সাঈদ বারী
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর রূপান্তরের সময়। স্বাধীনতার পর যে রাষ্ট্র একদলীয় শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক সঙ্কীর্ণতা ও অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে এগোচ্ছিল, সেই রাষ্ট্রকে তিনি ধীরে ধীরে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে ফেরানোর উদ্যোগ নেন। এই উদ্যোগ ছিল শুধু ক্ষমতা ব্যবস্থার পরিবর্তন নয়; বরং রাজনীতির দর্শন, অংশগ্রহণ ও জনসম্পৃক্ততার নতুন ধারণার সূচনা। রাজনৈতিক সংস্কার ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা- এই দুইয়ের সমন্বয়েই জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ দ্রুতই একদলীয় ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে। বহুমতের রাজনীতি সঙ্কুচিত হয়ে যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম সীমিত হয় এবং বিরোধী কণ্ঠ দুর্বল হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের সাথে জনগণের দূরত্ব বাড়তে থাকে। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে এই বাস্তবতা উপেক্ষা করেননি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সে কারণেই তিনি একদলীয় কাঠামো থেকে সরে এসে বহুদলীয় রাজনীতির পথে ফেরার উদ্যোগ নেন, যা ছিল সে সময়ের প্রেক্ষাপটে সাহসী ও ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত।
বহুদলীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ ছিল রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা। নিষ্ক্রিয় ও নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোকে আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হতে থাকে। এর মধ্য দিয়ে তিনি একটি বার্তা দিতে চেয়েছিলেন- রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট দলের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়; বরং এটি সব নাগরিক ও মতাদর্শের জন্য উন্মুক্ত। রাজনীতিতে অংশগ্রহণের এই সুযোগ রাজনীতিকে আবার প্রাণবন্ত করে তোলে।
রাজনৈতিক সংস্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সংবিধান ও রাষ্ট্রদর্শনে পরিবর্তন। তিনি রাষ্ট্রের পরিচয় ও আদর্শকে জনগণের বিশ্বাস ও বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করেন। এই প্রক্রিয়ায় তিনি রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়; বরং জাতীয় ঐক্যের একটি কাঠামো হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। তার ধারণায় জাতীয়তাবাদ ছিল এমন এক শক্তি, যা রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণকে একত্রিত করতে পারে। এই চিন্তাভাবনার মধ্য থেকেই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
বহুদলীয় গণতন্ত্র কার্যকর করতে হলে কেবল দল থাকার অনুমতি দিলেই হয় না, প্রয়োজন নির্বাচনী রাজনীতির পুনর্গঠন। জিয়াউর রহমান নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার পথ বেছে নেন। স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নির্বাচনী প্রক্রিয়া চালু করার চেষ্টা করা হয়। এসব নির্বাচন শতভাগ নিখুঁত ছিল না, বিতর্কও ছিল; কিন্তু দীর্ঘ দিন পর জনগণ আবার ভোটের সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। এর মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সংস্কৃতি নতুন করে গড়ে ওঠে।
এ সময়েই একটি নতুন রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব ঘটে, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জিয়াউর রহমান একটি সংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামো দাঁড় করান। তবে এটি কেবল ক্ষমতাসীন দলের জন্ম নয়; বরং বহুদলীয় প্রতিযোগিতার একটি বাস্তব মঞ্চ তৈরি করে। বিরোধী দলগুলোও সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়, যা রাজনীতিতে ভারসাম্য আনার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তৃণমূল পর্যায়ে রাজনীতির বিস্তার। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি যদি কেবল রাজধানী ও অভিজাত গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে গণতন্ত্র অর্থহীন হয়ে পড়ে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করার মাধ্যমে তিনি রাজনীতিকে গ্রাম পর্যন্ত নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। ইউনিয়ন ও উপজেলাপর্যায়ে জনপ্রতিনিধিত্বের ধারণা রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। এতে সাধারণ মানুষ রাজনীতিকে নিজের জীবনের সাথে যুক্ত করে দেখার সুযোগ পায়।
রাজনৈতিক সংস্কারের সাথে প্রশাসনিক সংস্কারের সম্পর্কও তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। প্রশাসনকে দলীয় রাজনীতির হাতিয়ার না বানিয়ে কার্যকর ও সেবামুখী করার চিন্তা তার মধ্যে ছিল। যদিও বাস্তবে এই লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি, তবুও প্রশাসনিক কাঠামোয় শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা লক্ষ করা যায়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে না পারলে গণতন্ত্র টেকসই হয় না, এই উপলব্ধি তার রাজনৈতিক দর্শনের অংশ ছিল।
সমালোচকরা অবশ্য বলেন, তার শাসনামলে সামরিক শাসনের প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি। এ সমালোচনা অমূলক নয়। তবে এটিও সত্য, তিনি যে রাজনৈতিক পথটি উন্মুক্ত করেছিলেন, তা আগের একদলীয় কাঠামোর তুলনায় অনেক বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল। তিনি গণতন্ত্রকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছিলেন, যা এক দিনে পূর্ণতা পায় না।
বহুদলীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য ছিল রাজনীতিতে বিকল্পের ধারণা প্রতিষ্ঠা। জনগণ বুঝতে শুরু করে, ক্ষমতার পরিবর্তন সম্ভব এবং মতভিন্নতার প্রকাশ রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়। এই মনস্তাত্তি¡ক পরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্রের উত্থান-পতন ঘটলেও বহুদলীয় ব্যবস্থার ভিত্তি আর পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক সংস্কারের আরেকটি দিক ছিল জাতীয় ঐক্যের আহ্বান। তিনি সঙ্ঘাতমুখী রাজনীতির পরিবর্তে সহনশীলতা ও সমঝোতার কথা বলেছিলেন। যদিও বাস্তব রাজনীতিতে সেই আদর্শ সবসময় প্রতিফলিত হয়নি, তবুও তার বক্তব্য ও উদ্যোগে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক ভাষার সূচনা হয়েছিল। রাজনীতিকে উন্নয়ন ও রাষ্ট্রগঠনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ধারণা এই সময়েই জোরালো হয়।
সবমিলিয়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই বাংলাদেশ একদলীয় ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে ফেরার সাহসী পদক্ষেপ নেয়। এই পথ ছিল জটিল, বিতর্কিত ও অসম্পূর্ণ; কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে তা ছিল অপরিহার্য। তিনি রাজনীতিকে আবার জনগণের সাথে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন এবং মতবৈচিত্র্যের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক জায়গা তৈরি করেছিলেন। আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার এই উদ্যোগের মূল্যায়ন যা-ই হোক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের যে ভিত্তি তিনি স্থাপন করেছিলেন, তা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনস্বীকার্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।
লেখক : প্রকাশক ও কলাম লেখক



