প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য চীন সফর নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে ভারতীয় গণমাধ্যম

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য চীন সফর শুধু একটি সফর নয়; বরং এটি বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। এটি এমন এক বার্তা, যেখানে বাংলাদেশ বলতে চাইছে— আমরা বন্ধুত্ব চাই, সহযোগিতা চাই, উন্নয়ন চাই; কিন্তু সেটি হতে হবে সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে। কারণ,বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশ সার্বভৌম।বাংলাদেশ এখন আর কারও দয়ার উপর নির্ভরশীল নয়। তাই বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন এখন একটাই— “সবার আগে বাংলাদেশ।”

আহসান হাবিব বরুন
দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে আবারও বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হচ্ছে নতুন গুরুত্ব নিয়ে। কারণ, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য চীন সফর। সফরটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না হলেও ভারতীয় সংবাদমাধ্যম, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক মহলে এটি এখন আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

বিশেষ করে ভারতের সংবাদমাধ্যম নিউজ১৮ ও মানিকন্ট্রোলে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের নতুন সরকারের কূটনৈতিক অবস্থান দিল্লি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।

এখানে আমি মনে করি এই আলোচনা শুধু একটি সফরকে ঘিরে নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, তিস্তা প্রকল্প, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং আঞ্চলিক শক্তির নতুন সমীকরণকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে।

তবে বাংলাদেশের জনগণের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বাংলাদেশ এখন আবারও নিজের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক অবস্থান পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে। আর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের মূল বার্তা হচ্ছে—“সবার আগে বাংলাদেশ।”

অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে একটি প্রশ্ন ছিল—বাংলাদেশ কি সত্যিই নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে পারছে? নাকি একটি বিশেষ শক্তির কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রেই বেশি মনোযোগী হয়ে উঠেছে? বিশেষ করে শেখ হাসিনা সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে এই প্রশ্নটি আরও প্রবল হয়েছে।

বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশ মনে করে, বিগত সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক পারস্পরিকতার চেয়ে একপাক্ষিকতার দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়েছিল। সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি, তিস্তার পানিচুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি, বাণিজ্য বৈষম্য কমেনি; কিন্তু তারপরও দিল্লির প্রতি ঢাকার নীতিগত নমনীয়তা ছিল দৃশ্যমান। ফলে মানুষের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই বাস্তবতা বদলাতে শুরু করেছে। বিএনপি আবারও বিপুল জনরায় নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। আর তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার এমন একটি কূটনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে, যেখানে কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান, সমতা এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য চীন সফরকে ঘিরে ভারতের উদ্বেগ অস্বাভাবিক নয়। কারণ দিল্লি খুব ভালো করেই জানে, বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি ঐতিহাসিকভাবে বহুমাত্রিক এবং ভারসাম্যপূর্ণ।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, সেখানে বাংলাদেশ কখনোই কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্র ছিল না। তিনি মুসলিম বিশ্ব, পশ্চিমা বিশ্ব, চীন ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়াও সেই ধারাই অনুসরণ করেছিলেন। এখন তারেক রহমানও সেই একই বাস্তববাদী কূটনীতির পথেই হাঁটছেন—এটাই স্বাভাবিক।

প্রশ্ন হচ্ছে, কেন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে তারেক রহমানের এই সফর?

কারণ এই সফরের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রকল্প—তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারেজ। এছাড়াও আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে এখানে।

১.তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশের সঙ্গে জড়িত। বছরের পর বছর পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ায় উত্তরাঞ্চলের মানুষ ভোগান্তির শিকার হয়েছে। তাই তিস্তা মহাপরিকল্পনা কোনো রাজনৈতিক বিলাসিতা নয়; এটি জাতীয় প্রয়োজন।

চীন যদি এই প্রকল্পে অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে আগ্রহী হয়, তাহলে বাংলাদেশ কেন সেই সুযোগ গ্রহণ করবে না? একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অধিকার রয়েছে নিজের জনগণের উন্নয়নের জন্য যেকোনো কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণ করার।

২.পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প শুধু একটি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা, পানি ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্রুত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন—বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন হতে চায়।

৩.ভারতের কিছু গণমাধ্যম সফরটিকে ভারত-চীন প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাস্তবতা একদমই ভিন্ন। ভারত নিজেও নিয়মিত চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে। বিশ্বের প্রায় সব বড় শক্তিই নিজেদের জাতীয় স্বার্থে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে। ফলে বাংলাদেশ যদি একই কাজ করে, তাহলে সেটিকে অস্বাভাবিক বা “ভারতবিরোধী” বলার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।

৪. ভারতসহ সকলেরই মনে রাখা উচিত যে, বাংলাদেশ কোনো ভূরাজনৈতিক খেলার মাঠ নয়। বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও ভৌগোলিক গুরুত্ব রয়েছে। বঙ্গোপসাগর, সমুদ্রবন্দর, আঞ্চলিক সংযোগ ও বাণিজ্য করিডোরের কারণে বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক শক্তিগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত—সবাই এখন বাংলাদেশকে নতুন গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। তাই এই বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করতে হলে বাংলাদেশের কূটনীতি হতে হবে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও আত্মমর্যাদাশীল।

৫.তারেক রহমান সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা হচ্ছে—বাংলাদেশ আর একমুখী কূটনীতির পথে হাঁটবে না। যে দেশ বাংলাদেশের উন্নয়ন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সহযোগিতা করবে, বাংলাদেশের সম্পর্কও সেই বাস্তবতার ভিত্তিতেই এগোবে।

এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়; বরং বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান। ভারতকে এই সত্য উপলব্ধি করতে হবে।

৬.ভারত যদি সত্যিই বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সুসম্পর্ক চায়, তাহলে তাকে বাংলাদেশের জনগণের মনস্তত্ত্ব ও জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করে কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ী আস্থা তৈরি করা যায় না।

বাংলাদেশকে “ছোট ভাই” অর্থাৎ আর 'দাদাগিরি' নয়, সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে দেখার মধ্যেই ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা নিহিত। যা উভয় দেশের জন্যই কল্যাণকর।

৭.বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো—ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, মুসলিম বিশ্ব এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বহুমাত্রিক কূটনীতি পরিচালনা করাই হবে আগামী দিনের সফল রাষ্ট্রনীতির ভিত্তি।

কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই; স্থায়ী হচ্ছে কেবল জাতীয় স্বার্থ।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য চীন সফর শুধু একটি সফর নয়; বরং এটি বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। এটি এমন এক বার্তা, যেখানে বাংলাদেশ বলতে চাইছে—

আমরা বন্ধুত্ব চাই, সহযোগিতা চাই, উন্নয়ন চাই; কিন্তু সেটি হতে হবে সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে। কারণ,বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশ সার্বভৌম।বাংলাদেশ এখন আর কারও দয়ার উপর নির্ভরশীল নয়। তাই বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন এখন একটাই— “সবার আগে বাংলাদেশ।”

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

ই-মেইল: [email protected]