মধ্যযুগীয় যাজকতন্ত্র ও ইসলামী শরীয়ার বিচারব্যবস্থা সমতুল্য নয়

মাওলানা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া

ইউরোপের মধ্যযুগীয় যাজকতন্ত্রের অন্ধকার ইতিহাস আর ইসলামী শরীয়ার বিচারব্যবস্থাকে এক করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। শরীয়তের বিচারব্যবস্থা কোনোভাবেই অমানবিক বা বর্বর নয়; বরং তা ন্যায়, ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবকল্যাণভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। অন্যায়, অবিচার ও অপরাধ দমন, সামাজিক স্থিতি ও মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে এর কার্যকারিতা সব যুগেই সমভাবে প্রযোজ্য।

সম্প্রতি শিশু রামিসা ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ধর্ষককে প্রকাশ্য জনসম্মুখে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দাবি উঠেছে সংক্ষুদ্ধ জনতার পক্ষ থেকে। আমাদের মতে দেশে শরীয়া আইন কার্যকর থাকলে এ ধরনের অপরাধ-প্রবণতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসত। এ পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা এখন মধ্যযুগে নেই।’ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এ ধরনের বক্তব্য অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর এবং অনাঙ্ক্ষিত।

ইসলামী শরীয়তে কিছু ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে জনসম্মুখে শাস্তি কার্যকর করার কথা এসেছে, যাতে সমাজ এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং অপরাধ প্রবণতা রোধ হয়। শরীয়ত নির্ধারিত প্রতিটি শাস্তি কার্যকর করার মধ্যেই রয়েছে গভীর প্রজ্ঞা, সুদূরপ্রসারী কল্যাণ ও উপকারিতা। এটিকে মধ্যযুগীয় বর্বরতার সাথে তুলনা করলে, প্রকারান্তরে শরীয়তের বিধানকেই বর্বর বলা হয়। অথচ আধুনিক বিশ্বেও বহু রাষ্ট্র প্রকাশ্য বিচার, মৃত্যুদণ্ড কিংবা কঠোর শাস্তিকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বাস্তবসম্মত পদ্ধতি হিসেবে কার্যকর করে থাকে।

শরীয়তের কোনো বিধানকে মধ্যযুগীয় বলে অবজ্ঞা করা কারো থেকেই কাম্য নয়। যারা করেন, হয়তো তারা ইসলামী শরীয়তের বিচারপদ্ধতির মাহাত্ম্য, কল্যাণ, উপকারিতা ও বাস্তবতা বোঝেন না, নয়ত ইসলাম বিদ্বেষী মানসিকতা পোষণের কারণে করে থাকেন।

মনে রাখতে হবে, ইসলাম ধর্ম কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জাতি কিংবা বিশেষ শতাব্দীর জন্য অবতীর্ণ হয়নি। এটি কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহপ্রদত্ত জীবনব্যবস্থা। তাই শরীয়তের কোনো বিধান কিংবা বিধান কার্যকরের পদ্ধতিকে ‘মধ্যযুগীয়’ বলা মানে পরোক্ষভাবে এই দাবি করা যে, আল্লাহর বিধান নির্দিষ্ট যুগের সাথে সীমাবদ্ধ, যা বর্তমানে অচল হয়ে পড়েছে। অথচ প্রতিটি মুসলমানের বিশ্বাস হলো, আল্লাহ তায়ালাই মানবজাতির স্রষ্টা। আর মানুষের প্রকৃতি, প্রবৃত্তি ও সমাজ সম্পর্কে তিনিই সর্বাধিক জ্ঞাত। ফলে তাঁর দেয়া বিধানই সর্বত্র ও সর্বকালের জন্যই প্রযোজ্য। পবিত্র কুরআনের ঘোষণা- ‘জেনে রেখ, সৃষ্টি ও আদেশ দান তাঁরই কাজ। আল্লাহ বরকতময়, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।’ (সূরা আরাফ, আয়াত : ৫৪)

ইতিহাসে ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ বলতে মূলত ইউরোপের সেই অন্ধকার সময়কে বোঝানো হয়, যখন গির্জাকেন্দ্রিক যাজকতন্ত্র মানুষের চিন্তা, জ্ঞান, জীবন নির্বাহকে দুর্বিসহ করে তুলেছিল। মানুষের স্বাধীনতার টুঁটি চেপে ধরা হয়েছিল। বিচারব্যবস্থাও যাজক মর্জি নির্ভর ছিল। এ সময়টাকে ‘ডার্ক এইজ’ বা অন্ধকার যুগও বলা হয়। এ সময়ে ধর্মের নামে মানুষকে নিপীড়ন করা হতো, ভিন্নমতাবলম্বীদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতো, জ্ঞানী-দার্শনিকদের দমিয়ে রাখা হতো। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, গির্জার ছাড়পত্র ছাড়া চিন্তা করাও ছিল দণ্ডনীয় অপরাধ। রাজার ওপর পোপের একচ্ছত্র রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ছিল। খৃষ্ট দুনিয়ার সামন্তীয় ব্যবস্থায় কৃষকরা মানবিক মর্যাদাহীন দাসতুল্য জীবন যাপন করতে বাধ্য হত।

ভারতীয় উপমহাদেশের চিত্রও অনুরূপ ছিল। মন্দির ও আশ্রমকেন্দ্রিক শাসন এবং বর্ণভেদ প্রথার কারণে স্বধর্মের নিম্নবর্ণের মানুষরা উচ্চবর্ণের মন্দিরের সামনে দিয়ে হাঁটা নিষিদ্ধ ছিল। ঠাকুরবাড়ীর সম্মুখ দিয়ে হরিজনদের জুতা পায়ে চলাচল ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ভিন্ন বর্ণের মানুষের সাথে কুশল বিনিময়ও ছিল জাতপাতের ভিত্তিতে দোষনীয়। উচ্চ-নিম্ন ভেদাভেদের কারণে এক শ্রেণির মানুষকে আজীবন অস্পৃশ্য, অচ্ছুত হয়ে থাকতে হতো। স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রীকেও জীবন্ত অগ্নিদাহ করা হতো। এই বর্বর ও বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থাই ছিল প্রকৃত মধ্যযুগীয় অন্ধকার যুগ।

কিন্তু এর সাথে খোলাফায়ে রাশেদা ও পরবর্তী মুসলিম শাসনামলের তুলনা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। ইসলামী শরীয়তের বিচারব্যবস্থার সাথে বাস্তবতা উপেক্ষা করে মিল খোঁজা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়। যারা এরূপ করে থাকে তারা একধরনের জ্ঞানপাপীও বটে। শরীয়ার বিচারব্যবস্থা অনেকটা সুনির্দিষ্ট। শরীয়া শাস্তিতে স্বেচ্ছাচারী বা সুবিধাভোগের কোনো সুযোগ নেই। ‘শরয়ী হদ’ অর্থাৎ শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত অপরিবর্তনীয় দণ্ডবিধি প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বাক্ষী (সাক্ষ্য) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। কারণ হদ-শাস্তি গুরুতর ও নির্ধারিত দণ্ড হওয়ায় শরীয়ত এতে প্রমাণের মানদণ্ড খুব কঠোর করেছে, যেন নিরপরাধ কেউ শাস্তি না পায়।

খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনব্যবস্থা ছিল জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের এক অনন্য উদাহরণ। সেখানে খলিফাও আইনের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। সাধারণ নাগরিক আদালতে খলিফার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে পারত, বিচারকের সম্মুখে দাঁড়াতে পারত। হজরত উমর রা:, হজরত আলি রা: পর্যন্ত আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন। জবাবদিহিতার আওতার ভেতরে ছিলেন সকলে। অমুসলিমরাও ন্যায়বিচার পেত। ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্তও রয়েছে যে, একজন সাধারণ ব্যক্তি আদালতে খলিফার বিপক্ষে মামলা করেছে এবং বিচারক নিরপেক্ষভাবে রায় দিয়েছেন।

ইসলাম পুরোহিতকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার নির্দেশনা দেয় না। শাসন সর্বদা ছিল খলিফা বা আমিরকেন্দ্রিক। উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসনামলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শাসকরা শরীয়তের গণ্ডি অতিক্রম করেছেন এবং ব্যক্তিস্বার্থ বা ক্ষমতাকেন্দ্রীক প্রতিহিংসায় নির্মম নির্যাতন করেছেন। শরয়ী হদ তথা বিধানগুলো কোনো বিশেষ যুগের সাথে আবদ্ধ নয়। এগুলো সর্বকালীন ও সর্বজনীন। তবে কখনো কখনো কোনো কোনো হদ প্রয়োগে প্রেক্ষাপটের বিবেচনা করার নির্দেশনা আছে।

ইসলামী শরীয়তের হুদুদ ও কিসাস গির্জার যাজকতন্ত্রের প্রতিহিংসামূলক বর্বরতা কিংবা মধ্যযুগের রাজকীয় নিষ্ঠুর শাস্তির মতো নয়। কিংবা বর্তমানে যেমন অনেকে বাছবিচারহীন কেবল অভিযোগের ভিত্তিতেই শাস্তি দাবি করছে, তেমনও নয়। অতি দ্রুত রায় দেয়ার তূলনায় সঠিক রায় ও ন্যায়বিচারের প্রতি ইসলাম সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। কঠোর সাক্ষ্যপ্রমাণ ও বিচারিক সতর্কতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত খোদায়ি ন্যায়বিচার কাঠামো হলো শরীয়ত। সামান্য সন্দেহ থাকলেও ‘হদ’ কার্যকর করার সুযোগ শরীয়তে রাখা হয়নি।

শাস্তি কার্যকর করার সর্বশেষ সময় পর্যন্ত বাঁচার সুযোগ শরীয়ত রেখেছে। শাস্তি কার্যকর করার সময় যদি কোনো সাক্ষী তার সাক্ষ্য প্রত্যাহার করে বা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন বলে স্বীকার করে, তাহলে শাস্তি স্থগিত হয়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে একবার এক সাহাবি স্বেচ্ছায় যিনার স্বীকারোক্তি নিয়ে উপস্থিত হন। সাহাবী স্বীকারোক্তি দিচ্ছিলেন, আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিবার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন।

শরীয়ত কিসাস না নিয়ে ক্ষমা করার সুযোগ রেখেছে। কিসাসের ক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়ত নিহতের ওয়ারিশদের হাতে একটি অসাধারণ ক্ষমতা দিয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘেষিত হওয়ার পরেও যদি ওয়ারিশরা ক্ষমা করে দেন, তাহলে অভিযুক্ত কেসাস থেকে রেহাই পেয়ে যাবে। দিয়ত ছাড়াও ক্ষমা পাওয়ার পথ শরীয়ত উন্মুক্ত রেখেছে।

ইউরোপের মধ্যযুগীয় যাজকতন্ত্রের অন্ধকার ইতিহাস আর ইসলামী শরীয়ার বিচারব্যবস্থাকে এক করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। শরীয়তের বিচারব্যবস্থা কোনোভাবেই অমানবিক বা বর্বর নয়; বরং তা ন্যায়, ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবকল্যাণভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। অন্যায়, অবিচার ও অপরাধ দমন, সামাজিক স্থিতি ও মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে এর কার্যকারিতা সব যুগেই সমভাবে প্রযোজ্য।

লেখক : মুহতামিম, জামিয়া হোসাইনিয়া আরজাবাদ, ঢাকা

[email protected]