দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে

একটি দেশের সাথে অন্য একটি দেশের সম্পর্ক থাকবে কি থাকবে না, এর চূড়ান্ত পরীক্ষা হয়ে যায় অর্থনীতি দিয়ে। বাণিজ্যঘাটতি যদি দীর্ঘ দিন ধরে একপক্ষীয় থাকে তাহলে বুঝে নিতে হবে সম্পর্কে ঘাটতি আছে। সেই সাথে বিনিয়োগ এবং শ্রমবাজারও সম্পর্ক মাপার সূচক। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই নিজের দেশকে অন্যদের জন্য ‘প্রতিযোগিতার মাঠ’ বানাতে হবে। এখানে ‘খেলতে’ চাইতে পারে নানা দেশ। যারা ‘খেলতে’ আসবে, তারা কিসের বিনিময়ে ‘খেলছে’ সেটি হবে বিবেচনার বিষয়। আমাদের কূটনীতি হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ। এটি হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে। যারা দিতে পারবে, তারা নিয়েও যাবে। আর যারা মিলাবে তাদের জন্য কিছু মিলিবেও। বাংলাদেশের খোলা সৈকতে ঢেউ আসবে, ফিরে যাবে; কিন্তু সাগর তার গভীরতা হারাবে না

এক দিকে খোলা সাগর, তিন দিক ঘিরে আছে ‘বন্ধুদেশ’। সাগর আর ‘বন্ধুদেশ’ ছাড়াও একচিলতে সীমান্ত আছে মিয়ানমারের সাথে। একটু দূর উত্তরে হিমালয়, আর হিমালয় পেরিয়ে ড্রাগনের দেশ মহাচীন। ড্রাগন আর ‘বন্ধুদেশ’-এর মাঝে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ, দীর্ঘশ্বাস ফেলছে বঙ্গোপসাগরে।

ভৌগোলিক এই অবস্থানের কারণে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি একরকম যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে আছে। এখানে লড়াই করতে হয় টিকে থাকার জন্য, জয় পাওয়ার জন্য নয়। টিকে থাকার এই লড়াইয়ে খেয়াল রাখতে হয় পশ্চিমের দিকে। দেখতে হয় ‘বন্ধুদেশ’ গাল ফুলিয়ে আছে কি না। হিমালয়ের ওপাশে থাকা শান্ত ড্রাগনের মর্জিও বুঝে নিতে হয়। অবশ্য চীনদেশের ড্রাগনরা পশ্চিমা ড্রাগনের মতো দানব নয়। এরা ইতিবাচক শক্তির প্রতীক- পানি ও বৃষ্টির উৎস।

মোটকথা সবার সাথে বন্ধুত্ব রেখেই চলতে হয় আমাদের। হ্যাঁ, আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতেও এই কথা লেখা আছে। ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’- শুনতে খুব আকর্ষণীয় ও নৈতিক মনে হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতায় এটা অনেকটাই অবাস্তব। বিশ্বরাজনীতি আদর্শ দিয়ে নয়, স্বার্থ ও শক্তির ভারসাম্য দিয়ে চলে। জার্মানির প্রথম চ্যান্সেলর অটো ভন বিসমার্ক বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রের স্থায়ী কোনো বন্ধু বা শত্রু নেই; আছে কেবল স্থায়ী স্বার্থ।’ তার কথা যদি ঠিক বলে ধরে নিই, তাহলে এতদিন ‘বন্ধুদেশ’ বলে যেই দেশকে জেনে এসেছি, এর সবই কি মিথ্যা? ‘বন্ধুদেশ’-এর কোনো একটা ঐতিহাসিক সহায়তার প্রতিদান দিতে আমরা যদি দীর্ঘ সময় ধরে একতরফা ছাড় দিই, স্বার্থ বিকিয়ে দিই তাহলে? অথচ তার বিপরীতে কিছুই না পাই? বিষয়টা আবেগের নয়, স্বার্থের বিবেচনায় মূল্যায়ন করা উচিত। কূটনীতিতে কৃতজ্ঞতা অবশ্যই একটি মূল্যবোধ; কিন্তু রাষ্ট্রপর্যায়ে কৃতজ্ঞতা স্থায়ী নীতি নয়, বরং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাই আচরিত রীতি।

যদি কোনো দেশ অতীতে আমাদের কঠিন সময়ে সহায়তা করে থাকে, সেটি ইতিহাসের অংশ। সেটি সম্মানের সাথে স্মরণ করা যেতে পারে। কিন্তু সেই সহায়তার বিনিময়ে অনির্দিষ্টকাল ধরে একতরফা ছাড় দেয়া, অধীনতামূলক চুক্তি করা কতটুকু ঠিক? এগুলো কি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কূটনীতি? আসলে সম্পর্ক তখনই স্বাস্থ্যকর থাকে, যখন এর মধ্যে দুই পক্ষের স্বার্থ নিহিত।

যে দেশকে আমরা দীর্ঘ দিন ‘বন্ধুদেশ’ হিসেবে জেনে এসেছি, সেই দেশটি কি এত বছর পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে আমাদের অংশীদার ছিল? যদি স্বার্থের ভারসাম্য না থাকে, তাহলে সম্পর্কের কাঠামো নতুন করে বিবেচনা করাই কূটনৈতিকভাবে যুক্তিসঙ্গত। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে কোনো একপক্ষীয় আবেগ নয়, বাস্তবতা বিবেচনায় রাখতে হবে। মানে ‘দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার এই অংশটুকুই আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিবেচনা করা উচিত। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘উইন-উইন’। রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক যদি একমুখী হয়, তবে সেটি ভঙ্গুর হয়। আর যদি তা পরস্পরনির্ভর হয়, তাহলে স্বার্থের ভেতর দিয়েই স্থিতিশীলতা আসে। আর সেই সম্পর্ক স্থায়ী হতে পারে। কোনো পরাশক্তি যদি নিজেদের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, তখন একই সাথে সবার বন্ধু হয়ে থাকা প্রায় অসম্ভব। একপক্ষের সাথে ঘনিষ্ঠতা অন্যপক্ষের সন্দেহ ডেকে আনতে পারে।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা জোটভিত্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক। যেমন ‘ন্যাটো’ অথবা ‘ব্রিকস’ জোটে থাকা মানে একটি কৌশলগত অবস্থান নেয়া। নিরাপত্তা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক সহায়তার প্রশ্নে অনেকসময় রাষ্ট্রকে কোনো না কোনো পক্ষের কাছাকাছি যেতে হয়। আন্তর্জাতিক সঙ্ঘাতের সময়ও নিরপেক্ষতা রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বরাজনীতিতে সঙ্ঘাত ও শক্তির প্রয়োগ এখনো বাস্তবতা। এমন পরিস্থিতিতে আগ্রাসনের শিকার রাষ্ট্রের পক্ষে সবার সাথে সমান সম্পর্ক রাখা সম্ভব নয়।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বাস্তবতা কঠিন। এক দেশের সাথে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য বা কৌশলগত সম্পর্ক অন্য দেশের নিষেধাজ্ঞা বা কূটনৈতিক চাপ ডেকে আনতে পারে। অর্থনীতি ও রাজনীতি একটির সাথে অন্যটি জড়িত। এ কারণে রাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত নিজের নিরাপত্তা ও স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিতে হয়। কূটনীতিতে স্থায়ী কোনো বন্ধু নেই, হওয়া উচিতও নয়। আর সবার সাথে বন্ধুত্ব রাখতে গেলে কারো মনই রাখা সম্ভব হয় না। যদি বিরোধ এড়িয়ে চলার জন্য এই নীতি নেয়া হয়, তাহলে রাষ্ট্রকে নিজের কৌশল নির্ধারণের চেয়ে গুরুত্ব দিতে হয় অন্যদের মন রক্ষায়। তা ছাড়া বিশ্বরাজনীতি বা আঞ্চলিক উদ্যোগে নেতৃত্ব নেয়ার সুযোগ থাকে না। সবার সাথে খাতির রাখতে চাইলে, কেউ তাকে দৃঢ় অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে না। এতে স্বল্পমেয়াদে ঝুঁকি কমলেও দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের প্রভাব গড়ে ওঠে না।

‘বন্ধুদেশ’-এর সাথে একচেটিয়া খাতির রাখতে গিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’ এখন মৃতপ্রায়। অথচ এই সংস্থাটি গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশের উদ্যোগে। ১৯৭৭ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রথম সার্কের ধারণা দেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বোঝাপড়া তৈরি হলে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা, শান্তি, বাণিজ্য এবং উন্নয়ন সম্ভব হবে বিশ্বাস করতেন তিনি। ১৯৮৫ সালে সার্ক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর এই প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেয়া হতে থাকে। পরে পারস্পরিক যোগাযোগের প্লাটফর্মটি মুখ থুবড়ে পড়ে ভারতের আধিপত্যবাদী নীতির কারণে। পাকিস্তানের সাথে ভারতের শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্ক সার্কের স্বাভাবিক অগ্রযাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভারতের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা হয় ‘বিমসটেক’। সার্কের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ভুটান বিমসটেকের সদস্য। পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে বিকল্প এই ফোরামকে শক্তিশালী করতে কাজ করেছে ভারত।

ভারতের আরেক প্রতিবেশী দেশ চীন। ভূ-রাজনীতিতে শক্তিশালী এই দেশটির ব্যাপারে বারবরই আতঙ্ক আছে ভারতের। এ কারণে চীনকে দক্ষিণ এশিয়া থেকে দূরে রাখতে মরিয়া তারা। তবে পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, এমনকি মালদ্বীপেও রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে চীন।

আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে ‘বন্ধুদেশ’ তথা ভারত এবং চীন- এই দুই দেশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ধরন তুলনা করা যেতে পারে। ভারত আমাদের প্রতিবেশী। দেশটির সাথে ঐতিহাসিক সম্পর্ক আছে, বাণিজ্য আছে। এ ছাড়া আছে আরো সম্পর্ক। দেশটির পররাষ্ট্রনীতি আদর্শের চাইতে কৌশল, স্বার্থ ও বাস্তবতার ওপর বেশি নির্ভরশীল। যাকে বলা হয় চাণক্য-নীতি। ভারতীয় প্রাচীন অর্থনীতিবিদ ও রাজ উপদেষ্টা চাণক্য এই রাষ্ট্রচিন্তা দিয়ে গেছেন। তার দর্শনের মূল কথা হলো, রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব তার নিরাপত্তা ও শক্তি সংরক্ষণ। সেখানে নৈতিকতা বা আবেগ থাকবে না। গুরুত্ব পাবে কৌশলগত স্বার্থ। মিত্রতা, বৈরিতা এবং জোট হবে রাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষার উপকরণ। আধুনিক ভারত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে এই নীতি অনুসরণ করে। দেশটি এক দিকে পশ্চিমা শক্তির সাথে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করে, অন্য দিকে ভিন্নমুখী শক্তির সাথেও যোগাযোগ রাখে। অর্থাৎ, স্থায়ী বন্ধু বা শত্রুর ধারণার বদলে পরিস্থিতি অনুযায়ী অবস্থান নির্ধারণ করে। এটাই চাণক্য-ধারার বৈশিষ্ট্য। চাণক্য-ধারার কৌশল হলো মূলত কূটকৌশল। এখানে বীরত্ব নেই, আছে ধূর্তামি। তবে একটা বাগধারা আছে, ‘অতি চালাকের গলায় দড়ি’। কূটকৌশল করতে করতে ‘বন্ধুদেশ’টির এখন প্রকৃত বন্ধুর সঙ্কট দেখা দিয়েছে। আমাদেরকে অবশ্যই চাণক্য-কৌশলের ব্যাপারে ধারণা রাখতে হবে। কারণ তাদের বিভাজনকেন্দ্রিক কৌশল আমাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তবে বিপদ আসতে পারে, এই শঙ্কায় নিজেদের অধিকার নিয়ে চুপ থাকা যাবে না। চোখে চোখ রেখে কথা বলতে হবে পানির হিস্যা নিয়ে। এখনো আমরা মাঝারি শিল্পে আছি। কৃষিই আমাদের অবলম্বন। এ কারণে পানির নিশ্চয়তা কৌশলগত নিরাপত্তার অংশ। নদীমাতৃক বাংলাদেশে উজানের প্রবাহ অর্থনীতি, কৃষি ও সামাজিক স্থিতির সাথে জড়িত।

বাংলাদেশের স্থিতির জন্য মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে হবে ভারতের সাথে। সম্পর্ক থাকতে হবে চীনের সাথেও। চীন বিশ্বের বড় অর্থনৈতিক শক্তি। দেশটি বড় বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্প সহযোগিতার সুযোগ নিয়ে আসে। আধুনিক বিশ্বে অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও শিল্পোন্নয়নে এক অস্বীকার্য শক্তি চীন। দ্রুত বাস্তবায়নক্ষমতা, সাশ্রয়ী প্রযুক্তিÑ এসব আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য আকর্ষণীয়। সড়ক, সেতু, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্রে সহযোগিতা আমাদের শিল্পায়ন ও রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

চীন ও ভারতের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা না করলে সন্দেহ বা কৌশলগত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আবেগনির্ভর অবস্থানের পরিবর্তে হিসাবনির্ভর বহুমাত্রিক কূটনীতি প্রয়োজন। তবে প্রতিটি অংশীদারত্ব বিবেচনা করা উচিত জাতীয় স্বার্থের প্রেক্ষিতে। সুযোগ গ্রহণ করা হলো কূটনৈতিক বিচক্ষণতা। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই বিকল্প খোলা রাখতে হয়।

একটি দেশের সাথে অন্য একটি দেশের সম্পর্ক থাকবে কি থাকবে না, এর চূড়ান্ত পরীক্ষা হয়ে যায় অর্থনীতি দিয়ে। বাণিজ্যঘাটতি যদি দীর্ঘ দিন ধরে একপক্ষীয় থাকে তাহলে বুঝে নিতে হবে সম্পর্কে ঘাটতি আছে। সেই সাথে বিনিয়োগ এবং শ্রমবাজারও সম্পর্ক মাপার সূচক। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই নিজের দেশকে অন্যদের জন্য ‘প্রতিযোগিতার মাঠ’ বানাতে হবে। এখানে ‘খেলতে’ চাইতে পারে নানা দেশ। যারা ‘খেলতে’ আসবে, তারা কিসের বিনিময়ে ‘খেলছে’ সেটি হবে বিবেচনার বিষয়।

আমাদের কূটনীতি হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ। এটি হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে। যারা দিতে পারবে, তারা নিয়েও যাবে। আর যারা মিলাবে তাদের জন্য কিছু মিলিবেও। বাংলাদেশের খোলা সৈকতে ঢেউ আসবে, ফিরে যাবে; কিন্তু সাগর তার গভীরতা হারাবে না।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত