সাহসের বাতিঘর বেগম খালেদা জিয়ার বিদায়

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন সেই সত্যই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে তার আপসহীন অবস্থান তাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। তার সংগ্রামী, বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন অনাগত বাংলাদেশপন্থী রাজনৈতিককর্মী ও মুক্তিকামীদের জন্য অন্যায় ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং ন্যায় ও গণমানুষের আপসহীনতায় অনন্য অনুপ্রেরণার উৎস ও অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।

বেগম খালেদা জিয়া
বেগম খালেদা জিয়া |সংগৃহীত

মু. নূরুল্লাহ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ক্ষমতার পালাবদলের সাথে যুক্ত নয়; বরং সময়ের সঙ্কটে গণতন্ত্রের পক্ষ হয়ে দাঁড়ানোর সাহসী প্রতীক। বেগম খালেদা জিয়া তেমনি এক নাম। দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি ক্ষমতায় যেমন ছিলেন, তেমনি ক্ষমতার বাইরে থেকেও গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও জনগণের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষায় আপসহীন অবস্থান নিয়েছেন। এই ধারাবাহিক সংগ্রামই তাকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আগমন কোনো পরিকল্পিত ক্ষমতার অভিযাত্রা ছিল না। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এক গভীর রাজনৈতিক সঙ্কটের সময়ে। সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ ও ভিন্নমত দমনের প্রেক্ষাপটে রাজনীতির ময়দানে তার এই প্রবেশ ছিল সাহসী সিদ্ধান্ত। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজেকে একজন দৃঢ়চেতা ও গণমানুষের নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব ছিল আপসহীন ও ধারাবাহিক। রাজপথের আন্দোলন, দলীয় সংগঠন শক্তিশালী করা এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। গ্রেফতার, গৃহবন্দিত্ব ও রাজনৈতিক নিপীড়ন সত্ত্বেও তিনি আন্দোলন থেকে কখনো সরে আসেননি। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসনের পতন ঘটলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সেই অধ্যায়ে তার ভূমিকা এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

১৯৯১ সালে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়া শুধু একটি রাজনৈতিক নজিরই স্থাপন করেননি; বরং সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন। রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থার অবসান ও সংসদীয় পদ্ধতির কার্যকর প্রয়োগ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে সুদৃঢ় করে। পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় তার ভূমিকা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

বিরোধী রাজনীতিতে আপসহীন অবস্থান

ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়েই বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক চরিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নির্বাচন, সংসদ, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা প্রশ্নে তিনি বরাবরই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। দীর্ঘ সময় কারাবরণ, শারীরিক অসুস্থতা ও রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে যাননি। এই অনমনীয় অবস্থানই তাকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জনপ্রিয় ও আপসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিত করেছে।

পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব শুধু দলীয় রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি নারী নেতৃত্বের একটি শক্ত প্রতীক। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তারকারী নারী রাজনীতিবিদদের একজন। তার রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও সংগ্রামী ভূমিকা বাংলাদেশের অসংখ্য নারীকে রাজনীতিতে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করেছে।

খালেদার জিয়াকে ষড়যন্ত্রকারীরা দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে চিত্রিত করার অপপ্রয়াস চালিয়েছে; অথচ দুর্নীতি ও অপরাধের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় কঠোর অবস্থানে ছিলেন। এমনকি তার এ অবস্থানের কারণে সরকারে থাকাবস্থায় তার অনেক কাছের লোকের সাথেও সম্পর্ক মলিন হয়েছে বলে শোনা যায়।

গণতন্ত্র কোনো স্থায়ী অর্জন নয়; এটি প্রতিনিয়ত রক্ষা করতে হয়। বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন সেই সত্যই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে তার আপসহীন অবস্থান তাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। তার সংগ্রামী, বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন অনাগত বাংলাদেশপন্থী রাজনৈতিককর্মী ও মুক্তিকামীদের জন্য অন্যায় ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং ন্যায় ও গণমানুষের আপসহীনতায় অনন্য অনুপ্রেরণার উৎস ও অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক : শিক্ষক ও সংগঠক