর্ঘটনা প্রভৃতির কবলে পড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ এখানে প্রাণ হারায়। সড়ক দুর্ঘটনাতো আরো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এ পর্যন্ত দেশ স্বাধীনের পর থেকে বিভিন্ন দুর্ঘটনার শিকার হয়ে লাখ লাখ মানুষ মনে হয় নিহত হয়েছে। যদিও ১৯৭১ সালের ২৫ তারিখের রাত পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, এটির সাথে কোনো কিছুর তুলনা সমীচীন নয়, তবুও নিহতের সংখ্যা হিসেবে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় যে পরিমাণ মানুষ নিহত হয়, তা ২৫ তারিখের ভয়াবহতাকেও হার মানায়।
গত ২০১৯-২০২৫ পর্যন্ত মোট মৃত্যু প্রায় ৩৫,৩৮৪ জন। প্রতিবছর গড়ে ৬,০০০-৯,০০০ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে। গত ২০১৯ সালে প্রায় ৭,৮০০ জন, ২০২০ সালে প্রায় ৫,৪০০ জন, ২০২১ সালে প্রায় ৬,২০০ জন, ২০২২ প্রায় ৯,৯০০ জন। ২০২৩ সালে প্রায় ৭,৯০০ জন। ২০২৪ সালে প্রায় ৭,২০০ জন। এবং ২০২৫ সালে ৭,৩৫৯ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০-৬০০টির মতো দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে এখনো পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ১৫০০-২০০০ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। ২০২৬ সালের ঈদযাত্রা ছিলো ভয়াবহতম। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী- প্রায় ৩১৫টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এতে প্রায় ৩২২ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা যায়।
ঈদে এতো মৃত্যু দায় কার?
রাষ্ট্রের যে কোনো মৃত্যুর জন্য সরকারকে প্রথম দায়ী করা হয়। বাস্তবতাও তাই। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এসব দুর্ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী থাকে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে গতকাল দৌলতদিয়াতে যে একটি যাত্রীবাহী বাস ফেরিতে ওঠার সময়ে পদ্মার পানিতে ডুবে গেলো, এখানে সরকারের দায় কী? কারণ প্রশ্ন হলো সরকারের কোন প্রতিষ্ঠান গিয়ে গাড়ির চালককে টেনে ধরবে? অথবা গাড়িকে টেনে ধরবে? এর সহজ উত্তর হলো কেউ না। তাহলে কি এমন দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে? এবার উত্তর হলো, না। এখানে কিছু বিষয় জানা প্রয়োজন। তা হলো, ফেরীতে যখন গাড়ি ওঠে তখন নদীর সাইডে শক্ত পাটাতনের নিরাপত্তা বেষ্টনী রাখা যেত। সরকার তো প্রতিটি দফতরেই প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা বাজেট দেয়। নিশ্চয়ই নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দফতরেও বাজেট দিয়ে থাকে। সেই বাজেট যথাযথভাবে খরচ করলেই প্রতিটি পন্টুনের ফাঁকা জায়গায় পানির সাইডে সুন্দর সুন্দর শক্তিশালী নিরাপত্তা পাটাতন দেয়া যায়। যে পাটাতন হবে শক্ত স্টেইনলেস স্টিলের। এবং সেই প্রতিরক্ষা স্লাইড বিজ্ঞাপনের জন্যও ভাড়া দেয়া যায়। এই যে বাজেট সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য ইনোভেটিভ আইডিয়া বের করা হচ্ছে না। এটাই সরকারের দায়। এই সামান্য কাজ সরকারের জন্য বিশেষ কঠিন কিছু নয়।
এরপর অন্যান্য সড়ক দুর্ঘটনার কথা বলা যাক। যেমন রেলওয়ে ক্রসিং, লঞ্চ, অগ্নি এবং অন্যান্য সড়ক দুর্ঘটনা। সবক্ষেত্রেই সরকারের দায় রয়েছে। অধিকাংশ সময়েই দেখা যায় রাস্তার বাঁকে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে রাস্তা যথেষ্ট প্রশস্ত না থাকা। এবং সড়ক বিভাজন না থাকা। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সড়ক মন্ত্রী সারাদেশের হাইওয়েতে সকল সড়কে রোড ডিভাইডার বা সড়ক বিভাজন দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকতে পারেন। এর জন্য বেশি অর্থ প্রয়োজন হবে না। শুধু সড়ক বিভাগ এক বছরে যে পরিমাণ দুর্নীতি করে এটা বন্ধ করলেই সেই অর্থে এটি করা সম্ভব। আর এখনই যদি সম্ভব না হয়, তাহলে সারাদেশের হাইওয়েতে যত স্থানে বাঁক রয়েছে সকল বাঁকে যত দ্রুত সম্ভব রোড ডিভাইডার স্থাপন করে, পরে ধাপে ধাপে সারাদেশে ডিভাইডার স্থাপন করা যেতে পারে।
এরপর আসে গাড়ির ফিটনেস ও চালকের দক্ষতা ও ডোপটেস্টের বিষয়। এখানেও সরকারের দায় রয়েছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি কোনোক্রমেই যাতে চালাতে না পারে সেই বিষয়ে শূন্যসহনীলতার শক্তনীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। অনেক চালক রাস্তায় চালাতে চালাতে চালক হন। এই বিষয়টি দুর্ঘটনার সংখ্যাকে বৃদ্ধিই করছে না শুধু; সাথে সাথে হাজার হাজার নিরীহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। ডোপ টেস্ট অত্যন্ত ইতিবাচক হলেও এর অনুপুঙ্খ বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না, বিআরটিএ-এর দুর্নীতির কারণে। ডোপটেস্টে আসামি হিসেবে চিহ্নিত হলেও নকল প্রমাণক বানিয়ে মাতালদের লাইসেন্স দেয়ার অভিযোগ সচারচর প্রায়শই শোনা যায়। এসব দুর্নীতি ও সীমাহীন অব্যবস্থাপনা বন্ধ করা সরকারের জন্য কুন-ফায়াকুনের মতো না হলেও কাছাকাছি সহজ কাজ বলা যায়।
নাগরিক দায়
জাতি হিসেবে আমরা অতিশয় আবেগপ্রবণ। আমরা ভালোবাসার সীমা নির্ধারণে ব্যর্থ একটি জাতি। আমরা নিরাপত্তার চেয়ে আবেগকে বেশি প্রাধ্যান্য দিই। আমরা ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা না জেনে অপব্যাখ্যায় জীবন গড়ে তুলি। যেমন- ঈদ আসলেই শুধু প্রিয়জনদের সাথে সাক্ষাতে যেতে হবে। না গেলে গোনাহ হবে। এই ধারণাই সঠিক নয়। অন্তত আমাদের দেশে তো একেবারেই নয়। কারণ যে দেশে ঈদকে লক্ষ্য করে, দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, সুদ-ঘুষ, দুর্নীতি বেড়ে যায়, পদে পদে অব্যবস্থাপনা ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঈদ যাত্রা করতে হয়, সেখানে মুভ করাটাই পাপ কিনা তা বিজ্ঞ আলেমগণ বলতে পারবেন। একশ্রেণীর মানুষ মনে করেন, যার যেখানে মৃত্যু তা হবেই। এটিও কি সঠিক আকিদা? বিজ্ঞ আলেমগণ বলতে পারবেন। তবে নিজের নিরাপত্তা বিবেচনা করে যাত্রা করার বিষয়ে ইসলাম ধর্মের প্রধান দুই গ্রন্থে নিশ্চয়ই চমৎকার আলোচনা আছে।
এই যে লঞ্চে উঠতে গিয়ে ঝুলে থাকা বা ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করতে গিয়ে অপরিচিত নারীর সংবেদনশীল পশ্চাতদেশ ধরে বেগানা পুরুষ ঠেলে উঠিয়ে দিচ্ছেন, বা লঞ্চে উঠতে গিয়ে যে নারী ব্যর্থ হচ্ছেন বা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছেন, তখন অপরিচিত পুরুষ তার শরীর ধরে উঠিয়ে নিচ্ছেন বা চরম ভিড়বহুল পাবলিক বাসের হেলফার নারীকে উঠিয়ে নিয়ে পিঠে হাত ঘসে দিচ্ছেন এর কোনটি ইসলাম সমর্থন করে? এই যে ঈদ যাত্রার জন্য প্রাণহানী, অশ্লীলতার খপ্পরে পড়া বা শারীরিক নিগ্রহের শিকার হওয়া, এর কোনটি ইসলামসম্মত? যদি এমনভাবে বাড়িতে ফেরা ইসলামসম্মত না হয়, তাহলে ঈদ যাত্রায় নানাবিধ অব্যবস্থপনার শিকার হওয়ার ও মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাড়ির দিকে রওনা করা ইসলামসম্মত হতে পারে না। বিজ্ঞ শায়েকগণের কারো নজরে আমার লেখাটি পড়লে অনুরোধ করবো এ বিষয়ে একটি সবিস্তার আলোচনা করে ফতোয়া দিতে। কারণ একটি দুর্ঘটনার পরে, তার আফটার ম্যাথ আরো ভয়ঙ্কর। দুর্ঘটনার শিকার যারা মারা যান, আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদের উত্তম প্রতিদান দেবেন। কিন্তু যারা আহত বা পঙ্গুও হন তাদের জীবন হয় জীবন্মৃত হওয়ার মতো। অনেকেরই আর চাকরি থাকে না। চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পেরে অনেকেই ভিক্ষার মতো নিম্নতম হালাল কাজে নিয়োজিত হন। আর শুধুমাত্র যেসব শিশু বেঁচে থাকে, তারা সুস্থ থাকলেও তাদের জীবন হয় বিভীষিকাময়। পিতৃমাতৃহীন এই ছেলে শিশুরা দেখা যায় পৈতৃক সম্পত্তি থেকেও হন বঞ্চিত। বঞ্চিত হতে হতে এক সময় অপরাধ জগতে ঠিকানা গড়ে। আর কন্যা শিশুদের অবস্থা হয় আরো সাংঘাতিক। সমাজের মোড়ে মোড়ে ওঁৎ পেতে থাকা পুরুষের লালসার শিকার হতে হতে অনেকেই নিষিদ্ধ পল্লীতে যেতে বাধ্য হয়। এখন ঈদের খুশিতে যদি জীবন হয় নজিরবিহীন বেদনাময় তাহলে ঈদ যাত্রা কেন?
ওই যে আমরা আবেগপ্রবণ ও গীবতধর্মী জাতি। তাই আমাদের পিতামাতা বার বার চান সন্তানেরা ঈদে ঘরে ফিরুক। যদিও ঈদের ১০ দিন আগেই বাড়ি থেকে ফিরেছে তারপরও। এই যে বিবেকহীন বাতুল ও বাতিল আবেদন নিবেদন, যার কারণে সন্তানেরা নিজেদের সুখ ও নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়েই ঈদের মৃত্যুকূপে গিয়ে পড়েন। পিতামাতা তখন হাউমাউ করে কাঁদেন আর ভাবেন, কেন যে সন্তানকে আসতে বলেছিলাম? কিন্তু এই প্রশ্নটি মৃত্যুর আগে হলে কতোই না ভালো হতো। আবার এক শ্রেণীর বাল্যবন্ধু আছে। তাহারা ভুলেও ফোন করে বা ফেসবুকের ভালো স্ট্যাটাসেও কোনো মন্তব্য করবে না। কিন্তু বাড়িতে গিয়ে সাক্ষাত না করলে গীবত করতে করতে দিগ্বিজয়ী হবে। এলাকায় প্রধান কাজই এদের নিন্দা করা। মিথ্যা ছড়ানো। এবং ব্যাপকভাবে অপপ্রচার চালানো। সুতরাং কিছু ভদ্রলোক বাধ্য হয়ে ঈদের ছুটিতে বাড়ি যান। আবার নাগরিকদের মাঝে কিছু কিছু মানুষ রয়েছে যারা হ্যাডাম দেখাতে পছন্দ করেন। তারা ঢাকা বা অন্যান্য শহরে যেমন চাকরিই করুক না কেন? এলাকায় গিয়ে কিছু কাঁচা টাকা ছড়াবেন এবং নাম কামাবেন। মানুষও তাদের প্রশংসায় শতমুখ। এসব বিবিধ কারণে ঈদযাত্রায় হয় মারাত্মক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্ঘটনা। অতএব, প্রয়োজন সচেতনতা। আবেগ নয়, বিবেক দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এই ক্ষেত্রে সরকারসহ সাধারণ নাগরিকদের রয়েছে ব্যাপক দায়। না হলে ২৫-এর রাতে গণহত্যা, মহান মুক্তিযুদ্ধে লাখ প্রাণ বিসর্জন, ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের গণহত্যা ও গুম-খুনকে পেছনে ফেলে খুব দ্রুতই সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা সবকিছুকে ছাড়িয়ে যাবে।
লেখক: রজনীতি বিশ্লেষক ও কবি



