ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার পাল্টা জবাব দিতে এবার সরাসরি মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট তেল স্থাপনাগুলোকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করেছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। 'অপারেশন ট্রু প্রমিস-৪' এর ৬৩তম পর্যায়ের এই অভিযানে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা আমেরিকার অংশীদারিত্বমূলক তেল ক্ষেত্রগুলোতে বড় ধরনের অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদ আর আগুনের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। তেহরানের দাবি, এটি কেবল শুরু; দুশমন যদি তাদের ভুল না শুধরায়, তবে এই আগুনের লেলিহান শিখা পুরো অঞ্চলের জ্বালানি মানচিত্র বদলে দেবে।
অপারেশন ট্রু প্রমিস-৪ : এক নতুন পর্যায়ের সঙ্ঘাত
তাসনিম নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, "হে ইমাম মাহদি" কোড নামে এই অভিযানটি পরিচালিত হয়েছে। মূলত ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রীসহ অন্য শহীদদের স্মরণে এই হামলা উৎসর্গ করা হয়েছে। ইরান স্পষ্ট করেছে যে, তারা কখনোই যুদ্ধের পরিধি তেল স্থাপনা পর্যন্ত বাড়াতে চায়নি। কিংবা প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতির ক্ষতি করতে চায়নি। কিন্তু শত্রুরা যখন ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হেনেছে, তখন ইরান বাধ্য হয়েই যুদ্ধের এই 'নতুন ধাপে' প্রবেশ করেছে। এখন থেকে মার্কিন বিনিয়োগ বা স্বার্থ আছে এমন যেকোনো জ্বালানি কেন্দ্র ইরানি হামলার বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।
"নেতৃত্ব হারানো মানে পরাজয় নয়"
আয়াতুল্লাহ খামেনেই এবং অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের শাহাদতের পর অনেকের ধারণা ছিল ইরানের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। তবে তাসনিম নিউজের প্রধান সম্পাদক কিয়ান আবদুল্লাহি আল-মায়াদিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, "হত্যাকাণ্ড যুদ্ধের কৌশলগত ফলাফল বদলে দিতে পারে না।"
তিনি বলেন, ইমাম খোমেনি এবং শহীদ খামেনেই যে আদর্শিক কাঠামো রেখে গেছেন, তা আজ ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে অলৌকিক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। ১৯ দিন পার হয়ে গেলেও সাধারণ মানুষ এখনো রাজপথে তাদের সমর্থন জানিয়ে যাচ্ছে, যা প্রমাণ করে যে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামো ব্যক্তি-নির্ভর নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত উত্তরাধিকার।
থমকে গেছে হরমুজ প্রণালী, ক্ষুব্ধ ট্রাম্প
যুদ্ধের তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ 'হরমুজ প্রণালী' সচল করতে ব্যর্থ হয়েছে মার্কিন বাহিনী। আরটি জানাচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোর সদস্য ও সহযোগী দেশগুলোর কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েও কার্যত কোনো সাড়া পাননি। ট্রাম্পের অভিযোগ, আমেরিকার নিরাপত্তা বলয়ে থেকেও দেশগুলো বিপদের সময় হাত গুটিয়ে বসে আছে। এদিকে কাতারসহ ১২টি আরব দেশ ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নিন্দা জানিয়েছে, বিশেষ করে কাতারের লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে হামলার পর উদ্বেগ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে অশনিসঙ্কেত
মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্ববাজারে। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। ফ্রান্স ইতেোমধ্যে জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা বন্ধে 'মোরটোরিয়াম' বা যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। তবে ইসরায়েল এবং ইরান—উভয় পক্ষই পিছু হটার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। ইরান ইতিমধ্যে তেল আবিব এবং বেন গুরিয়ান বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়েছে।
ইরানের পক্ষ থেকে শেষ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, আমেরিকান-জায়নিস্ট আগ্রাসনকারীরা যদি তাদের জ্বালানি নীতিতে পরিবর্তন না আনে, তবে সামনের হামলাগুলো হবে আরো ভয়াবহ। তেহরানের ভাষায়, "বিজয় কেবল মহান আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।"



