পবিত্র রমজানের শেষ শুক্রবার মুসলিম উম্মাহর কাছে ‘জুমাতুল বিদা’ নামে পরিচিত। বিশ্বের মুসলিমরা ইবাদত-বন্দেগি ও জিকির-আসকারের মাধ্যমে দিবসটি পালন করে মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা ও রহমত কামনা করে থাকেন।
মুসলিম উম্মাহর কাছে মাহে রমজানের প্রতিটি দিনই পবিত্র ও মহিমামণ্ডিত। আর শুক্রবার তথা জুমার দিনটি সাপ্তাহিক ইবাদতের দিন এবং গরিবের ঈদ হিসেবে গণ্য। এ দিনের ফজিলত এমনিতেই বেশি। আর সেটি যখন রমজানের শেষ দশকে তথা জুমাতুল বিদা হয়, তখন রোজাদারসহ মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেকের কাছেই তা বিশেষভাবে সম্মানিত, মহিমাময় ও পবিত্রতম বলে প্রতীয়মান হয়।
ইসলামের প্রাথমিক যুগেও জুমার প্রচলন ছিল। সে সময় জুমার দিনকে ‘ইয়াওমে আরুবা’ বলা হতো। যা ইহুদি, খ্রিষ্টান তথা জাহেলি সম্প্রদায়ের লোকেরা পালন করত। তারা জুমার দিনে গল্প-গুজব, হাসি-ঠাট্টা, আমোদ-প্রমোদের আসর বসাত। এই ছিল তাদের জুমার সংস্কৃতি।
‘জুমআ’ শব্দটি আরবি, যার অর্থ হচ্ছে একত্রিত হওয়া, দলবদ্ধ হওয়া, সমবেত হওয়া ইত্যাদি। পবিত্র কুরআনুল কারিমে এই দিনটিকে ‘ইয়াওমুল জুমআ’ নামে নামকরণ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা: মদিনায় হিজরতের পর এই দিনটিকে জুমার দিন নামকরণ করেন এবং মদিনায় যাওয়ার পথে কুবা নামক স্থানে জুমার নামাজ আদায় করেন। পবিত্র জুমার দিনটি সপ্তাহের অন্যান্য দিনের মধ্যে অধিক ফজিলতপূর্ণ। আর রমজান মাসের শেষ জুমার নামাজের আলাদা ফজিলত ও মর্যাদা তো রয়েছেই।
পবিত্র কুরআনে জুমার নামাজ আদায়ের নির্দেশ প্রদান করে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন ‘হে মুমিনরা! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ করো। এটিই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা উপলব্ধি করো।’ (সূরা আল জুমুআ-৯)
জুমার নামাজ সম্পর্কে হজরত সামুরাহ রা: থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘তোমরা জুমার নামাজে উপস্থিত হও এবং ইমামের নিকটবর্তী হয়ে দাঁড়াও। কেননা, যে ব্যক্তি জুমার নামাজে সবার পেছনে উপস্থিত হবে জান্নাতে প্রবেশের ক্ষেত্রেও সে সবার পেছনেই পড়ে থাকবে।’ (মুসনাদে আহমাদ)
রাসূলুল্লাহ সা: আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পরপর তিনটি জুমা বিনা ওজরে ও ইচ্ছা করে ছেড়ে দেবে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার অন্তরে মোহর মেরে দেবেন।’ (সুনানে আবু দাউদ)
হজরত ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, যে ব্যক্তি পরপর তিনটি জুমা পরিত্যাগ করবে, সে ইসলামকে পেছনের দিকে নিক্ষেপ করল।’ (মুসলিম)
জুমার দিনে মুমিন-মুসলমানদের ঈমানি সম্মিলন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এ দিনের তাৎপর্য বর্ণনা করে হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করা হয়, রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘যেসব দিবসে সূর্য উদিত হয় তার মধ্যে উত্তম দিবস হচ্ছে জুমা, সে দিন আদম আ:-কে সৃষ্টি করা হয়েছে। একই দিনে তিনি জান্নাতে প্রবেশ করেন। আবার পৃথিবীতে আগমন করেন। এ দিনেই তিনি ইন্তেকাল করেন। এ শুক্রবারেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। এ পুণ্য দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন আল্লাহর দরবারে দোয়া কবুল হয়।’ (জামে তিরমিজি-৪৯১, সুনানে আবু দাউদ-১০৪৬)
হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, যখন তোমাদের মধ্যে রমজান আসে তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় ও জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।’ (মুসলিম-১০৭৯)
হজরত আওস ইবনে আওস আস সাকাফি রা: থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিনে ভালোভাবে গোসল করবে, আগে আগে হেঁটে মসজিদে গমন করবে এবং ইমামের কাছাকাছি বসে খুতবা মনোযোগ সহকারে শুনবে আর কোনো রকম অনর্থক কাজ করবে না তাকে তার প্রতিটি কদমের বিনিময়ে লাগাতার এক বছর নামাজ ও রোজার সওয়াব দান করা হবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ-১০৮৭)
হজরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সা: বলতেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা-৮৬৬০)
ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, রমজান মাসের শেষ শুক্রবার মহান আল্লাহর নবী হজরত দাউদ আ:-এর পুত্র হজরত সুলাইমান আ: জেরুসালেম নগরী প্রতিষ্ঠা করেন এবং মহান আল্লাহর মহিমা তুলে ধরতে সেখানে পুনর্নির্মাণ করেন মুসলমানদের প্রথম কিবলা ‘মসজিদুল আকসা’। এ জন্য প্রতি বছর সারা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে রমজান মাসের শেষ শুক্রবার ‘আল-কুদস’ দিবস হিসেবেও পরিচিত।
ইসলামের সূচনাকালে মদিনায় যখন রমজান মাসের সিয়ামের হুকুম-সংক্রান্ত আয়াত নাজিল হয়, তখন থেকেই প্রতি বছর রমজান মাসের জুমাতুল বিদা মুসলিম জাহানের দেশে দেশে শহর-গঞ্জ-গ্রামের মসজিদে মসজিদে জোর তাগিদ দিয়েই প্রতিপালিত হয়। যেমনভাবে সাপ্তাহিক জুমার নামাজ মুসলমানদের বৃহত্তর জামাতে অনুষ্ঠিত হয়, তেমনি রমজান মাসের জুমাবার আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতময়।
জুমাতুল বিদাসহ মাহে রমজানের প্রতি জুমাবারে ইবাদত-বন্দেগিতে অধিকতর সওয়াব লাভের সুবর্ণ সুযোগ থাকে। রমজান মাসের শেষ শুক্রবার সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা একটি মাস ত্যাগতিতিক্ষার সাথে সিয়াম সাধনার পর এ দিনটিতে জুমার নামাজ আদায় করে মাহে রমজানকে বিদায় সম্ভাষণ জানায়। রমজান মাসের সর্বোত্তম রাত হলো লাইলাতুল কদর, আর সর্বোত্তম দিনটি হলো জুমাতুল বিদা।
মাহে রমজানের বিদায়ী শুক্রবার ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য অতি মূল্যবান। জুমাতুল বিদা রমজান মাস শেষ হয়ে যাওয়ার সতর্কতামূলক দিবস। জুমাতুল বিদা রোজাদারদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মাহে রমজানের সমাপনান্তে এ বছর এর চেয়ে ভালো দিবস আর পাওয়া যাবে না। সুতরাং এ পুণ্যময় দিনটির যথাযথ সদ্ব্যবহার করা প্রত্যেক দ্বীনদার মুমিন-মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। নবী করিম সা: বলেছেন, ‘যে মুসলমান রমজান মাস পেল কিন্তু সারা বছরের গুনাহখাতা মাফ করিয়ে নিতে পারল না, তার মতো হতভাগা আর কেউ নেই।’
অতএব, সব ধর্মপ্রাণ মুসলিম নর-নারীর প্রতি আহ্বান, আসুন এই জুমাতুল বিদা তথা মহিমান্বিত রমজানুল মুবারকে মহান রবের দরবারে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য কায়মনোবাক্যে পানাহ চাই এবং আল্লাহ তায়ালার ইবাদতে মশগুল হয়ে তাঁকে রাজি-খুশি করার জন্য সচেষ্ট থাকি।
লেখক : কলেজ শিক্ষক



